যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন হামলার জবাব দিতে প্রস্তুত বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা বলেছেন, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইরানের সমুদ্রসীমায় বা এর আশপাশে প্রবেশের চেষ্টা করলে সেগুলোতে হামলা চালানো হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর কথা বিবেচনা করছেন। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
শুক্রবার ফ্লোরিডায় এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ‘এপিক ফিউরি’ অভিযান চালাতে পারে। যুদ্ধের শুরুতে ইরানে ব্যাপক বোমা হামলার অভিযানের নাম ছিল ‘এপিক ফিউরি’। এর আগে ট্রাম্প যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে বড় ধরনের হামলা চালানো অথবা অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার বিষয়টি বিবেচনা করেছিলেন।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আলি আবদোল্লাহি শনিবার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, মার্কিন নৌবাহিনী আর ইরানের সমুদ্রসীমা বা এর আশপাশে প্রবেশ করতে পারবে না। যেকোনো জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা ইরানের রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আবদোল্লাহি বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট শুধু স্বপ্নই দেখতে পারেন যে তাদের সেনা ও সামরিক বাহিনী আবার পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করবে। এই ইচ্ছা তারা চিরতরে কবরেই নিয়ে যাবেন।’
ইরানের সামরিক সক্ষমতা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে বলে যুক্তরাষ্ট্র যে দাবি করছে, তার সঙ্গে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও সহায়ক জাহাজগুলোকে ইরানের কাছাকাছি না আনার সিদ্ধান্তের মিল নেই বলেও মন্তব্য করেন আবদোল্লাহি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আকস্মিক হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে ইরান। দেশটির নেতারা বলেছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে ফেলে দেবেন। এই সংঘাত পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে।
হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা, বাড়ছে তেলের দাম
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের হামলার ঝুঁকি এখনো কাটেনি। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়েছে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৭ ডলারে পৌঁছায়, যা এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, বৃহস্পতিবার ভোরের আগে সাতটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে বা সেগুলো মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শুক্রবার তারা দাবি করে, দুটি সুপারট্যাংকার মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আইআরজিসি আরো জানিয়েছে, তাদের সামরিক কৌশল এখন আরো আক্রমণাত্মক।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবে কর্মরত অনেক কূটনীতিককে দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলো থেকেও মার্কিন কর্মকর্তাদের সরিয়ে নেওয়া হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রণাঙ্গনে উত্তেজনা
ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রেখেছে। শনিবার তারা আবারও রিয়াদে হামলা চালিয়েছে। এর আগে কয়েক দিনে দাম্মাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও শায়বাহ তেলক্ষেত্র লক্ষ্য করেও হামলা চালানো হয়। জবাবে সৌদি বাহিনী ইয়েমেনের মারিব, তাইজসহ হুথি-নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় বোমা হামলা চালিয়েছে।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলেও শুক্রবার ইসরাইলি হামলা হয়েছে। নাবাতিয়েহর কাছে বিমান হামলা চালানো হয়। এ ছাড়া জাওতার আশ-শারকিয়াহ এলাকায় কামানের গোলাবর্ষণ করা হয়েছে। ইরান এই রণাঙ্গনকে চলমান যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর আগে তেহরান বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো যুদ্ধবিরতি হলে তাতে লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
অন্যদিকে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অধিকৃত পশ্চিম তীরে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন। হেবরনে ফিলিস্তিনিদের হামলায় দুই ইসরাইলি সেনা নিহত হওয়ার পর এ নির্দেশ দেওয়া হয়। ইসরাইলে আগামী ২৭ অক্টোবর নির্বাচন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ পরিস্থিতিতে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও যুদ্ধের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।
গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করে ইসরাইলেও হামলা চালিয়েছে হুথিরা। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা এখন একাধিক রণাঙ্গনের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
নেতানিয়াহু আবারও ইরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছেন। এদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকেরা দাবি করেছেন, তেহরান ‘ডেড হ্যান্ড’ নামে পরিচিত একটি পাল্টা আঘাতের কৌশল সক্রিয় করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের শীর্ষ নেতাদের আবারও হত্যা করা হলে দেশটির ৩১টি প্রদেশ থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও আঞ্চলিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হতে পারে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালালে সমুদ্রতলের ইন্টারনেট ও যোগাযোগের তারগুলোও তাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস শনিবার মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন স্থানে মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর প্রস্তুতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে ইরান।
ইস্তাম্বুলে কূটনৈতিক বৈঠক
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা চললেও আলোচনায় অগ্রগতি হয়নি। শুক্রবার ইস্তাম্বুলে আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিনিধিরা বৈঠক করেন। তবে সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। বৈঠকে তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান, মিসর, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা অংশ নেন।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, নতুন করে হামলা হলে যুদ্ধ পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপ কোনো সমাধান নয় এবং কেউই তা সমর্থন করছে না। অন্যদিকে, জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার জন্য ইরান ও হুথিদের দায়ী করেন।
চারটি আঞ্চলিক দেশের এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরাইলের দখলদারত্বই এ অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার প্রধান উৎস। দেশগুলো জুনে স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তারা আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধান এবং হরমুজ প্রণালিতে অবাধে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষ ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার বিরোধিতা করেছে এবং সৌদি আরব ও লোহিত সাগরে দেশটির নৌ-বাণিজ্যিক স্বার্থের ওপর হুথিদের হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম নূর নিউজ বলেছে, ইস্তাম্বুলের বৈঠক কূটনৈতিক বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তুলে ধরেছে। তাদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে আগে ছাড় দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের দাবিগুলো মেনে নেওয়া এবং ইরান ও ইয়েমেনে হামলার দায় স্বীকার না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরান রাজি হবে না।
নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা
শনিবার ইরানের সংবাদপত্রগুলোতে যুদ্ধের আশঙ্কা ও তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। দেশটির কট্টরপন্থি পত্রিকা ‘ভাতান-এ এমরোজ’ ব্রেন্ট তেলের দাম ১১৭ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়াকে ট্রাম্পের জন্য ‘অপমানের প্রমাণ’ বলে উল্লেখ করেছে। সংস্কারপন্থি পত্রিকা ‘এতেমাদ’ লিখেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, আরেক দফা তীব্র সংঘাতের ‘শূন্য ঘণ্টা’ এগিয়ে আসছে।
তেহরানভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক রেজা নাসরি বলেছেন, কয়েক দশক ধরে হামলা, পারমাণবিক কর্মসূচিতে নাশকতা, নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গের অভিজ্ঞতার পর ইরান আর আগের অবস্থায় ফিরতে চায় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ইরান আর বোমা হামলার মধ্যে থেকে আলোচনা করবে না, অন্য পক্ষ যেসব চুক্তিকে ইচ্ছামতো মানে বা অমান্য করে, সেগুলো মেনে চলবে না। শিশুদের হত্যা ও মানুষের দারিদ্র্যকে নিয়মিত নীতির অংশ হিসেবেও মেনে নেবে না। এই চক্রের অবসান ঘটাতে ইরান প্রয়োজনীয় সব উপায় ব্যবহার করবে।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

