সংকটে ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থা, আরো উত্তপ্ত হচ্ছে পরিস্থিতি

সংকটে ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থা, আরো উত্তপ্ত হচ্ছে পরিস্থিতি

স্কুলের অব্যবস্থাপনা, শিক্ষকের সংকট, জরাজীর্ণ ভবন ও দীর্ঘ কর্মদিবসের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ করেছেন আড়াই লাখের বেশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক। মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন শহরে আয়োজিত বিক্ষোভে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করেছে। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষও হয়েছে। এদিন প্রায় ৫০০ জনকে আটক করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ৪৩ পুলিশ সদস্য।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসেবে মঙ্গলবার দেশজুড়ে প্রায় ২ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। এর মধ্যে প্যারিসে ছিলেন প্রায় ৫৬ হাজার মানুষ। তবে বিক্ষোভ আয়োজকদের দাবি, দেশজুড়ে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার। মার্সেই, নঁত, লিওঁসহ বিভিন্ন শহরে অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে হলেও প্যারিসসহ কয়েকটি স্থানে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু জানিয়েছেন, দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা বিক্ষোভে অন্তত ২১৫ কিশোর ও ৮৫ জন স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন। সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৭১৫ পুলিশ সদস্যও। তিনি এই পরিস্থিতিকে কয়েক দশকের মধ্যে ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছেন।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দেশের অনেক স্কুলে ভবন জরাজীর্ণ। কোথাও দেয়াল ও ছাদে ফাটল, কোথাও পানি চুইয়ে পড়া, ভাঙা শৌচাগার এবং পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিলের অভাব রয়েছে। অনেক স্কুলে শিক্ষকে সংকটও প্রকট। অনুপস্থিত শিক্ষকদের নিয়মিতভাবে বিকল্প শিক্ষক দিয়ে পূরণ করা হয় না। ফলে শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসও বাদ যাচ্ছে।

শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ স্কুল সময় নিয়েও ক্ষুব্ধ। অনেকের স্কুল সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলে। বিক্ষোভকারীরা স্কুলের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো এবং অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বিকল্প শিক্ষক দিয়ে পূরণের দাবি জানিয়েছেন।

ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দেশটির প্রায় ৩ হাজার ৭০০ উচ্চবিদ্যালয়ের মধ্যে ৯০০টির বেশি অবরুদ্ধ ছিল অথবা সেদিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়। শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবি, অবরুদ্ধ বা বন্ধ স্কুলের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৮০০। কোনো কোনো এলাকায় অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হয়েছে।

গত দুই সপ্তাহে বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতাও বেড়েছে। বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ স্কুলের সামনে আবর্জনার পাত্রে আগুন দিয়েছেন, বাসস্টপ ভাঙচুর করেছেন এবং পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়েছেন। পুলিশ টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অন্তত ২৪টি স্কুলে আগুন দেওয়া বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ৬ হাজার ১০০-এর বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। ১ হাজার ৮০০-এর বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা চলছে।

তবে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ফ্রান্সে বিক্ষোভ দমনে পুলিশের ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ শক্তি প্রয়োগ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে ১০টি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ।

বিক্ষোভে কয়েকজন কিশোর গুরুতর আহত হয়েছে। সোমবার উত্তর ফ্রান্সে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত উড়ে যায়। এর আগে তুর শহরে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। আর প্যারিসের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এক ১৪ বছর বয়সী কিশোরের দাঁত ও চোয়াল গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তার পরিবার জানিয়েছে। এসব ঘটনায় পুলিশের অস্ত্র ব্যবহারের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলো সমাধানের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বিকল্প শিক্ষক দিয়ে পূরণ, স্কুলের দীর্ঘ সময়সূচি পর্যালোচনা এবং জরাজীর্ণ ভবন সংস্কারের বিষয় রয়েছে। তবে তিনি একই সঙ্গে স্কুলে আগুন দেওয়া ও শিক্ষককে আক্রমণের নিন্দা জানিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ মঙ্গলবার রাতে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এই বিক্ষোভ সরকারের ওপর নতুন করে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। দেশটির অর্থনৈতিক সংকট, বড় বাজেট ঘাটতি ও ঋণের চাপের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে সরকারকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে।

বিক্ষোভে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থনও দেখা যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, কট্টর বামপন্থী দল লা ফ্রান্স ইনসুমিজ আন্দোলনকে উৎসাহিত করছে। দলটির নেতা ও প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জঁ-লুক মেলঁশোঁ অবশ্য শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন