মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল সোমবার ইরানে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন। ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে না দেওয়ায় গতকাল ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প এ হুমকি দেন।
ট্রাম্প ঘোষণা দেন, সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সকাল ১০টা (বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা) থেকে ইরানি বন্দরে প্রবেশকারী কিংবা সেখান থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজগুলো আটকানো শুরু হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শুরু হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের ‘হামলাকারী জাহাজ’ যদি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কাছাকাছি আসে, তাহলে সেগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইরানের নৌবাহিনী সমুদ্রের তলানিতে পড়ে আছে, তাদের ১৫৮টি জাহাজ সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে।
তিনি ইরানকে সতর্কবার্তা দিয়ে আরো বলেন, তাদের জাহাজ যদি আমাদের অবরোধের কাছাকাছি আসে, তাহলে মাদক পাচারকারীদের জাহাজের মতো সেগুলোকে ধ্বংস করা হবে।
ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মার্কিন নৌবাহিনী তাদের ওপর হামলাকারী যেকোনো ইরানিকে ‘উড়িয়ে দেবে’ এবং ইরানকে ট্রানজিট টোল প্রদানকারী যেকোনো জাহাজকে আটক করবে।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার আগে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছিল, প্রেসিডেন্টের নির্দেশে সোমবার ইরানি বন্দরগুলোয় নৌ অবরোধ শুরু হবে। তবে, সে সময় তারা জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালি দিয়ে অন্যান্য দেশে যাতায়াতকারী জাহাজ চলাচলে কোনো বিঘ্ন ঘটানো হবে না।
সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়, ওমান ও পারস্য উপসাগরে ইরানি বন্দরসহ দেশটির সব উপকূলীয় এলাকায় যাতায়াতকারী সব দেশের জাহাজের ওপরই এই অবরোধ সমানভাবে কার্যকর করা হবে।
ইরানে পুনরায় হামলার কথা ভাবছেন ট্রাম্প
ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর আবারও ইরানে বিমান হামলা শুরুর কথা ভাবছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে দেশটির সংবাদ মাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এই তথ্য জানায়।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের টোল দাবির জবাবে ট্রাম্প ইতোমধ্যেই ইরানে নৌ অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া তিনি বিচক্ষণতার সঙ্গে অন্য সব বিকল্প বিবেচনায় রেখেছেন।
নতি স্বীকার করবে না ইরান
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ট্রাম্পের হুমকির মুখে ‘নতি স্বীকার করবে না’ ইরান। তাদের নৌপথের কাছাকাছি আসা যেকোনো সামরিক জাহাজের বিরুদ্ধে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে।
ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনার নেতৃত্বদানকারী গালিবাফ ট্রাম্পের হুমকির জবাবে এক্সে দেওয়া পোস্টে এসব কথা বলেন।
জ্বালানি তেলের দাম আরো বাড়ার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি লেখেন, বর্তমান জ্বালানি তেলের দাম উপভোগ করে নিন। আপনাদের এ তথাকথিত ‘অবরোধের’ কারণে শিগগিরই আপনারা চার বা পাঁচ ডলারের পেট্রোলের অভাব বোধ করবেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, পাকিস্তানে শান্তি আলোচনার সময় উভয় পক্ষই ‘একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি’ ছিল। কিন্তু আলোচনায় তেহরান ‘সর্বোচ্চ চাপ, ক্রমাগত শর্ত পরিবর্তন এবং অবরোধের’ সম্মুখীন হয়েছে।
দেশটির সর্বোচ্চ নেতার সিনিয়র সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই বলেছেন, যেকোনো নৌ অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা নিশ্চিত। তিনি বলেন, যেভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিক পরাজয়ের মুখে পড়েছিল, তেমনিভাবে যেকোনো নৌ অবরোধের ক্ষেত্রেও তারা ব্যর্থ হতে বাধ্য।
তিনি আরো বলেন, ইরান এমন কোনো দেশ নয়, যাকে টুইট বা কাল্পনিক অবরোধ পরিকল্পনা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। ইরানের সামরিক বাহিনীর ‘অপ্রকাশিত সক্ষমতা’ রয়েছে, যা যেকোনো হুমকির জবাব দিতে পারে।
ট্রাম্পের হুমকি ‘ডাকাতির শামিল’ : আইআরজিসি
যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। তারা ওয়াশিংটনের হুমকিকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে এটিকে ‘ডাকাতির শামিল’ বলে অভিহিত করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবিতে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখবে তেহরান। শত্রুপক্ষ-সংশ্লিষ্ট কোনো জাহাজকে ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা অতিক্রম করতে দেওয়া হবে না।
ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনী সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি আসা যেকোনো সামরিক জাহাজের বিরুদ্ধে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে।
আইআরজিসি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়া যেকোনো সামরিক জাহাজকে বর্তমান যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে।
গতকাল আইআরজিসি একটি ভিডিও প্রকাশ করে যাতে হরমুজ প্রণালির পূর্ব অংশে ইরানি নৌবাহিনীর সতর্কবার্তার পর মার্কিন কয়েকটি ডেস্ট্রয়ারের পিছু হটার দৃশ্য দেখানো হয়।
ইরানে নৌ অবরোধের থাকবে না ব্রিটেন
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অভিযানে যুক্তরাজ্য যোগ দেবে না বলে খবর প্রকাশ করেছে বিবিসি। সংবাদমাধ্যমটির খবরে বলা হয়, ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজ ও সেনাদের ইরানের বন্দর অবরোধ করার কাজে ব্যবহার করা হবে না।
তবে ওই অঞ্চলে ব্রিটিশ মাইন অপসারণকারী জাহাজ এবং ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে বলে জানা গেছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার বলেন, যত চাপই আসুক, ব্রিটেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াবে না এবং হরমুজ প্রণালির অবরোধকে সমর্থন করবে না।
ট্রাম্পের হুমকির সমালোচনায় রাশিয়া
ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালি অবরোধ করার ঘোষণার সমালোচনা করেছে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি অবরোধ করলে তা বিশ্ববাজারের জন্য ক্ষতিকর হবে বলে উল্লেখ করেছে মস্কো।
রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ট্রাম্পের আদেশের অনেক দিক এখনো অস্পষ্ট রয়েছে।
ট্রাম্পের হুমকি ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’ বলল স্পেন
ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের নৌ অবরোধের হুমকিকে ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’ বলে অভিহিত করেছে স্পেন। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী মারগারিতা রোবেলস যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারির তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, এমন পদক্ষেপের কোনো মানে হয় না।
গতকাল স্প্যানিশ সম্প্রচারমাধ্যম টিভিইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রোবেলস বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সবকিছুই কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে চলছে। কেউ জানে না কেন এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল।
বিশ্ববাজারে আবারও তেলের দাম বৃদ্ধি
ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের নৌ অবরোধের ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে আবারও জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ৭ শতাংশ বেড়ে গতকাল প্রতি ব্যারেল তেল ১০২ দশমিক ২৯ ডলারে বিক্রি হয়। আর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৪ দশমিক ২৪ ডলারে পৌঁছেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলার। যুদ্ধের প্রভাবে বিভিন্ন সময়ে তেলের দাম ১১৯ ডলারও ছাড়িয়ে যায়। গত শুক্রবার ইসলামাবাদে শান্তি-আলোচনার খবরে তেলের দাম কিছুটা কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ দশমিক ২০ ডলারে নেমেছিল।
দুই মাসের জন্য জ্বালানি কর কমাবে জার্মানি
জার্মানি চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ বলেছেন, জ্বালানি সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বস্তি দিতে দুই মাসের জন্য পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর কর কমাবে জার্মানি।
মার্জ জানান, জার্মানিতে দুই মাসের জন্য ডিজেল ও গ্যাসোলিনের ওপর জ্বালানি শুল্ক প্রতি লিটারে প্রায় ১৭ ইউরো সেন্ট (শূন্য দশমিক ২০ ডলার) কমানো হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

