ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচনকে নিজের জীবদ্দশার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে দেখছেন দেশটির নাগরিকরা। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাস করলেও ভোট দিতে প্রায় ৬০০০ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ইসরাইলে ফিরছেন এক ইসরাইলি নাগরিক। তবে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি এমন হাজারো নাগরিক বার্লিন থেকে ব্রুকলিন—বিশ্বের বিভিন্ন শহর থেকে ইসরাইলে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের লক্ষ্য, দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ওই ইসরাইলি নাগরিক জানিয়েছেন, বিদেশে বসবাসরত নাগরিকদের জন্য ইসরাইলে ডাকযোগে বা অনুপস্থিত অবস্থায় ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই ভোট দিতে হলে নির্বাচনের দিন দেশটিতে উপস্থিত থাকতে হবে। এ কারণে স্ত্রীকে নিয়ে উড়োজাহাজে ইসরাইলে ফিরছেন তিনি। তাঁদের তিন সন্তানকে বেবিসিটারের (শিশু পরিচর্যাকারী) কাছে রেখে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘মনে মনে প্রার্থনা করছি, যেন যুদ্ধ শুরু না হয় এবং আমরা সেখানে আটকা না পড়ি।
ইসরাইলের ওই নাগরিক আরো বলেন, আমরা এই যাত্রা করছি কারণ আমাদের সন্তানদের ফিরে আসার মতো একটি ঘর থাকা প্রয়োজন। আমি যাচ্ছি কারণ ইসরায়েলের বর্তমান সরকারকে আমি মেনে নিতে পারছি না এবং চাই তারা ক্ষমতা থেকে সরে যাক। তাছাড়া, একজন গর্বিত ইসরায়েলি হিসেবে আমি আমার দেশের প্রতি দায়িত্বগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে নিই। সেনাবাহিনী ডাকলে আমি সাড়া দিই, আবার নির্বাচনের সময় এলে আমি ভোটকেন্দ্রে হাজির হই—আমার কাছে এই দুটিই সমান দায়িত্ব।
তিনি বলেন, আমাদের অনেকেই আবার ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি। আমার পরিবারের আবাসস্থল হলো ‘ওয়াহাত আল-সালাম/নেভে শালোম’নামের একটি গ্রাম, যেখানে ইহুদি ও ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো পাশাপাশি থেকে তাদের সন্তানদের বড় করে তোলে। সেখানে আবার ফিরে যাওয়ার জন্য আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।
গত তিন বছরের যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতায় ইসরাইল আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার দেশের ভবিষ্যতের চেয়ে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার দিকেই বেশি মনোযোগী।
ইসরাইলি নাগরিক দাবি করেন, দেশটির গণতন্ত্র আজ ক্ষতবিক্ষত ও বৈষম্যপূর্ণ, তবুও এর অস্তিত্ব টিকে আছে। এই গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য মহাসাগর পাড়ি দিয়ে সেখানে যাওয়া তার কাছে একটি অপরিহার্য কর্তব্য। গত এক বছর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করার সময় তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছেন, বিশ্ব ইসরায়েলিদের কীভাবে দেখে। কেবল ইসরায়েলি হওয়ার কারণে শিল্পকলা ও চলচ্চিত্র—যার মধ্যে আমার নিজের কাজও রয়েছে—বয়কট করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, বিশ্ব আমাদের সবাইকে আমাদের কট্টরপন্থী সরকারের সাথে গুলিয়ে ফেলছে।
তিনি স্বীকার করেন, প্রথমে দেশে ফিরে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কথাও ভেবেছিলেন। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে যাওয়া, ভোট দেওয়া এবং দীর্ঘ বিমানযাত্রার পর সময়ের পার্থক্যজনিত ক্লান্তি—সব মিলিয়ে বিষয়টি কঠিন মনে হয়েছিল তাঁর কাছে।
কিন্তু পরে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে তাঁর। ইসরাইলি যাত্রীতে ভরা একটি বিমান ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছিল। বিমানের ককপিটে এক হামলাকারী ছিল এবং বিমানটি দেশের জাতীয় বিমানবন্দরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। যাত্রীরা উদ্ধারের অপেক্ষায় বসে না থেকে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে হামলাকারীকে কাবু করেন। এতে শেষ মুহূর্তে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়।
ওই ঘটনার সঙ্গে দেশের বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে তিনি বলেন, ইসরাইলও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। দেশকে এই অবস্থা থেকে টেনে তোলার জন্য কেউ এগিয়ে আসছে না। তাই নিজেদেরই উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘৭ অক্টোবর আমি ইসরাইলের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। আর ২৭ অক্টোবর দেশে ফিরছি—লড়াই করতে, যেন এমন একটি দেশ টিকে থাকে, যা সবার জন্য উপযুক্ত।’
শেষে তিনি বলেন, ‘পালিয়ে যাব, নাকি লড়াই করব? আমি দুটোই বেছে নিচ্ছি।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


