একজনের মৃত্যু। কিন্তু সেই মৃত্যুই খুলে দিয়েছে বড় শঙ্কার দরজা। কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (ডিআরসি) থেকে উগান্ডা হয়ে কেনিয়ায় পৌঁছেছে ইবোলা। কেনিয়ায় এই ভাইরাসে প্রথম মৃত্যুর পর প্রশ্ন উঠেছে—রোগটি কি এরই মধ্যে আরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে?
মারা যাওয়া ব্যক্তি ডিআরসি থেকে স্থলপথে উগান্ডায় যান। সেখান থেকে বিমানে পৌঁছান কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে। দুই দেশের বিমানবন্দরে তাপমাত্রা পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের পরও তাকে শনাক্ত করা যায়নি। এতে উগান্ডাকে ইবোলামুক্ত ঘোষণা এবং কেনিয়ার সীমান্ত নজরদারি—দুই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, কেনিয়া এখন ঝুঁকিপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতে আরো লক্ষ্যভিত্তিক পরীক্ষা চালাচ্ছে এবং রোগ শনাক্তে নজরদারি জোরদার করছে। একই সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষদের শনাক্ত করে পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।
এবারের প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী বান্দিবুগিও ইবোলা ভাইরাস। চলতি বছর ডিআরসিতে শুরু হওয়া প্রাদুর্ভাবে ৮ হাজার ৩০০ জনের সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। মারা গেছেন অন্তত ৪ হাজার ১৪৮ জন। পরে ভাইরাসটি সীমান্ত পেরিয়ে উগান্ডায়ও যায়। সেখানে প্রায় ২০ জন আক্রান্ত হওয়ার পর জুলাইয়ে দেশটিকে ইবোলামুক্ত ঘোষণা করা হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার স্টেলেনবশ বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞানী উলফগ্যাং প্রেইজারের মতে, ভাইরাসটি যে গতিতে ছড়াচ্ছে, তাতে সীমান্ত পেরিয়ে নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার ঘটনা অব্যাহত থাকতে পারে।
তার ভাষায়, রোগীর সংখ্যা ও সংক্রমণের গতি অনেক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
ইবোলায় আক্রান্ত ব্যক্তি বা বন্যপ্রাণীর শরীরের তরলের সংস্পর্শে ছড়াতে পারে। উপসর্গ দেখা দিতে ২ থেকে ২১ দিন সময় লাগতে পারে। শুরুতে জ্বর, দুর্বলতা ও মাথাব্যথা হলেও পরে রক্তক্ষরণ, যকৃত ও কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়া এবং অঙ্গ বিকল হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এবারের ভাইরাসের ধরন বান্দিবুগিও। এর কোনো টিকা নেই। এর আগে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলার বড় প্রাদুর্ভাব হয়েছিল। ওই সময় অন্তত ১১ হাজার ৩০০ মানুষ মারা যান। তবে সেটি ছিল জাইর ধরনের ইবোলা, যার টিকা এখন রয়েছে।
কেনিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী আদেন দুয়ালে জানিয়েছেন, মৃত ব্যক্তি প্রায় এক মাস আগে ডিআরসিতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। গত ২ অক্টোবর তিনি সড়কপথে ডিআরসির বেনি হয়ে উগান্ডার রাজধানী কামপালায় যান। পরদিন বিমানে নাইরোবি পৌঁছান।
নাইরোবি বিমানবন্দরে নামার পর এক আত্মীয় ও এক বন্ধু তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তাকে দ্রুত আলাদা করা হয় এবং পরীক্ষায় ইবোলা শনাক্ত হয়। চিকিৎসা চললেও সোমবার তিনি মারা যান। মঙ্গলবার নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে তার দাফন করা হয়।
কেনিয়ার কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত তার সংস্পর্শে আসা ২৮ জনকে শনাক্ত করেছে। তার বিমানের ২৩ যাত্রী ও চার কর্মীকেও নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—বিমানবন্দরের কড়াকড়ি সত্ত্বেও আক্রান্ত ব্যক্তি কীভাবে নজরদারির ফাঁক গলে গেলেন?
উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এনতেব্বে বিমানবন্দরে পরীক্ষার সময় ওই ব্যক্তির তাপমাত্রা স্বাভাবিক ছিল। কেনিয়ার কর্মকর্তাদের ধারণা, নাইরোবিতে পরীক্ষার সময় তিনি উপসর্গ আড়াল করতে ওষুধ খেয়ে থাকতে পারেন। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন।
উগান্ডা ও কেনিয়ার বিমানবন্দরে যাত্রীদের একাধিকবার তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি ডিআরসিতে সাম্প্রতিক অবস্থান বা সংস্পর্শের তথ্য জানতে ডিজিটাল ফরম পূরণ করতে হয়। এখন উগান্ডার কর্মকর্তারা ওই ব্যক্তির পূরণ করা ফরম ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সীমান্তে পরীক্ষা বাড়িয়ে ইবোলা ঠেকানো যাবে না। আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত, আলাদা ও চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে হবে।
ডিআরসিতে পরিস্থিতি এরই মধ্যে জটিল হয়ে উঠেছে। দেশটির উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের সাতটি প্রদেশে ছড়িয়েছে ভাইরাসটি। পূর্বাঞ্চলের উত্তর কিভু প্রদেশে বর্তমানে নতুন রোগীর ৪০ শতাংশ শনাক্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছে সীমান্তহীন চিকিৎসক সংগঠন।
সংস্থাটির কর্মকর্তারা পরিস্থিতিকে ‘দাবানলের সঙ্গে লড়াইয়ের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। উত্তর কিভুর বুতেম্বো শহর ও আশপাশে প্রায় ২০ লাখ মানুষের জন্য ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে মাত্র চারটি। রোগীদের অন্যত্র স্থানান্তর করতে হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে।
ডিআরসিতে দুর্বল অবকাঠামো, সশস্ত্র সংঘাত, স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট ও ভুল তথ্যের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলেছে। সীমান্তপারের মানুষের চলাচলও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি।
স্টেলেনবশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ জ্যঁ বিসিমওয়া নাচেঙ্গার ভাষায়, ভাইরাস কোনো দেশের সীমান্ত মানে না। তাই ইবোলা নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক সহযোগিতাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

