কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে দ্রুতগতিতে ডেটা সেন্টার নির্মাণ করছে চীন। দেশটির ইনার মঙ্গোলিয়া অঞ্চলের উলানচাব শহরে একের পর এক বিশাল ডেটা সেন্টার গড়ে উঠছে। সস্তা জমি, বিপুল বিদ্যুৎ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সহজলভ্যতা কাজে লাগিয়ে এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে বেইজিং।
চীনের উত্তরাঞ্চলে গোবি মরুভূমির কাছাকাছি অবস্থিত উলানচাব শহরে বর্তমানে প্রায় ৯০টি ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। দুই বছরের মধ্যে শহরটির বায়িন বিগ ডেটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের বড় অংশ গড়ে ওঠা চীনের দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণ সক্ষমতারই প্রমাণ।
তবে এআই প্রতিযোগিতায় চীনের সামনে বড় বাধা উন্নতমানের চিপের সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় চীনের কোম্পানিগুলো এখনো অত্যাধুনিক এআই চিপ ও কম্পিউটিং সক্ষমতায় পিছিয়ে রয়েছে। তারপরও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ, বিস্তৃত জ্বালানি অবকাঠামো এবং দ্রুত নির্মাণকাজের সুবিধা কাজে লাগিয়ে এই ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করছে দেশটি।
এআই অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগ বেইজিংয়ের
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে চীনের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি এআই ডেটা সেন্টার ছিল। কম্পিউটিং সক্ষমতার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে। এর অন্যতম কারণ, মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো এনভিডিয়া ও এএমডির মতো কোম্পানির উন্নত চিপ ব্যবহারের সুযোগ পায়, যা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সীমিত।
তবে চীন এআই প্রযুক্তিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। দেশটির অর্থনীতি মন্থর হয়ে আসা এবং জনসংখ্যা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে উৎপাদন, শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও দৈনন্দিন জীবনে এআইয়ের ব্যবহার বাড়াতে চায় সরকার।
গত জুলাইয়ে সাংহাইয়ে এক আন্তর্জাতিক এআই সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, তার দেশ এআইকে উন্মুক্তভাবে গ্রহণ করেছে। উৎপাদনশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে এ প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
চীনের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে ইতোমধ্যে ৭০ কোটির বেশি মানুষ এআই ব্যবহার করছেন। বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীর চাহিদা পূরণ এবং বিভিন্ন খাতে এআইয়ের প্রয়োগ বাড়াতে প্রয়োজন হচ্ছে ব্যাপক কম্পিউটিং সক্ষমতা।
এ লক্ষ্যেই আগামী পাঁচ বছরে তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামো সম্প্রসারণে ৫৬ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে বেইজিং। এর আওতায় কম্পিউটিং সুবিধা ও ডেটা সেন্টার নির্মাণও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগ বাড়ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান রোডিয়াম গ্রুপের হিসাব অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত চীনা কোম্পানিগুলোর এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ চলতি বছর দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ১৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সম্ভাব্য ৮০ হাজার কোটি ডলারের এআই ডেটা সেন্টার বিনিয়োগের তুলনায় তা এখনো অনেক কম।
উন্নত চিপের সংকট বড় বাধা
ডেটা সেন্টার নির্মাণ করলেই এআই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এসব স্থাপনায় বিপুলসংখ্যক সার্ভার এবং উন্নত চিপ প্রয়োজন, আর এই জায়গাতেই চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে চীন।
যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে এনভিডিয়া ও এএমডির নির্দিষ্ট কিছু উন্নত এআই চিপ সংগ্রহ করতে পারছে না চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে, তুলনামূলক কম শক্তিশালী কিছু চিপ আমদানির ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বেইজিং।
চীনের নিজস্ব চিপ নির্মাতারা দ্রুত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। হুয়াওয়ের মতো প্রতিষ্ঠান একাধিক চিপ একত্র করে এমন কম্পিউটিং সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে, যা আরও শক্তিশালী চিপের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে এই পদ্ধতিতে অনেক ক্ষেত্রে বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষক নিক করভিনোর মতে, একটি ডেটা সেন্টার নির্মাণের সামগ্রিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে চিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ চীনের কাছে প্রয়োজনীয় চিপের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই।
বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সুবিধা
উন্নত চিপের ঘাটতি থাকলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক। দেশটি বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যতটা বেড়েছে, তা ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সমপরিমাণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া চীনে সৌর ও বায়ুশক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার এবং গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনে অব্যবহৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ এত বেশি ছিল যে তা দিয়ে মেক্সিকোর এক বছরের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভব হতো।
এই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কাজে লাগাতে ডেটা সেন্টার নির্মাণে জোর দিচ্ছে বেইজিং। বিশেষ করে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় ও গ্রামীণ এলাকায় যেখানে জমি, সূর্যালোক ও বাতাস সহজলভ্য, সেখানে এসব স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে।
‘ইস্টার্ন ডেটা, ওয়েস্টার্ন কম্পিউট’ নামে পরিচিত এ কৌশল ২০২২ সালে চালু করা হয়। এর আওতায় চীন আটটি জাতীয় কম্পিউটিং হাব ও ১০টি জাতীয় ডেটা সেন্টার ক্লাস্টার নির্ধারণ করেছে। পরিকল্পনাটির লক্ষ্য হলো, পূর্বাঞ্চলের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে তৈরি হওয়া ডেটা পশ্চিমাঞ্চলের কম্পিউটিং অবকাঠামোতে প্রক্রিয়াকরণ করা এবং একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক কাইল চ্যানের মতে, দ্রুত জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাইছে চীন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ গ্রিড সম্প্রসারণের গতি কম থাকায় নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্রিড সংযোগের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ দেখা দিচ্ছে।
তবে চীনের পশ্চিমাঞ্চলের সব ডেটা সেন্টার সমানভাবে কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পূর্বাঞ্চলের কিছু শহর থেকে দূরবর্তী অবস্থানের কারণে নির্দিষ্ট কিছু কাজের ক্ষেত্রে দ্রুত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি, প্রয়োজনীয় চিপ, গ্রাহক কিংবা পর্যাপ্ত ব্যবহারকারী ছাড়াই সরকারি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কিছু ডেটা সেন্টার নির্মিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
উলানচাবে সবুজ জ্বালানিনির্ভর ডেটা সেন্টার
একসময় কয়লা উৎপাদনের জন্য পরিচিত ইনার মঙ্গোলিয়া এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। বিস্তীর্ণ এলাকায় সৌরবিদ্যুতের প্যানেল এবং বায়ু টারবাইন স্থাপন করা হয়েছে। উলানচাবের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার প্রায় অর্ধেকই আসে বায়ু ও সৌরশক্তি থেকে।
শহরটির বায়িন শিল্পাঞ্চলের বাইরে কয়েক মাইল দূরে এনভিশন কোম্পানি নির্মাণ করছে ‘গ্যালাক্সি ক্যাম্পাস’ নামে একটি বড় এআই ডেটা সেন্টার। আয়তনের দিক থেকে এটি বিশ্বের বৃহত্তম ডেটা সেন্টারগুলোর একটি হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত হচ্ছে।
এনভিশনের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি সরাসরি কোম্পানির পরিচালিত বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রচলিত বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমবে। ব্যাটারি ব্যবস্থার মাধ্যমে বায়ু থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি, সার্ভারের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ দ্রুত সমন্বয়ের জন্য অত্যাধুনিক সলিড-স্টেট ট্রান্সফরমার ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
ডেটা সেন্টারের কারণে পানির ব্যবহার ও শীতলীকরণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এনভিশনের কর্মকর্তাদের দাবি, উলানচাবের ঠান্ডা আবহাওয়া শীতলীকরণের প্রয়োজন কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া তাদের ব্যবস্থায় প্রচলিত পানি-নির্ভর শীতলীকরণের পরিবর্তে শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত অ্যালকোহলভিত্তিক কুল্যান্ট দিয়ে পরিচালিত ‘জিরো-ওয়াটার’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিকি ঝেং জানান, পরিকল্পিত দুই গিগাওয়াট সক্ষমতার প্রকল্পের প্রথম ধাপের পুরো সক্ষমতা ইতোমধ্যে বুকিং হয়ে গেছে। এআই ও ক্লাউড সেবার চাহিদা মেটাতে পরবর্তী ধাপের নির্মাণকাজও চলছে। তবে কেন্দ্রটিতে ব্যবহৃত চিপ ও সার্ভার সরবরাহ করবে গ্রাহক প্রতিষ্ঠানগুলো। ঝেংয়ের ভাষ্য, আগামী ১০ বছরের এআই চাহিদার কথা মাথায় রেখে প্রকল্পটি নকশা করা হয়েছে।
চীনের কৌশল কতটা সফল হবে?
চীনের দ্রুত ডেটা সেন্টার নির্মাণ, সাশ্রয়ী জমি এবং নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার দেশটির এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে উলানচাবের মতো অঞ্চলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কম্পিউটিং সক্ষমতাকে একই জায়গায় যুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তব রূপ পাচ্ছে।
তবে অবকাঠামো নির্মাণের গতি একাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবধান ঘোচানোর নিশ্চয়তা দেয় না। উন্নত চিপের পর্যাপ্ত সরবরাহ, প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা এবং দূরবর্তী কেন্দ্র থেকে দ্রুত তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা—সবই চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
এখন দেখার বিষয়, বিপুল বিদ্যুৎ ও দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণের সুবিধা কাজে লাগিয়ে চীন উন্নত চিপের সীমাবদ্ধতা কতটা কাটিয়ে উঠতে পারে। কারণ আগামী দিনের এআই প্রতিযোগিতায় শুধু ডেটা সেন্টারের সংখ্যা নয়, সেগুলোর প্রকৃত কম্পিউটিং ক্ষমতা ও কার্যকর ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

