বিদেশে মার্কিন কর্মকর্তাদের হত্যার পরিকল্পনা ইরানের, চিন্তায় ট্রাম্প প্রশাসন

বিদেশে মার্কিন কর্মকর্তাদের হত্যার পরিকল্পনা ইরানের, চিন্তায় ট্রাম্প প্রশাসন

বিদেশে মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে প্রাণঘাতী হামলার পরিকল্পনা করছে ইরান—এমন গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি ‘উন্নত পর্যায়ে’ রয়েছে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে কূটনৈতিক মিশনগুলোতে কর্মীর সংখ্যা কমিয়ে আনছে ওয়াশিংটন।

বিজ্ঞাপন

মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস ও নিউইয়র্ক টাইমস এ তথ্য জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যখন ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে, তখন এ সতর্কবার্তা এল। নতুন হামলা হলে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে তেহরান। এর অংশ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রতলের যোগাযোগের তারগুলোতেও হামলা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক জে ক্লেটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাঠানো এক স্মারকলিপিতে এ সতর্কতার কথা জানান। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস প্রথম স্মারকলিপিটির খবর প্রকাশ করে। এতে ক্লেটন লেখেন, ইরান বিদেশে মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে বলে গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাগুলো। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে প্রাণঘাতী হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি ‘উন্নত পর্যায়ে’ রয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসও স্মারকলিপিটির খবর প্রকাশ করেছে। সংবাদমাধ্যমটির বরাতে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাষ্ট্রদূতসহ মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর হামলার হুমকি মূল্যায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ইউরোপের কয়েকটি দেশেও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করেছে ইরান—এমন তথ্য পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তারা।

ওই কর্মকর্তারা আরো বলেছেন, কিছু গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরানের হয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সক্রিয় রয়েছেন।

তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার প্রকাশ্যে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য দেয়নি। নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের পক্ষে একজন মার্কিন কর্মকর্তা স্মারকলিপিটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের উদ্ধৃত আরেক কর্মকর্তা অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ও অন্য দেশে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তার ভাষ্য, ইরানের অনেক পরিকল্পনা থাকলেও সেগুলো সব বাস্তবায়ন করার মতো সক্ষমতা দেশটির নেই।

কেন এখন উদ্বিগ্ন ট্রাম্প প্রশাসন

মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের জন্য ইরানের হুমকিকে এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ের বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই মূল্যায়নের কারণেই সম্প্রতি ওই অঞ্চলে কর্মরত কিছু মার্কিন কর্মকর্তাকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এর পাশাপাশি, আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আলোচনা চলছে বলে খবর পাওয়া গেছে। শুক্রবার ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘আরেকটি ছোট এপিক ফিউরি’ অভিযান চালাতে পারে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধের সাংকেতিক নাম ছিল ‘এপিক ফিউরি’।

গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে মার্কিন দূতাবাসের অপ্রয়োজনীয় কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের অবকাঠামোর ওপর হুমকি বেড়ে যাওয়াকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কয়েকটি দেশে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনেও কর্মীর সংখ্যা কমানো হয়েছে বলে খবর প্রকাশ করেছে একাধিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম। সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, জর্ডান ও লেবাননে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলোতেও এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, হুথিদের হামলার হুমকির পাশাপাশি ‘মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইরানের সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা’ কর্মী কমানোর সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে।

ইরানের পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি

গোয়েন্দা স্মারকলিপিতে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনার অভিযোগ নিয়ে তেহরান এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে ইরানের কর্মকর্তারা এর আগে বারবার মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক ঘাঁটিতে হামলার হুমকি দিয়েছেন। এসব ঘাঁটিতে হামলাও চালানো হয়েছে।

পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ২১ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।

গত বুধবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা শুরু করলে তেহরান নতুন ‘আক্রমণাত্মক’ কৌশল অনুসরণ করবে। আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, ইরান আর শুধু পাল্টা হামলার মধ্যে নিজেদের সামরিক অভিযান সীমাবদ্ধ রাখবে না।

তার দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মান, পাল্লা ও আঘাত হানার ক্ষমতা বেড়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নতুন করে হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রতলের যোগাযোগের তারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার বিস্তারিত পরিকল্পনা রয়েছে ইরানের।

এ বিষয়ে ইরানের নিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ দুই কর্মকর্তার বরাত দিয়েছে সংবাদ সংস্থাটি।

এর আগে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরু হলে পুরো অঞ্চলের যোগাযোগের তার, তথ্য সংরক্ষণকেন্দ্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক স্থাপনায় হামলা হতে পারে।

আগেও হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

মার্কিন নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনার অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ করে আসছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে।

চলতি বছরের মার্চে এক পাকিস্তানি নাগরিককে ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্য রাজনীতিকদের হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার দায়ে মার্কিন আদালত দোষী সাব্যস্ত করেন। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নির্দেশে তিনি ওই পরিকল্পনা করেছিলেন।

২০২২ সালে আইআরজিসির এক সদস্যের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনকে হত্যার চেষ্টা করার অভিযোগ আনা হয়। মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি ওয়াশিংটন ডিসি বা মেরিল্যান্ডে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রে থাকা কয়েকজনকে তিন লাখ ডলার দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছিল, ইরান বিশ্বজুড়ে মার্কিন নাগরিকদের সরাসরি হুমকি দেওয়া অব্যাহত রাখবে। বিশেষ করে, ২০২০ সালে আইআরজিসির কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানি হত্যার সঙ্গে জড়িত বলে ইরান যেসব মার্কিন কর্মকর্তাকে মনে করে, তাঁদের লক্ষ্যবস্তু করার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল।

এ মাসে যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ডে অবস্থিত একটি বিমানঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্র আকস্মিকভাবে তাদের বোমারু বিমান সরিয়ে নেয়। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়। ওই ঘাঁটিতে নিরাপত্তাসংক্রান্ত একটি ঘটনার পর যুক্তরাজ্য কয়েকজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধে ইরানের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করার সন্দেহ রয়েছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন