যুক্তরাষ্ট্রে লিমন-বৃষ্টি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

আমার দেশ অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্রে লিমন-বৃষ্টি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বেশ কিছু ভয়াবহ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেছেন তদন্তকারীরা।

২৭ বছর বয়সী লিমন ও নাহিদা বৃষ্টিকে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে টাম্পায় শেষবার দেখা গিয়েছিল। এক সপ্তাহ পরে লিমনের লাশ পাওয়া যায়। তদন্তকারীদের ধারণা বৃষ্টিকেও হত্যা করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এই হত্যার ঘটনায় লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেফতার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ। তার বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিতভাবে অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। মঙ্গলবার একজন বিচারক রায় দিয়েছেন যে বিচার চলাকালীন তাকে আটক রাখা হবে।

সরকারি কৌঁসুলিরা তাকে জামিন ছাড়া কারাগারে রাখার আবেদন করে একটি বিস্তারিত সময়রেখা তুলে ধরেছেন, যেখানে হত্যার আগে ও পরে সন্দেহভাজন এবং ভুক্তভোগীদের কার্যক্রম তুলে ধরা হয়।

৭ ও ১১ এপ্রিল: অ্যামাজন থেকে কেনাকাটা

মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানার হলফনামা অনুসারে, আবুঘারবিয়েহ অ্যামাজন থেকে ডাক্ট টেপ, ময়লার ব্যাগ, লাইটারের জ্বালানি এবং আগুন জ্বালানোর সরঞ্জামসহ বেশ কিছু জিনিস কেনেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

১৩ এপ্রিল: চ্যাটজিপিটি কথোপকথন

বিচারপূর্ব আটকাদেশের আবেদনে উদ্ধৃত করা একটি চ্যাটজিপিটি কথোপকথনে দেখা যায়, আবুঘারবিয়েহ জানতে চান: ‘যদি কোনো মানুষকে একটি কালো ময়লার ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে কী হবে?’ এর উত্তরে চ্যাটবটটি বলে যে এটি শুনতে বিপজ্জনক লাগছে। প্রসিকিউটরদের ভাষ্যমতে, আবুঘারবিয়া জানতে চান, ‘ওরা কীভাবে জানতে পারবে?’

১৬ এপ্রিল: দুই শিক্ষার্থীর সাথে শেষ যোগাযোগ

হিলসবোরো কাউন্টি আদালতে শনিবার প্রসিকিউটরদের দাখিল করা আবেদন অনুসারে, লিমন ও বৃষ্টির বন্ধুরা দিনের বেলায় তাদের সাথে যোগাযোগ রাখলেও, পরে আর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। বৃষ্টি ও লিমন নিজেদের মধ্যেও অল্প সময়ের জন্য ফোনালাপ করেছিলেন।

আবেদন অনুসারে, দুপুরের দিকে নজরদারি ভিডিওতে বৃষ্টিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হাঁটতে দেখা যায়। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় চশমা নেওয়ার জন্য এক বন্ধুর সাথে তার যে দেখা করার কথা ছিল। তবে বৃষ্টি সেখানে যাননি, বন্ধুর ফোনও ধরেননি।

লিমনের মোবাইলের অবস্থান অনুযায়ী, সেদিন সন্ধ্যা ৭টা ৪৩ মিনিটের দিকে ফ্লোরিডার ক্লিয়ারওয়াটার এলাকায় গিয়েছিলেন তিনি। এর আগে তাঁর আবাসস্থল ও ক্যাম্পাসের কাছাকাছি তার মোবাইল ফোনের অবস্থান দেখা যায়। লিমনের বসবাসের স্থান থেকে ক্লিয়ারওয়াটারের দূরত্ব মোটামুটি ৩২ মাইল।

আইনজীবীরা বলেছেন, লিমনের মোবাইল ফোনের অবস্থান ক্লিয়ারওয়াটারে দেখানোর ১০ মিনিটের মধ্যে ওই এলাকায় যেতে দেখা যায় আবুঘরবেহের সাদা রঙের হুন্দাই জেনেসিস জি-৮০ মডেলের গাড়িটিকে। মোবাইল ফোন ও গাড়ি চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, সে রাতে আবুঘরবেহ ও লিমনের মোবাইলের অবস্থানের মধ্যে মিল ছিল।

মামলার প্রসিকিউটররা বলছেন, রাত ১০টার দিকে সন্দেহভাজনের ফোন থেকে ডোরড্যাশের মাধ্যমে আবর্জনা রাখার ব্যাগ, ক্লিনিং সামগ্রীসহ বিভিন্ন জিনিস অর্ডার করা হয়। একই রাতে সন্দেহভাজন আসামি হিশামের রুম থেকে কার্ডবোর্ডের বাক্স অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ময়লা ফেলার স্থানের দিকে নিতে দেখা যায়। রাত ১টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টার মধ্যে তাকে একাধিকবার একটি সেতু এলাকায় যাতায়াত করতে দেখা যায়।

১৭ এপ্রিল:

লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজের খবর। মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানার হলফনামায় বলা হয়েছে, হিশাম আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটির কাছে একটি বিষয় জানতে চেয়েছিলেন, তা হলো ‘হিলসবরো রিভার স্টেট পার্কে কি গাড়িতে তল্লাশি করা হয়?’ ১৭ এপ্রিল দিবাগত রাত ১টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে দুইবার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড সেতুতে গিয়েছিলেন তিনি।

এরইমধ্যে লিমন ও বৃষ্টির নিখোঁজের খবর আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। এর পরদিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বৃষ্টির কাজের জায়গায় তল্লাশি করে পুলিশ। সেখান থেকে তার খাবারের বাক্স, একটি ম্যাকবুক, আইপ্যাডসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়।

২২ এপ্রিল:

আদালতে করা আবেদন অনুযায়ী, তদন্তকারীরা সন্দেহভাজনের মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। তার ময়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তার ছেলে আগে রাগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় ভুগতেন এবং পরিবারের সঙ্গে সহিংস আচরণ করেছেন।

২৩ এপ্রিল:

দুই শিক্ষার্থীর নিখোঁজের অবস্থা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তদন্তকারীরা একটি ময়লা ফেলার স্থানে তল্লাশি চালান। সেখানে তারা রক্তমাখা একটি কালো রঙের ফ্লোর ম্যাট, বৃষ্টির মুঠোফোনের কভার এবং লিমনের মানিব্যাগ, চশমা ও রক্তমাখা পোশাক খুঁজে পান। পরে সন্দেহভাজন তার গাড়ি তল্লাশির অনুমতি দেন, তবে সেটি সম্প্রতি পরিষ্কার করা হয়েছে বলে মনে হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বারবার ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেন। প্রথমে তিনি দাবি করেন, তিনি কখনো ক্লিয়ারওয়াটারে যাননি। পরে স্বীকার করেন, মাছ ধরার জায়গা খুঁজতে গিয়েছিলেন। আরও পরে বলেন, লিমন ও তার বান্ধবীকে সেখানে পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন।

এপ্রিল ২৪:

এদিন খোঁজ পাওয়া যায় লিমনের লাশ। আদালতে করা আবেদন অনুযায়ী, হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড সেতুতে তল্লাশি চালিয়ে কালো রঙের একটি আবর্জনার ব্যাগ খুঁজে পান গোয়েন্দারা। আবুঘরবেহের ফোনের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ এপ্রিল ওই জায়গাতে থেমেছিলেন তিনি।

সরকারি কৌঁসুলিরা বলছেন, আবর্জনার ওই ব্যাগ আবুঘরবেহের বিছানার নিচে পাওয়া ব্যাগগুলোর মতো। আদালতে করা আবেদনে তারা আরও বলেছেন, সেতুতে পাওয়া ব্যাগের ভেতর থেকে একজন পুরুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। সেগুলো লিমনের বলে শনাক্ত করা হয়।

২৫ এপ্রিল:

এদিন সকালে আবুঘরবেহকে প্রথমবারের মতো আদালতে তোলা হয়। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হত্যার অভিযোগ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছে। সেগুলো হলো—বেআইনিভাবে মৃতদেহ সরানো, গোপন করার উদ্দেশ্যে মৃত্যুর খবর না জানানো, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা, অবৈধভাবে আটকে রাখা এবং শারীরিক লাঞ্ছনা।

২৬ এপ্রিল:

শেরিফ অফিসের কর্মকর্তারা জানান, হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের কাছ থেকে মানবদেহের অংশ উদ্ধার করা হয়েছে এবং সেগুলোর পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। ধারণা করা হচ্ছে মানবদেহের ওই অংশটি বৃষ্টির হতে পারে।

২৭ এপ্রিল:

ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি তদন্তে এই হত্যাকাণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করেছে বলে ঘোষণা দেন অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমায়ার। এক বিবৃতিতে ওপেনএআই-এর মুখপাত্র ড্রিউ পুসাতেরি বলেন, ‘এটি একটি ভয়াবহ অপরাধ। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সহায়তা করব।’

২৮ এপ্রিল:

এদিনে মামলার অগ্রগতি নির্ধারণে একটি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। হিলসবোরো কাউন্টির বিচারক লোগান মারফি সরকারি কৌঁসলিদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হিশামকে দুটি হত্যা মামলায় জামিন ছাড়া কারাগারে রাখার নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে আসামি হিশাম আবুঘারবেহকে কোনো সাক্ষী বা নিহতদের আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ না করার নির্দেশ দেন। তবে ওই শুনানিতে অভিযুক্ত আদালতে উপস্থিত ছিলেন না বলে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।

সূত্র: সিএনএন

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন