‘নাইন ইলেভেন’—শব্দ দুটি গত ২৫ বছরে বিশ্বের প্রায় সব দেশ ও ভাষায় এত বেশি ব্যবহৃত হয়েছে যে, প্রায় যেকোনো অঞ্চলে এটি উচ্চারিত হলেই মানুষের মনে ভেসে ওঠে একটি নির্দিষ্ট ঘটনা।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুই ভবনে ১৭ মিনিটের ব্যবধানে আঘাত হানে দুটি বিমান। ওই হামলা চিরতরে বদলে দেয় মুসলিম সংগঠন ও নেতৃত্বের প্রতি আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি।
যুক্তরাষ্ট্র ওই হামলার জন্য ইসলামি চরমপন্থি গোষ্ঠী আল-কায়েদা ও এর প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করে। পরের মাসেই আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে মার্কিন বাহিনী। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রথম ধাপ ছিল এই অভিযান।
এর ধারাবাহিকতায় ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ২০১১ সালে লিবিয়াতেও সামরিক অভিযান চালায় মার্কিন বাহিনী।
নাইন ইলেভেনের হামলার পর ২০ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ তার ভাষণে প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ওয়ার অন টেরর’ পরিভাষাটি ব্যবহার করেন।
সেদিন ‘সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘আইদার ইউ আর উইথ আস, অর উইথ দেম’—অর্থাৎ এই যুদ্ধে আপনি হয় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে, নয়তো সন্ত্রাসবাদীদের পক্ষে।
নাইন ইলেভেনের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা অবশ্য সব সময়ই বলে এসেছেন, এসব অভিযান কোনো ধর্ম বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; বরং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে।
তবে মুসলিম দেশগুলোর অনেক মানুষের ধারণা, এই ঘোষণা ও যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী কর্মকাণ্ডের মধ্যে মিল নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ এজেন্ডা নিয়েই অনেকের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
যে কারণে নাইন ইলেভেন আমেরিকার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ
ওই দিন বিশ্বের প্রায় সব দেশের সব নিউজ চ্যানেলে দিনভর সম্প্রচার করা হয় একটি খবরই। কারণ আমেরিকার ভূখণ্ডে হামলার মতো বড় কোনো খবর সেদিন আর ছিল না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪১ সালে জাপানি বিমানবাহিনী হাওয়াই দ্বীপের পার্ল হারবারে মার্কিন নৌঘাঁটিতে হামলা চালায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে এমন বড় হামলার ঘটনা আর ঘটেনি।
তবে পার্ল হারবারের সঙ্গে নাইন ইলেভেনের হামলার পুরোপুরি তুলনা চলে না। পার্ল হারবারে হামলার সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। হামলাটি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৌঘাঁটিতে।
অন্যদিকে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে হামলা চালানো হয় এমন কিছু স্থাপনায়, যেগুলো ছিল হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের কর্মস্থল।
হতাহতের সংখ্যার দিক থেকেও পার্ল হারবারকে ছাড়িয়ে যায় নাইন ইলেভেনের হামলা। পার্ল হারবারে নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই হাজার। আর নাইন ইলেভেনে চারটি বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হন।
নাইন ইলেভেনের পর ২০ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশও বিষয়টির ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর পার্ল হারবারের সময় একবারই আমেরিকার মাটিতে আঘাত এসেছিল।
এ কারণেই নাইন ইলেভেনের হামলাকে আমেরিকা স্বাভাবিকভাবেই অন্য যেকোনো ঘটনার চেয়ে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়।
যেভাবে জানা যায় হামলার খবর
১১ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার। আমেরিকান সময় সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের একটি বোয়িং ৭৬৭ বিমান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ১১০ তলা ভবনের প্রায় ৯০ তলার কাছাকাছি অংশে আঘাত করে।
প্রথমে এটিকে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বলে মনে করা হয়। সংবাদমাধ্যমের কর্মীসহ ঘটনাস্থলে থাকা অনেকেই শুরুতে বুঝতে পারেননি যে ভবনের ভেতরে বিশাল একটি বিমান আঘাত করেছে।
কিন্তু এটি যে নিছক দুর্ঘটনা নয়, তা নিশ্চিত হয়ে যায় ১৭ মিনিট পর। আরেকটি বোয়িং ৭৬৭ পাশের ১১০ তলা ভবনে আঘাত করে।
দ্বিতীয় বিমানের আঘাতের দৃশ্য একাধিক টেলিভিশন ক্যামেরায় সরাসরি ধরা পড়ে। প্রথম আঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব নিউজ চ্যানেলই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দিকে ক্যামেরা তাক করে রেখেছিল।
দ্বিতীয় বিমান হামলার পর সবাই নিশ্চিত হয়ে যায়, এটি পরিকল্পিত হামলা।
ওই দুই বিমানের বোস্টন বিমানবন্দর থেকে লস অ্যাঞ্জেলস যাওয়ার কথা ছিল। দুটি বিমানেই পাঁচজন করে ছিনতাইকারী ছিল। বিমান উড্ডয়নের পর তারা এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দিক পরিবর্তন করে নিউইয়র্কের দিকে নিয়ে যান।
পরে জানা যায়, একই সময়ে আরো দুটি বিমান ছিনতাই করা হয়েছিল। সেগুলো ওয়াশিংটনের দিকে যাচ্ছিল। একটি পেন্টাগনে এবং অন্যটি ক্যাপিটল হিলে আঘাত করার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ওই দুটি বিমানও বিধ্বস্ত হয়। এতে দুই শতাধিক মানুষ নিহত হন।
হামলার পেছনে কারা দায়ী, তাৎক্ষণিকভাবে সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কিছু বলা হয়নি। তবে পরদিন থেকেই মার্কিন গণমাধ্যম ও কর্মকর্তারা গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে আল-কায়েদা ও ওসামা বিন লাদেনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি তুলে ধরতে শুরু করেন।
ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বাধীন আল-কায়েদা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দায়ী করত। ধারণা করা হয়, কুয়েতে জন্ম নেওয়া গোষ্ঠীটির সদস্য খালিদ শেখ মোহাম্মদ এই হামলার মূল রূপকার ছিলেন। তিনি পাইলটদের নিয়োগেও সহায়তা করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
মোট ১৯ জন ব্যক্তি বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো বাস্তবায়ন করেন। তাদের মধ্যে ১৫ জন ছিলেন বিন লাদেনের মতোই সৌদি নাগরিক। দুজন ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের, একজন মিসরের এবং একজন লেবাননের নাগরিক।
হামলার নয় দিন পর, ২০ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ আনুষ্ঠানিকভাবে আল-কায়েদা ও ওসামা বিন লাদেনকে এই হামলার জন্য দায়ী করেন।
ওই দিনই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
তার ভাষণে বুশ বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ আল-কায়েদার বিরুদ্ধে শুরু হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক ব্যপ্তিসম্পন্ন প্রতিটি সন্ত্রাসী সংগঠনকে খুঁজে বের করে প্রতিহত না করা পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলবে।
আমেরিকা ও মুসলিমরা যেভাবে মুখোমুখি
২০ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট বুশ আল-কায়েদা ও ওসামা বিন লাদেনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তোলেন। তবে এর কয়েক বছর আগেই বিন লাদেন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় ছিলেন।
১৯৯৮ সালে কেনিয়া ও তানজানিয়ায় মার্কিন দূতাবাসে আত্মঘাতী বোমা হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ওসামা বিন লাদেনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। পরে ২০০০ সালে ইয়েমেনের এডেন বন্দরে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি জাহাজে আত্মঘাতী বোমা হামলার জন্যও বিন লাদেনের তৈরি সংগঠন আল-কায়েদাকে দায়ী করা হয়।
বিন লাদেন নিজেও বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্যে আমেরিকার সেনাসদস্যদের হত্যার কথা বলেছেন।
তাই নাইন ইলেভেন হামলার জন্য তাকে অভিযুক্ত করা অনেকটা অনুমেয়ই ছিল।
তবে আফগানিস্তানের তৎকালীন তালেবান সরকারের কাছে ওসামা বিন লাদেনসহ দেশটিতে থাকা আল-কায়েদার নেতাদের হস্তান্তরের দাবি জানায় যুক্তরাষ্ট্র। তৎকালীন তালেবান প্রধান মোল্লা ওমর সেই দাবি নাকচ করে দেন।
এর ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে ‘অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডম’ শুরু করে মার্কিন বাহিনী।
ওই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তানের পাহাড়ি অঞ্চলে থাকা আল-কায়েদার গোপন ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করা।
এর দুই বছর পর, ২০০৩ সালে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অংশ হিসেবে ইরাকেও আগ্রাসন শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের এই দুই অভিযান বিশ্বের অনেক দেশের মুসলিমদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অনেক মুসলিম দেশের মানুষের মধ্যে আগে থেকেই ক্ষোভ ছিল। আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক অভিযান সেই ক্ষোভ আরো উসকে দেয়।
আফগানিস্তানে অভিযান শুরুর আগেই পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভ ও র্যালি হয়। অনেক জায়গায় ওসামা বিন লাদেনকে নাইন ইলেভেন হামলার জন্য ‘বীর’ হিসেবে দাবি করে প্রশংসাও করতে দেখা যায়।
আফগানিস্তানে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর তুরস্ক, মিসর, ইয়েমেন ও পাকিস্তানের মতো মুসলিম দেশ ছাড়াও ইতালি, যুক্তরাজ্য ও বেলজিয়ামের মতো দেশেও মার্কিন আগ্রাসনবিরোধী র্যালি হয়।
এরপর ২০১১ সালে লিবিয়ায় মার্কিন বাহিনীর অভিযানের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের মধ্যে আমেরিকাবিরোধী মনোভাব আরো তীব্র হয়।
মুসলিম দেশগুলোর বহু মানুষের মধ্যে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের এসব অভিযানের কারণে বিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে, তেমনি নাইন ইলেভেনের পর আমেরিকার মানুষের মধ্যেও ইসলামবিদ্বেষী চিন্তাধারা তীব্র হয়েছে।
নাইন ইলেভেনের পর বাড়ে ইসলামবিদ্বেষ
নাইন ইলেভেনের হামলার পরদিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় মুসলিম ও ইসলামবিদ্বেষী হামলার খবর পাওয়া যেতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রে ওই ঘটনার আগে মুসলিমবিদ্বেষ ছিল না, তা নয়। তবে নাইন ইলেভেনের পর এসব ঘটনা সংখ্যায় ও তীব্রতায় বহুগুণ বেড়ে যায়।
এফবিআইয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী ‘হেইট ক্রাইম’ বা ঘৃণাসূচক হামলার সংখ্যা ছিল ২৮টি। ১৯৯৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩২।
কিন্তু ২০০১ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮১-তে। এর ৮০ শতাংশের বেশি হামলা ঘটে ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর।
এরপর ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় কোনো বছরই এই সংখ্যা ১০০-এর নিচে নামেনি।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


