মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সংঘাতের জেরে ইরানের সামনে যেমন বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, তেমনি নতুন কূটনৈতিক সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত তেহরানের।
সংঘাত আরো বাড়ানোর পরিবর্তে অর্জিত কৌশলগত সুবিধাকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তুরস্কের সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল। এক মতামতধর্মী নিবন্ধে তিনি এসব কথা বলেছেন। নিবন্ধটির শিরোনাম ‘ইরানের সুযোগের মুহূর্ত’। এটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মতামতভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে।
যুদ্ধ বদলে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানজুড়ে হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এর জবাবে ইরান ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে সামুদ্রিক চলাচল সীমিত করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা আন্তর্জাতিক বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে এবং পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়িয়েছে। যেসব আরব দেশ নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকার কারণে ইরানের পাল্টা হামলার শিকার হয়েছে, তাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে বিঘ্নের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
এই সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা-ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন আরো জোরালো হয়েছে।
ইরানের জন্য কূটনৈতিক সুযোগ
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া কৌশলগত সুবিধাকে আলোচনার টেবিলে কাজে লাগানো। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, দেশের মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগও তেহরানের অগ্রাধিকারে থাকা উচিত। আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমাতে পারলে ইরানের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথও সহজ হতে পারে।
তবে এ সুযোগ দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং আলোচনার পরিবেশ বদলে যেতে পারে। তাই সময় নষ্ট না করে বাস্তবসম্মত সমঝোতার পথে এগোনোর পরামর্শ দিয়েছেন গুল।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে চাপ চিরস্থায়ী নয়
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। এই জলপথে চলাচল ব্যাহত হলে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। সংঘাতের সময় এই পথের ওপর ইরানের প্রভাব দেশটিকে কৌশলগত সুবিধা দিলেও, এ সুবিধাকে স্থায়ী ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প জ্বালানি পরিবহনপথ ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলতে পারে। ফলে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতা কমলে ইরানের হাতে থাকা কৌশলগত চাপ প্রয়োগের সুযোগও সংকুচিত হতে পারে।
এ কারণে শুধু সামরিক বা ভূরাজনৈতিক প্রভাবের ওপর নির্ভর না করে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অর্জন নিশ্চিত করাই ইরানের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
চীনের প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনা
সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-অংশীদার হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি চীনের জন্যও প্রভাব বিস্তারের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিকল্প অংশীদার খুঁজতে আগ্রহী হলে বেইজিংয়ের ভূমিকা আরো বাড়তে পারে।
তবে ইরানের জন্য কেবল বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ নেওয়াই যথেষ্ট নয়। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের কল্যাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
সংঘাত নয়, সমঝোতার পথ
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও ইরানের সামনে আলোচনার মাধ্যমে অর্জন নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে। সর্বোচ্চ দাবি নিয়ে অনড় থাকার পরিবর্তে বাস্তবসম্মত সমঝোতা, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের উদ্যোগ এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগী হওয়া উচিত তেহরানের।
সামরিক সংঘাত আরো বাড়ালে ইরানসহ পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ক্ষতি বাড়বে। বিপরীতে, বর্তমান পরিস্থিতিকে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে এগিয়ে নিতে পারলে ইরান দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা পেতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরানোর পথও প্রশস্ত হতে পারে।
সূত্র: দ্য জাপান টাইমস ও প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


