দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

সব ‘ককরোচ’ একযোগে বেড়িয়ে এলে কী ঘটবে ভারতে

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

সব ‘ককরোচ’ একযোগে বেড়িয়ে এলে কী ঘটবে ভারতে

ভারতের তরুণদের প্রতি আহ্বানটি ছিল সহজ, ‘শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাতে দিল্লির রাস্তায় নামতে প্রস্তুত হও’। সেই আহ্বানে বেরিয়ে আসেন হাজার হাজার তরুণ।

শনিবার অনুষ্ঠিত হলো ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) প্রথম প্রকাশ্য বিক্ষোভ। মূলত ঠাট্টা-বিদ্রু প আর ব্যঙ্গের মধ্য দিয়ে দলটির জন্ম। ব্যঙ্গাত্মক এই উদ্যোগ দ্রুতই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। দলটি এখন দেশের ডানপন্থি নরেন্দ্র মোদি সরকারের অদম্য ক্ষমতার বিরুদ্ধে অন্যতম অপ্রত্যাশিত এক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, যিনি এই প্রাণবন্ত বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিতে শনিবার সকালেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়ে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এ দেশের তরুণেরা আর ভয় পাবে না, তারা লড়াই করবে।’

দীপকে বলেন, ‘সরকারের কাছে আমরা হয়তো নিছক পোকামাকড়, কিন্তু আমরা জীবিত এবং আমাদের অধিকারের জন্য লড়াই করতে সক্ষম।’

কড়া পুলিশি পাহারার মধ্যে সমবেত হওয়া জেন-জি ও মিলেনিয়াল প্রজন্মের অনেকেই আশা প্রকাশ করছেন যে, প্রতিবেশী দেশ নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় সরকার পতনকারী আন্দোলনের মতো একটি যুব নেতৃত্বাধীন আন্দোলন ভারতেও গতি পেতে পারে। দিল্লির ২১ বছর বয়সি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী কৃতী বলেন, ‘এখানকার তরুণেরাও যথেষ্ট ভোগান্তির শিকার হয়েছে।’

সিজেপির পেছনের এই জোয়ার অনেককেই অবাক করেছে। বিশেষ করে দীপকে, যিনি মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও বোস্টন ইউনিভার্সিটির একজন ভারতীয় স্নাতক হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক শান্ত জীবনযাপন করছিলেন।

সুপ্রিম কোর্টের এক শুনানিতে ভারতের প্রধান বিচারপতি ভারতের বেকার যুবকদের ‘পরজীবী’ এবং ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তার এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েই দীপকে হঠাৎ করে সামাজিক মাধ্যমে মজা করে একটি আহ্বান জানান, ‘সব তেলাপোকা একজোট হলে কেমন হয়?’

এই ডাকে বিপুল সাড়া পান দীপকে। বুঝতে পারেন মানুষের মনের গভীরে আঘাত করতে পেরেছেন তিনি। পরে তিনি মোদির শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) বিদ্রুপ করে ব্যঙ্গাত্মক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি ওয়েবসাইট এবং সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট তৈরি করেন। এর সঙ্গে ছিল সরকারকে লক্ষ্য করে একটি কড়া ইশতেহার ও একটি ট্যাগলাইন: ‘সেই সব মানুষের জন্য একটি রাজনৈতিক দল, যাদের হিসাবে আনতে ভুলে গেছে প্রশাসন।’

দুই সপ্তাহের মধ্যেই সিজেপির ইনস্টাগ্রাম পেজের ফলোয়ারের সংখ্যা ২২ মিলিয়নেরও বেশি হয়ে যায়, যা শাসক দল বিজেপিকে অনেক পেছনে ফেলে দেয়। এর কিছুদিন পরেই, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণু হিসেবে পরিচিত মোদি সরকার জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এক্সে তাদের অ্যাকাউন্টটি ব্লক করার চেষ্টা করে।

যদিও শুরুতে এটি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের আবরণে ঢাকা ছিল, এখন ভারতের বহু জেন-জি এবং মিলেনিয়াল প্রজন্মের কাছে সিজেপি শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং চাকরির বাজার নিয়ে তাদের ক্রমবর্ধমান হতাশার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতের ২৫ বছরের কম বয়সি স্নাতকদের প্রায় ৪০ শতাংশই বেকার।

এই ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন একটি অনলাইন ঘটনা থেকে সত্যিকারের রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত হতে পারবে কি না, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে। কারো কারো কাছে শনিবার হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি ছিল উৎসাহব্যঞ্জক। আবার অন্যরা অনলাইনে সমর্থন জানানো কোটি কোটি মানুষের তুলনায় এই সংখ্যাকে হতাশাজনক বলে মনে করেছেন। কিন্তু দিল্লির রাস্তায় খুব কম মানুষই সিজেপিকে আর একটি এআই ইন্টারনেট মিম হিসেবে দেখেছে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ২৬ বছর বয়সি মেহিমা ফাতিমা বলেন, ‘আমরাই এ দেশের ভবিষ্যৎ, আর ওদের কীভাবে সাহস হয় আমাদের তেলাপোকা বলার! এ দেশের শিক্ষার যে অবস্থা হয়েছে, তা দেখে খুব দুঃখ হয়। আমি আশা করি, এটাই প্রতিরোধের সূচনা।’

ভারতের পরীক্ষাব্যবস্থা এবং দেশের যুবসমাজের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মধ্যেই সিজেপির উত্থান ঘটেছে। ভারতে এখন বেসরকারি টিউশনের পেছনে সরকারের পুরো উচ্চশিক্ষা বাজেটের চেয়েও বেশি অর্থ ব্যয় করা হয়। বাবা-মায়েরা প্রায়শই তাদের সন্তানদের ডাক্তারি ও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য কাঙ্ক্ষিত স্থান অথবা লাভজনক সরকারি চাকরি পাইয়ে দিতে গিয়ে মারাত্মক ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। সফল হওয়ার চাপে ঘটছে আত্মহত্যার ঘটনা।

এই সপ্তাহে সংবাদপত্রের কলামে বিশ্লেষক প্রতাপ ভানু মেহতা লেখেন, ‘এই পরীক্ষাগুলো কেবল মূল্যায়নের উপকরণ নয়। এগুলো সামাজিক নিয়ন্ত্রণের উপায় এবং অত্যন্ত কার্যকরও বটে… এই ব্যবস্থার বার্তা এখন আর ‘কেন’ বা ‘কীভাবে’ প্রশ্ন করা নয়, বরং কেবল ‘করে যাও এবং মরে যাও’।’

এ বছরের মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষার বিশৃঙ্খলা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান দুর্দশাকে কেন্দ্র করেই ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের বেশির ভাগটাই সংগঠিত হয়েছে। এই পরীক্ষায় মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার আসনের জন্য ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতা করে। প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যাওয়ায় পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হতে হয় এবং শিক্ষার্থীদের এই কঠিন পরীক্ষা পুনরায় দিতে হয়।

শনিবারের এই বিক্ষোভের একটি মূল দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, যাকে অনেকেই এই ধারাবাহিক কেলেঙ্কারির জন্য দায়ী করেন।

৩০ বছর বয়সি রত্না সিং বলেন, ‘আমরা এখানে জবাবদিহির দাবি নিয়ে এসেছি।’

তিনি বলেন, ‘মানুষ পরীক্ষার জন্য দিনরাত খেটে মরছে, আর সেই পরীক্ষার প্রশ্নই আবার ফাঁস হয়ে যায়, অথচ শেষ পর্যন্ত আমাদের জন্য কোনো চাকরিই থাকছে না। পুরো শিক্ষাব্যবস্থারই একটি আমূল সংস্কার প্রয়োজন।’

তথাপি, যারা গর্বের সঙ্গে নিজেদের ‘তেলাপোকা’ বলে ঘোষণা করতে রাস্তায় নেমেছিলেন, তাদের অনেকেই স্বীকার করেছেন যে এই আন্দোলন ছিল ডেভিড ও গোলিয়াথের লড়াই। মোদির শাসনামলে গণমাধ্যম এবং বিচার বিভাগজুড়ে ক্ষমতা সুসংহত করেছে বিজেপি সরকার। রাষ্ট্র নিয়মিতভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের দমন করে আসছে।

শনিবার জনতার উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে দীপকে বলেন, ‘আমরা ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপকে বিপ্লবে পরিণত করেছি’।

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...