হিমবাহ ধস ও বন্যার আগাম পূর্বাভাস কি সম্ভব

হিমবাহ ধস ও বন্যার আগাম পূর্বাভাস কি সম্ভব
ছবি: সংগৃহীত।

নেপালে বুধবারের ভয়াবহ ভূমিধস ও বন্যায় মারাত্মক বিপর্যয় নেমে এসেছে। হিমালয়ের একটি নদী উপত্যকা দিয়ে হঠাৎ পানি, পাথর ও কাদার প্রচণ্ড স্রোত নেমে এসে অসংখ্য বাড়িঘর, সেতু, সড়ক ও মানুষকে ভাসিয়ে নেয়। একই সঙ্গে ঘন কাদার স্তরের নিচে চাপা পড়ে আরও অনেকে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞানীরা এখনো ঠিক কী ঘটেছিল, তা নির্ধারণের চেষ্টা করছেন। তবে প্রাথমিক মূল্যায়নে ধারণা করা হচ্ছে, ভূমি থেকে হাজার হাজার ফুট ওপরে থাকা হিমবাহের একটি অংশ এবং এর পাশের পাহাড়ের খাড়া ঢালের একটি অংশ ভেঙে পড়ে। একসঙ্গে নেমে আসা ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ ছিল মিশরের প্রায় ৭০টি গিজার গ্রেট পিরামিডের সমান।

এই নির্দিষ্ট বিপর্যয়টি আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব হয়নি। তবে দ্রুত ও ভয়াবহভাবে হিমবাহ ভেঙে পড়ার মতো ঘটনা উষ্ণ হয়ে ওঠা বিশ্বে ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নজিরবিহীন গতিতে হিমবাহ গলছে। পাহাড়ের চূড়ায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা হিমবাহগুলো যথেষ্ট গলে গেলে নিচের জনপদ ও স্থাপনার ওপর ধসে পড়তে পারে।

কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এক্সপ্লোরার মোহন বাহাদুর চাঁদ বলেন, দ্রুত উষ্ণতা বৃদ্ধি ও হিমবাহ গলার গতি বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের সব হিমবাহ অঞ্চলই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কোথায় এই ধস ঘটছে, তার ওপর নির্ভর করে এর পরিণতি হতে পারে আকস্মিক বন্যা থেকে শুরু করে আকাশচুম্বী উচ্চতার মেগাসুনামি পর্যন্ত।

তবে সবকিছুই যে হতাশাজনক, তা নয় বলে মনে করেন কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ ঝুঁকি বিশেষজ্ঞ ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এক্সপ্লোরার আলটন বায়ার্স। তার মতে, কিছু বিপজ্জনক হিমবাহকে যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা হলে ধসে পড়ার আগে সেগুলো সতর্কতার সংকেত দিতে পারে। সঠিক পরিস্থিতিতে এমন ব্যবস্থা হাজারো মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।

হিমবাহ ধসের ভয়াবহ শক্তি

পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মহাদেশেই হিমবাহ রয়েছে। পাহাড়ের চূড়ায় আটকে থাকা এসব বরফস্তর গলতে, ফাটতে ও ধসে পড়তে শুরু করলে ভয়াবহ নানা ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে গলিত পানির প্রবল স্রোত থেকে শুরু করে তুষারধস ও ভূমিধসের ভয়ংকর সম্মিলিত প্রবাহ।

কোনো উঁচু ফিয়র্ডে (উঁচু পর্বতমালা দিয়ে ঘেরা গভীর, সংকীর্ণ এবং দীর্ঘ জলপথ) হিমবাহ ধসে পড়লে তৈরি হতে পারে মেগাসুনামি। ২০২৩ সালে পূর্ব গ্রিনল্যান্ডে বিশাল এক পাথর-বরফ ধস সংকীর্ণ জলভাগে পড়ে ৬৫০ ফুট উঁচু ঢেউ তৈরি করেছিল। ওই ঢেউ ফিয়র্ডের পাথুরে দেয়ালগুলোকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার ব্ল্যাটেন গ্রামেও এমন ধস ঘটেছিল, যেখানে ২০ মিলিয়ন টন ধ্বংসাবশেষের নিচে গ্রামটির বেশিরভাগ অংশ চাপা পড়ে যায়। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের লাংটাং লিরুং চূড়ার নিচে থাকা ভিত্তিপ্রস্তর ভেঙে পড়ার কারণে সাম্প্রতিক হিমালয়ের ধসটি ঘটেছিল।

সামনে আরো বাড়তে পারে ঝুঁকি

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও সমুদ্রের তাপমাত্রা যদি একইভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে আগামী কয়েক দশকে হিমবাহ-সম্পর্কিত বিপর্যয়ের ঝুঁকি আরও বাড়বে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা এবং সম্ভবত ধসের মাত্রাও বৃদ্ধি পাবে।

ক্রিস্টেন কুক, ফ্রান্সের গ্রেনোবল আল্পস ইউনিভার্সিটিতের একজন ভূ-প্রকৃতিবিদ বলেন, উঁচু পার্বত্য এলাকায় আরো বেশি অস্থিতিশীলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনাটি অত্যন্ত বড় হলেও অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের এ ধরনের ধস ভবিষ্যতেও ঘটতে থাকবে।

হিমালয় অবশ্য একমাত্র ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল নয়। পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার কর্দিয়েরা ব্লাঙ্কা এলাকায় ১৯৪০-এর দশক থেকেই ভয়াবহ হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার ঘটনা ঘটছে। এসব হিমবাহ তুলনামূলক কম উচ্চতায় থাকায় দ্রুত উষ্ণতার প্রভাব পড়ছে।

তবে হিমালয়ের ঝুঁকি বিশেষভাবে বেশি। কারণ এখানে খাড়া পাহাড়ের ওপর বিপুলসংখ্যক হিমবাহ রয়েছে এবং সেগুলোর নিচে রয়েছে গভীর নদী উপত্যকা। এসব উপত্যকায় বসতি, সড়কসহ নানা অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, হিমালয় অঞ্চলের ২১০টি হিমবাহ হ্রদ আকস্মিক বন্যার মাধ্যমে মানববসতির জন্য সম্ভাব্য হুমকি তৈরি করছে।

আগাম সতর্কতায় বাঁচানো সম্ভব প্রাণ

তবে মানুষ পুরোপুরি অসহায় নয়। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে হিমবাহ গলন ঠেকানোর দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি উন্নত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমেও প্রাণহানি কমানো সম্ভব। ২০২৫ সালের যে তুষারধসে সুইজারল্যান্ডের ব্লাটেন গ্রাম চাপা পড়েছিল, তা একটি বিপর্যয় ছিল, কিন্তু সেই গ্রামের কেউই মারা যাননি: ধস ঘটার নয় দিন আগেই স্থানীয়দের এবং তাদের পশুদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

গবেষক বেঞ্জামিন বেলভাল্ড জানান, ১৯৯০-এর দশক থেকেই ওই হিমবাহটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের শুরুতে সেখান থেকে ঘন ঘন পাথর পড়তে থাকায় বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকেরা সতর্ক হন। স্থানীয় বাসিন্দাদের নজরদারি এবং বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণে দ্রুত ধসের আশঙ্কার প্রমাণ পাওয়া যায়।

বেলভাল্ডের ভাষায়, স্পষ্ট ও উন্মুক্ত যোগাযোগের কারণে নির্বিঘ্নে মানুষ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। এতে শেষ পর্যন্ত ব্লাটেনের কোনো বাসিন্দার মৃত্যু হয়নি। যদিও অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার।

হিমালয়েও এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ চলছে। নেপালের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্ভাব্য হিমবাহ-ধসের স্থান চিহ্নিত করা, ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি এবং স্থানীয় জনগণের প্রস্তুতি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আল্পসের তুলনায় হিমালয় বিশাল অঞ্চল হওয়ায় পুরো এলাকাকে পর্যবেক্ষণ করা অনেক কঠিন। তাছাড়া সব হিমবাহ ধসে পড়ার আগে একই ধরনের সতর্ক সংকেত দেয় না।

মোহন বাহাদুর চাঁদের মতে, অত্যাধুনিক ও নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকলে আগাম সতর্কতা কার্যকর হতে পারে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে সুইজারল্যান্ডের মতো পর্যাপ্ত অর্থ ও প্রযুক্তি নিশ্চিত করা কঠিন।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো নদী ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় অপরিকল্পিত নির্মাণ ও নগরায়ণ। এসব এলাকায় মানুষের বসতি ও অবকাঠামো যত বাড়বে, ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ে প্রাণহানির আশঙ্কাও তত বাড়বে।

পরবর্তী হিমবাহ ধস ঠিক কখন বা কোথায় ঘটবে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামনে আরও বেশি হিমবাহ-সম্পর্কিত দুর্যোগের মুখোমুখি হতে পারে বিশ্ব।

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফি

এমএমআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন