পহেলা বৈশাখে, বাঙ্গলার নববর্ষ, অনন্য বিভিন্ন জাতির যার যার নববর্ষের মতোই, জাতীয় সংস্কৃতির একটি উপাদান। সংস্কৃতির সবকিছুর মতোই তার জাতীয় জীবনের জন্য উপযোগময় হবার কথা। তবে, সব সাংস্কৃতিক উপাদানের মতোই তার উপযোগ নির্ভর করে তার সদ্ব্যবহারের ওপর।
কখনো কখনো বিজাতীয় প্রভাবে জাতীয় সংস্কৃতির প্রয়োগ উপযোগী সদ্ব্যবহারের পরিবর্তে অপব্যবহারে পর্যবসিত হয়। সাধারণত বিজাতীয় ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী অভিজ্ঞতার ফলে এমন হয়। আর জাতি হিসেবে বাঙ্গলাকে বহু সৌভাগ্যের সঙ্গে ঔপনিবেশিক নিষ্পেষণ, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী শাসন ও নব্য ঔপনিবেশিক পরোক্ষ সাম্রাজ্যবাদ ও প্রত্যক্ষ আধিপত্যবাদের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার স্বাদও আস্বাদন করতে হয়েছে, একাধিকবার, কখনো কখনো দীর্ঘকাল ধরেও। তাতে তার নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, উদযাপন-উৎসবেরও, অলক্ষ্যেই উপযোগমণ্ডিত সদ্ব্যবহারের পরিবর্তে অনুপযোগী অপসাংস্কৃতিক অপ্রাসঙ্গিকতায় পর্যবসিত হবার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। নববর্ষের ক্ষেত্রেও যাতে এমন না হয়, তার সচেতন সতর্কতা থাকা দরকার।
প্রত্যেকটি সাংস্কৃতিক উপাদানের উপযোগটি সম্পৃক্ত হয়ে থাকে তার মূল রূপে নিহিত মর্মার্থে বিধৃত তার মূল চেতনায়। সব সংস্কৃতি হয়ে থাকে, সমাজে বহু প্রজন্ম পরম্পরায় প্রচলিত হয়ে আসা আবহমান হয়ে পড়া ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ– আর তার ব্যঞ্জনাময় প্রকাশ মাধ্যম নানা আচার অনুষ্ঠান, আচরণরীতি, উৎসব-উদযাপনের সমন্বিত রূপ। কালক্রমে সাংস্কৃতিক উপাদান, উৎসবের উদযাপন, তার মূল রূপ – বা তাতে বিধৃত মূলার্থগত মর্মার্থগত চেতনা-বিস্মৃত হয়ে তৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে। তখন তা অপসংস্কৃতিগত একটি অর্থহীন কিছুমাত্রই শুধু হয়। তাতে জাতীয় জীবন ও প্রগতির জন্য উপকারী, উপযোগী কিছুই থাকে না। বরং, অজ্ঞাতেই তা ক্রমে জাতির মন-মানসিকতা নষ্ট করে, তার ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করে। অপসংস্কৃতির কাজ– আসলে কুকাজই তাই।
বাঙ্গলা সনের আদিমূল
বাঙ্গলা সনের মাসের নামগুলো সারা ভারতবর্ষে প্রচলিত বলে অনেকেই ভাবে বাঙ্গলা সন ভারতীয়ই মূলত:Ñভারতীয় বিক্রমাব্দ সন। আসলে তা মোটেই নয়। বরং বাঙ্গলা সন চালু হয় উত্তর ভারতের বিহারে দু’হাজাররও বেশি বছরের পূর্ব-প্রচলিত এ সন গণনা রীতির প্রতিপক্ষে, বাঙ্গলার স্বকীয়তার চেতনামণ্ডিত আলাদা একটি সন-গণনা ব্যবস্থা হিসেবে চালু হয় মাত্র প্রায় ৪৭৫ বছর আগে, ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে। খোদ বাংলাদেশে, পার্সি পণ্ডিতের বুদ্ধিতে, হিজরি, আরবি চান্দ্র মাস গণনাভিত্তিক বর্ষের ভিত্তিতে এক নতুন সৌর বর্ষ-রূপে।
খুব সম্ভব হিন্দু বিহারী (‘মগধী’) রাজা দ্বিতীয় চান্দ্রগুপ্ত মৌর্য (৩৪০ খ্রিষ্টপূর্ব - ২৯৮ খ্রিষ্টপূর্ব), বাঙ্গলাসহ বিভিন্ন দেশে রক্তপাতমূলক আগ্রাসনে দখল করে ভারতীয় ‘সম্রাট’ সেজে, নিজেকে সূর্যতুল্য খুব বড় কেউ, ও খুব বিক্রমশালী মনে করে, নিজেই নিজেকে ‘বিক্রমাদিত্য’ উপাধি দিয়ে, নিজের শাসনকালের স্মরণীয় ঘটনাকে ভিত্তি করে ৫৬ খ্রিষ্টপূর্ব সনে একটি বর্ষগণনার একটি রীতি চালু করলে, তাকে ‘বিক্রমাব্দ’ বা ‘বিক্রম’ সন বলে প্রচার করা হয়– তাঁরই ঢাক পেটানোর জন্য। চান্দ্রগুপ্ত নিজে শেষ বয়সে হিন্দু ধর্ম পরিত্যাগ করে জৈনধর্মে দীক্ষা নিয়ে, রাজত্ব ও রাজ্য ছেড়ে সন্ন্যাসী হলেও, রাজত্ব ও রাজ্যে তাঁর উত্তরসূরিরা এই বিহারি সনকে তাদের বিজিত সাম্রাজ্যে প্রচলিত রাখে, আর তা হিন্দু ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের দিন ক্ষণ লগ্ন নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়ে, হিন্দু সন বলেই পরিচিত হয়ে পড়ে।
দুই হাজার বছরেরও পূর্বে, খ্রিষ্টেরও জন্মের পূর্বে, উত্তর ভারত আর নেপালসহ উপমহাদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রচলিত করা এই হিন্দু বিহারি ভারতীয় সন গণনারীতিকেই কেউ কেউ ভুল করে বাঙ্গলা সন মনে করে থাকে। কিন্তু বাস্তবে বাঙ্গলা সন ২০০০ বছর পূর্বে ভারতের বিহারে সূচিত হিন্দু বিক্রমী বিহারী ভারতীয় সন নয়, মূলত: মাত্র প্রায় ৪৭৫ বছর পূর্বে, বাংলাদেশে সূচিত আরবি চান্দ্র হিজরি সনের বাঙ্গলা সৌর সন।
‘ফসলি’ সন
বাঙ্গলা সন মূলে ‘ফসলি সন’ নামে প্রচলিত হয়, কারণ তার সূচনাই হয় বাংলাদেশের ক্ষেতের বার্ষিক ফসল ফলনের মরশুমের নির্ভরযোগ্য হিসাবের সুবিধার জন্য, বাংলাদেশের প্রধানত: মুসলিম কৃষকদের নিজস্ব ধর্মীয় চেতনা থেকে অনুসৃত হিজরি চান্দ্র সনের একটি সৌরবর্ষীয় সংস্করণ দাঁড় করানোর ভেতর দিয়ে। এর চেতনাগত তাৎপর্য অনুধাবন ও অনুসরণের জন্য অপরিহার্য ঐতিহাসিক রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিতটি বোঝা দরকার।
ইতিহাসে প্রথম বাঙ্গলা নামে, ১৩৪২ সনে, বাঙ্গলার সোনারগাঁয়ের বৃহত্তর পারস্যের পূর্ব প্রান্তের খোরাসানের সিজিস্তান নিবাসী এক পাঠান মুসলিম পরিবারের স্বাধীন ঐক্যবদ্ধ সার্বভৌম রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার পূর্ব থেকেই বাঙ্গলার মুসলিমরা সাংবিধানিকভাবেই বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কবন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। নিজেদের ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ীই, বিশ্বের আর সব মুসলমানের মতোই, বাঙ্গলার মুসলমানেরাও মুসলিম বিশ্বের সর্বোচ্চ পদাধিকারী রূপ ‘খলীফা’-এর মাধ্যমে বিশ্বনবী (দ.)- এবং তাঁর মাধ্যমে, তাঁর প্রেরক, স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার প্রতি আনুগত্যের শপথাধীন ছিলেন। আনুগত্যের এই শপথকে মুসলমানদের ধর্মীয় পরিভাষায়, ‘বাইয়্যাৎ’ বলা হয় – তার আক্ষরিক অর্থ, ‘বিক্রয়’, অর্থাৎ, ‘আত্ম-বিক্রয়’, বা ‘স্বেচ্ছায় আত্ম-বিক্রয়’, তথা ‘স্বেচ্ছা-বিক্রয়’। এই আত্ম-বিক্রয়, বা স্বেচ্ছা-বিক্রয়, হবার কথা – তখন হতও – কোরআন শরীফের একটি ‘আয়াত’, আর হাদিস শরীফের মুসলিম-বর্ণিত একটি হাদিসের চেতনায়।
কোরআন শরীফের আয়াতটি ছিল সুরা তওবার একটি বাক্য, যাতে বলা হয় আল্লাহতায়ালা বিশ্বাসীদের কাছ থেকে কিনে নিয়েছেন, তাদের জান আর মাল, তাঁর ভালোবাসার প্রতীক রূপ জান্নাতের বিনিময়ে। আর মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়, এই কিনে নেওয়ার জন্য নিজেকে বিক্রি করে খোদার প্রেমে তাঁর দাসত্বের ‘জোয়াল’ পরে সেমতাবস্থায় যাপনশীল জীবন নয় যার, এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে, সে তা করে ‘জাহেলিয়ত’, তথা বিশ্বাসহীনতার ‘অজ্ঞানতা’-এ, যার ফল হবে জান্নাতের পরিবর্তে, জাহান্নাম।
কোরআন শরিফের ওই আয়াত, আর মুসলিম শরীফের ওই হাদিসের চেতনায় সব মুসলমানই – বাঙ্গলার মুসলমানগনসহ প্রত্যেকেই ‘আত্ম-বিক্রয়’, তথা ‘বাইয়াত’ করতেন সারা বিশ্বের মুসলমানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ শাসনকর্তা-অভিভাবক, ‘খলিফা’-এর প্রতি।
ব্যক্তি হিসেবে ‘খলিফা’, হতেন সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে। বাগদাদে। তার কাছে, অত দূর থেকে প্রত্যক্ষে আত্ম-বিক্রয় সম্ভব না হওয়ায়, এই ‘আত্ম-বিক্রয়’-এর শপথ, তথা ‘বাইয়াত’ হতো পরোক্ষে, ‘খলিফা’-নিযুক্ত ‘সুলতান’, তথা ‘কর্তৃপক্ষ’ – অর্থাৎ খলিফার পক্ষে স্থানীয় দেশ-শাসন পালন ‘কর্তৃপক্ষে’র মাধ্যমে। যাদের পক্ষে, স্থানীয় দেশ শাসন-পালন কর্তৃপক্ষ রূপ সুলতানের কাছেও গিয়ে ‘বাইয়াত’ বা ‘আত্ম-বিক্রয়ের’ পথ নেওয়া সম্ভব হতো না, তাদের পরোক্ষ বাইয়াত হয়, সুলতানের স্থানীয়, নগর বা এলাকা শাসক-পালক রূপ ‘আমির’-এর মাধ্যমে।
এই স্বেচ্ছায় আত্ম-বিক্রয়ভিত্তিক একটি বিশ্ব শাসন ও লালন ব্যবস্থারূপ ‘খেলাফত’-নামক পুঞ্জ, তথা স্বাধীন জাতিপুঞ্জের অন্যতম সদস্য হিসেবে নবপ্রতিষ্ঠিত বাঙ্গলা বিশ্বদরবারে আসীন হয়েছিল, সেই হাজার বছরেরও পূর্বে। ঐশ্বরিক, তথা খোদায়ী নির্দেশনামাতে ন্যায়ানুগ বিশ্ব লালন ও শাসনের ব্যবস্থারূপ ‘খেলাফত’, ১৯২৫ সনে তার ধ্বংস সাধনের পূর্ব পর্যন্ত বিশ্ব শান্তি ও সমৃদ্ধির অভিভাবক হিসেবে খলিফার দায়িত্ব পালনের নিয়ামক ও সহায়ক হিসেবে সফলভাবে সক্রিয় ছিল। তার একমাত্র উল্লেখযোগ্য ও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী-সাম্রাজ্যবাদী রাজা-বাদশাহ ও তাদের বশংবদেরা এর প্রতিদ্বন্দ্বী বিকল্প হিসেবে, তারই অনুকরণে, একের পর এক নিষ্ফল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে, বিভিন্ন নামে – ‘পাপাসী’ বা ‘পোপতন্ত্র’, ‘হলি রোমান এম্পায়ার’, ‘কনসার্ট অব ইউরোপ’, ‘লীগ অব ন্যাশন্স’ বা ‘জাতিপুঞ্জ’, ‘ইউনাইটেড ন্যাশন্স’ বা ‘জাতিসংঘ’। মূলত:, ‘খেলাফত’-এর অনুকরণে হলেও এসব ইউরোপীয় সীমিত আরাধ্য ‘বিশ্ব-ব্যবস্থা’ ‘খেলাফত’-এর মতো এত দীর্ঘকাল এবং বিশ্বের এত বিস্তৃত এলাকা জুড়ে সফল হয়নি, কেননা দুটি মৌলিক বিষয়ে সে অনুকরণ ছিল অনুপস্থিত। এক, ব্যবস্থার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ ও তন্মাধ্যমে সম্পূর্ণ ব্যবস্থার ‘ইসনাদ-মুততাসিল’ (‘অবিচ্ছিন্ন নিশ্চিতায়ন-পরম্পরা’) নিশ্চিতায়িত (‘মসনদ’) ঐশ্বরিক, তথা খোদায়ী নির্দেশনাধীনতা। দুই, স্বেচ্ছায় আত্ম-বিক্রয়ের মাধ্যমে ব্যবস্থাধীন এসে মূলত: স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত জাতিপুঞ্জে যোগদান বা তা থেকে বিরত থাকবার প্রকৃত, কার্যকর স্বাধীনতা। ইউরোপীয় বিকল্প বিশ্ব ব্যবস্থায় মূলত: ইসনাদ-মাধ্যমে নিশ্চিতায়নের একটি নামমাত্র ভান থাকলেও, উল্লিখিত স্বাধীনতার কোনো বালাই ছিল না। আর তাতে মূলত: সেই স্বাধীনতার বালাই না থাকলেও বিংশ শতাব্দীতে এসে ‘জাতিপুঞ্জ’ ও ‘জাতিসংঘ’-এ তার কিছুটা অভিনয় থাকলেও, বাস্তবে তা কাগজে-কলমে মাত্র।
‘খেলাফত’-এর রাজধানী মূলত:, ও আসলে চিরকালই, নানা কারণে, মদিনা শরীফ। কিন্তু, নানা দুনিয়াবী বাস্তবতা বিচারে, মাঝে মাঝে তার কার্যকর রাজধানী অন্যত্র স্থাপন করা হয় – কুফা, দামেস্ক, বাগদাদ, ইস্তাম্বুল এবং অত্যল্প সময়ের জন্য দুইবার, মক্কা শরীফে।
১৩৪২ খ্রিষ্টাব্দে বাঙ্গলা নামে তার সব মৌলিক ভিত্তিগত এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণসহ, স্বাধীন সার্বভৌম রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা থেকে ১৫৫৬ সনে বাঙ্গলা সন চালুর প্রায় পূর্ব পর্যন্ত, ‘খেলাফত’-এর কার্যকর রাজধানী ছিল বাগদাদ, খলিফা ছিলেন আব্বাস (রা.)-এর বংশধারার মাধ্যমে চলে আসা নবীবংশীয় শাসকরা। এঁদেরই একজন খলিফা, কোনো এক সময়, বাগদাদ থেকে সারা বিশ্বের শাসন আর পালনের দায়িত্ব পালনে নিযুক্ত ‘খলিফা’ তার পক্ষে ভারতবর্ষে এই দায়িত্ব পালনে তার আনুগত্যাধীন বিভিন্ন সুলতানদের ভেতর সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়ে দিল্লির সুলতান ইলতুৎমিশকে ‘সুলতানুল আজম’ নিয়োগের পর থেকে, বাঙ্গলাসহ ভারতবর্ষের অন্য সব সুলতানেরা দিল্লি থেকে নিজের দায়িত্ব পালনকারী ‘সুলতানুল আজমের’ নেতৃত্বে, যার যা নিজস্ব ‘স্বাধীনতা’Ñসহই যার যার দেশের শাসন ও পালনের দায়িত্ব পালন করতেন। এই ব্যবস্থায় স্থানীয়, দেশীয় সুলতানেরা কখনো কখনো প্রায় সম্পূর্ণই স্বাধীন হতেন, আর কখনো কখনো হতেন স্বায়ত্তশাসিত।
প্রায় সম্পূর্ণ স্বাধীন হলে এঁদেরকে ‘সুলতান’-ই বলা হতো- ‘সুলতানুল আজম’, তথা ‘বড় সুলতান’-এর প্রতি বশ্যতা তাদের ক্ষেত্রে হতো কেবলমাত্র একটি নামেমাত্র, ‘বাস্তব’ - বা, তারও চেয়ে কম, স্রেফ ‘ধরে নেওয়া’, অঘোষিত, তাত্ত্বিক -ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। আর সেই স্বাধীনতা বাস্তবেই কিছু খর্ব হয়ে স্বায়ত্তশাসনের পর্যায়ে নেমে আসলে, স্থানীয় দেশ শাসন-পালন কর্তৃপক্ষকে বলা হতো ‘নবাব’, অর্থাৎ ‘উপ-’ – ‘উপ-সুলতান’।
১৩৪২ সনে স্বাধীন সুলতানাৎ হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে, ষোড়শ শতাব্দীতে দিল্লিতে মুঘল সম্রাট আকবর ‘সুলতানুল আজম’-এর পদ দখলের পরে এক সময় বাঙ্গলার শেষ স্বাধীন সুলতানের ক্ষমতা হারাবার পর থেকে বাঙ্গলা মুঘলদের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত নবাবীতে পরিণত হয়। আর এই প্রেক্ষিতেই দিল্লি সুলতানাতের ‘সুলতানুল আজম’ হিসেবে সম্রাট আকবরের সরকারের বাঙ্গলা থেকে জাকাত ও খারাজ হিসেবে এখানে উৎপন্ন ফসলের অংশ সংগ্রহ করার সুবিধার্থে মুসলিম শাসনাধীন সব এলাকায় প্রচলিত হিজরি চান্দ্র বর্ষেরই একটি হিজরি সৌর বর্ষের ‘ফসলি’ বর্ষ হিসেবে চালু করার প্রয়োজন অনুভূত হয়। সেই প্রয়োজন থেকেই সূচিত সৌর হিজরি বর্ষরূপে বাঙ্গলার ‘ফসলি’ সন চালু করা হয়। তাই সারা ভারতবর্ষে চললেও, বাঙ্গলায়ই স্থায়ী হয়ে বাঙ্গলা সন রূপে প্রচলিত থেকে যায়।
এমন নয় যে বাঙ্গলায় ১৬শ শতাব্দীতে সূচিত এই সৌর হিজরি ‘ফসলি’ বাঙ্গলা সনের পূর্বে ফসল তোলার মরশুমের হিসাব রাখার সুবিধা সমন্বিত কোনো সৌর সন পরিচিত ছিল না। তা ছিল– তা সত্ত্বেও সেই সৌর সন গণনা রীতি ব্যবহার না করে বাঙ্গলা কেন নতুন অন্য, নতুন একটি সৌর সন গণনারীতি চালু করল, যা কালে ‘বঙ্গাব্দ’ বলে পরিচিত ও আদৃত হয়ে আমাদের আজকের বাঙ্গলা নববর্ষ দান করল? তা বুঝবার জন্য বাঙ্গলায় পূর্ব থেকে জানা সৌর সনের ইতিহাস জানা দরকার।
বাঙ্গলায় বঙ্গাব্দ-পূর্বের পরিচিত সৌর সন
প্রাচীন কাল থেকেই বাঙ্গলাসহ সারা জগতের মানুষই আকাশের উজ্জ্বল প্রাকৃতিক বস্তু লক্ষ্য করে তাদের সম্পর্কে চিন্তা করে, ও তাদের গুরুত্ব দেয়। খালি চোখে আকাশে দেখতে পাওয়া এসব উজ্জ্বল বস্তু হলো সাতটি, যথা– চাঁদ, সূর্য, আর পাঁচটি প্রাণ ‘তারকা’, যথা মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র আর শনি। প্রথমে লোকে, এ সবের আলোই যে এসবের স্রষ্টা, ‘খোদা তায়ালা’-থেকে গ্রহণ করা, তাই মনে করত। ‘গ্রহণ’ করে বলে, এদেরকে ‘গ্রহীতা’, বা সংক্ষেপে ‘গ্রহ’ বলতে শুরু করে।
নূহ বা ‘মহা-নূ:’, তথা ‘ম’-নূ’ বা ‘মনু’-এর তিন প্রধান সন্তানের অন্যতম ইয়াফেসের সন্তান, যারা আদি নিবাস, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে উত্তরের দিকে তুরস্ক হয়ে একদিকে ইউরোপ, আর অন্যদিকে মধ্য এশিয়া হয়ে উত্তর ভারত ও উত্তর পারস্যে পৌঁছাবার পথে এক পর্যায়ে ‘আর্য’ বলে সম্যক পরিচিত হয়। তাদের এসব নতুনতর নিবাসই ছিল খুবই শীতপ্রধান, যেখানকার আকাশ প্রায়ই মেঘাচ্ছন্ন থাকায় লোকেরা সূর্য, চান্দ্র, আর তারকা, তথা পূর্বোল্লিখিত সপ্ত ‘গ্রহ’ দেখার জন্য তৃষিত থাকে। এর ফলে তাদের মনে এই গ্রহসমূহ এতই অতীব অধিক গুরুত্বমণ্ডিত হয়ে ওঠে যে ক্রমেই তারা তাদের ভেতর আলোকোজ্জ্বল দেবতুল্য গণ্য হয়ে পূজিত হতে শুরু করে। উত্তর ভারত আর উত্তর পারস্য থেকে মধ্য এশিয়া হয়ে ইউরোপ, সবখানের আর্যগণই এই সপ্ত গ্রহের পূজার জন্য একেকটি করে সাত দিন ঠিক করে নিয়ে সেই দিনগুলোকে ওইসব গ্রহের নামে নাম দিয়ে সপ্ত দিন বা ‘অহ’-এর গণনা শুরু করে। সাত দিন, বা ‘অহ’ নিয়ে হয়, সপ্ত-অহ, বা, সংক্ষেপিত হয়ে, ‘সপ্তাহ’ হয়। আর্য বা আর্য-প্রভাবিত প্রায় সব সমাজেই সপ্তাহের দিনগুলো পরিচিত হয়, এসব গ্রহের নামে - ‘রবি-বার’, ‘সোম-বার’, ‘মঙ্গল-বার’, ‘বুধ-বার’, ‘বৃহস্পতি-বার’, ‘শুক্র-বার’, ও ‘শনি-বার’।
ইয়াফেসের অধিকতর জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ ভাই ‘সাম’, ‘স্যাম’, ‘শাম’, বা ‘শ্যাম’, বা ‘শেম’, বা ‘সেম’-এর বংশধর, অনার্য ‘সেমিটিক’, ও তাঁদের দ্বারা প্রভাবিত-দের ভেতর দিনগুলোকে এভাবে দেবতুল্য করা গ্রহের নামে নামায়িত না করে, স্রেফ ‘আহাদ’ (‘১ম’), ‘ইসনীন’ (‘২য়’), ‘সালাসা’ (‘৩য়’), ‘রুবূ’ ‘(‘৪র্থ’), ‘খমীস’ (‘৫ম’), ‘সাদিস’ (‘৬ষ্ঠ’), ‘সাব্ৎ’ (‘৭ম’) বলে পরিচিত করা হয় – কালে ৬ষ্ঠ দিন-টিকে সমাজ-সমগ্র (‘জম’)-এর সামাজিক যৌথ এবাদত-এর জন্য ঠিক করে, ‘৬ষ্ঠ’-এর পরিবর্তে ‘জমা’, বা ‘জুমা’) বলা হয়। বাঙ্গলা জাতি মূলত: ও প্রধানত: অনার্য সেমিটিক-শ্যামল, দ্রাবিড় হলেও ইতিহাসের কোনো এক পর্যায়ে উত্তর ভারত হয়ে এসে আর্যদের বাঙ্গলা জাতির ওপর গণহত্যামূলক আগ্রাসন ও শাসনের ফলে আংশিক আর্যায়িত হয়ে পড়ার ফলে, নিজেদের ভেতর সপ্তাহের দিনগুলোকে আর্যদের মতোই সপ্ত গ্রহের নামেই ডাকতে শুরু করে। এখনও তা বহাল আছে।
জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষ-শাস্ত্র
গ্রহ-নক্ষত্রের গুরুত্ব উপলব্ধি থেকে আর্য অনার্য নির্বিশেষে মনুষ্য সমাজ গ্রহ নক্ষত্রকে সুগভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করলে, তা থেকে জ্যোতির্বিদ্যার উদ্ভব হয়। কিন্তু সে পথে অগ্রসর হয়ে আর্যগণ মানুষের জীবনে গ্রহ নক্ষত্রের কল্পিত অলৌকিক প্রভাবভিত্তিক ‘জ্যোতিষ শাস্ত্র’ সৃষ্টি করে, আর তার ভিত্তিতে গ্রহ নক্ষত্রকে দেব মনে করে তার পূজায় আরেক মাত্রা এগিয়ে মাসগুলোও কল্পিত দেব-দেবীর পূজার জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়ে সে মাসগুলোর নাম তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে দেয়– সেসব কল্পিত দেব-দেবীর জ্যোতিষ শাস্ত্রীয় প্রতীকরূপ পূজনীয় প্রাকৃতিক বস্তুর নামে। মগধি তথা বিহারি আর্য ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী দখলদার শাসকগণ কর্তৃক বাঙ্গলা ও নেপালসহ উত্তর ভারতবর্ষে চালু করে দেয়া ‘বিক্রমী’ সনে মাসের নাম এভাবে প্রচলিত হয় – বছরের প্রথম মাস হিসেবে ধরা হয়, বসন্তের দু’মাসের দ্বিতীয়টি, যাতে ভরা বসন্ত হয়, তাকে বলা হয়, ‘মীন’, মানে ‘মাছ’-এর মাস। তার পরের, গ্রীষ্মের দু’মাস, ‘মেষ’ – মানে ‘ভেড়া’, ও ‘বৃষ’ মানে ‘ষাঁড়’; বর্ষার দু’মাস, ‘কর্কট’ – মানে ‘কাঁকড়া’, ও ‘মিথুন’, মানে ‘যমজ’; এর পরের, শরতের দু’মাস – ‘সিংহ’, ও ‘কন্যা’; এর পরের, হেমন্তের দু’মাস – ‘তুলা’, মানে তোলা ফসল মাপবার ‘দাঁড়ি-পাল্লা’, আর বৃশ্চিক, মানে ‘বিচ্ছু’; এর পরের, শীতের দু’মাস – ‘ধনু’, সম্ভবত: শীতকালে শিকারের জন্য দরকার তীর-ধনুকের ‘ধনুক’, সংক্ষেপে, ‘ধনু’ – আর ‘মকর’, মানে ‘ছাগল’; আর সব শেষে, বসন্তের দু’মাসের প্রথমটি – ‘কুম্ভ’, মানে পানি ধরে রাখবার ‘কলসী’।
কালে জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে শুরু হওয়া জ্যোতিষশাস্ত্র বৈজ্ঞানিক সত্য সাধনার পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে কাল্পনিক নানা বিষয়ভিত্তিক কুসংস্কার মিশ্রিত ‘জ্যোতিষ শাস্ত্র’-এর জন্ম দেয়। তার পথ ধরে ভাগ্য নির্ধারণে একেকটি মাস বিভিন্ন বাস্তব বা কল্পিত গ্রহের পারস্পরিক অবস্থানগত সম্পর্ক বিচারে আকাশকে ২৭ বা ২৮ ভাগে ভাগ করে, তার প্রত্যেকটিকে এক একটি নক্ষত্র মনে করে, তার ভেতর দিয়ে চাঁদের অগ্রগতির ক্ষমতা কার্যকর হবার কথা বিশ্বাস করে। চাঁদের অগ্রগতির ভিত্তিতে সারা বছরকে ১২টি মাসে ভাগ করে প্রতি মাসে চাঁদের অগ্রগতিতে সে কখন কোন নক্ষত্রের ক্ষেত্রে, তার বিচারে, প্রতিটি মাসকে তার কল্পিত সংশ্লিষ্ট বাস্তব বা কল্পিত নক্ষত্রের নামে নামায়িত করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, মঙ্গল গ্রহকে দেবতা মনে করে, তার অধীনস্থ নক্ষত্র বলে মনে করা ‘চিত্রা’-এর নামে নামকরণ করা হয় ‘মীন’, বা ‘মাছ’ নাম দেওয়া মাসটিকে, এক্ষণে তাকে ‘চৈত্র’ বলে। এটাকে ‘শকাব্দ’ বলে পরিচিত হিন্দু আর্য ভারতীয় সন গণনায়, যাকে বর্তমানও ভারতের সরকারি সন গণনা রীতি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাতে বছরের প্রথম মাস ধরা হয়। বঙ্গাব্দে এই নামেই একটি মাস থাকলেও, বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসটি কিন্তু বছরের সর্বশেষ মাস। আবার ‘বিশাখা নক্ষত্র’ বলে মনে করা গ্রহ মোতাবেক চন্দ্রাবস্থানের নামে যে একটি মাসকে ‘বৈশাখ’ বলে নামায়িত করা হয়, অনার্য মুসলিম সৌর ‘হিজরি’ বাঙলা সনে তাকেই প্রথম মাস ধরলেও, হিন্দু আর্য ভারতীয় সনে তাকে ধরা হয় বছরের শেষ মাস হিসেবে। নানা কারণেই বাহ্যিক শুধু মাস ও দিনের নামে যৎসামান্য মিল থাকলেও, মূলত: মুসলিম হিজরি সনের সৌরবর্ষীয় রূপ বঙ্গাব্দ, ও ভারতীয় হিন্দু সন তেমনই মৌলিকভাবে ভিন্ন যেমন প্রথম আর সর্বশেষ!
সুলতানি বাঙ্গলার বঙ্গাব্দ-পূর্ব সন গণনা রীতি
বাঙ্গলায় প্রায় ৪৭৫ বছর অগে চালু হওয়া অনার্য মুসলিম হিজরি সনভিত্তিক বঙ্গাব্দের পূর্বে ২০০০ বছরেরও আগে চালু করা হিন্দু আর্য ভারতীয় বিক্রমী সনের ওপরে বর্ণিত সংক্ষিপ্ত ইতিহাস থেকে বোঝা যায়, ১৩৪২ সনে ইতিহাসে প্রথম বাঙ্গলা নামে একটি স্বাধীন ঐক্যবদ্ধ রাজ্য রূপে আবির্ভাবের সময় থেকেই বাঙ্গলা প্রধানতই একটি মুসলিম প্রধান জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বলেই উপমহাদেশে পূর্ব থেকেই চলে আসা হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসভিত্তিক সন গণনা রীতি জনগণমন পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শুরুই হয়েছিল তা একটি মুসলিম ‘সুলতানাৎ’ হিসেবে।
১৩৪২ সনে প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই বাঙ্গলার অর্থনীতিসহ নানাবিষয়ক সরকারি নীতি মুসলমানদের ধর্মীয় নিয়ম মতোই নির্ধারিত আর প্রচলিত থাকে। তার একটি প্রধান দিকই ছিল ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে প্রদত্ত ও সরকারিভাবে সংগৃহীত জাকাত, ফিতরা, উশর, খেরাজ ইত্যাদির বিলি-বন্টন মুসলিম ধর্মীয় বিধান মতোই হওয়া বাধ্যতামূলক বিধায়, তার সময়ভিত্তিক হিসাব-কিতাবও মুসলিম ধর্মীয় নিয়ম মতোই করতে হয়। ওই সবের হিসাবই করতে হয় হিজরি সন মোতাবেক – ধর্মত: আজও তা’ই। তা গ্রহ-নক্ষত্র, দেব-দেবী, প্রকৃতি পূজা-মূলক নানা বিশ্বাসভিত্তিক হিন্দু, আর্য ভারতীয় দিন-ক্ষণ মাস-বছরের হিসাবের ভিত্তিতে অসম্ভব, মুসলিম ধর্মীয় নিয়মের কারণেই।
তাই বাঙ্গলা নামে প্রথম স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই, বাংলাদেশে সাধারণত ফসল তোলার মরসুমে ফসল বা সোনা বা রুপার দীনার বা দিরহাম দিয়ে প্রদত্ত ও সরকারিভাবে দিয়েই সংগৃহীত জাকাত, ফিতরা, উশর, খেরাজ ইত্যাদি হিজরি সন অনুযায়ীই হিসাব করে দেওয়া-নেওয়া হতো। হিজরি সন অনুসরণ করে বাঙ্গলায় লোকে উল্লিখিত দেয় দিত এবং সরকারের প্রতিনিধিগণ তা সংগ্রহ করতেন হিজরি সনের শেষদিন, হজের মাস, জুল-হিজ্জার শেষ দিন – ২৯ বা ৩০ তারিখে। এই দিন লোকে তাঁদের নানা জনকে দেয়ও দিতেন, ধারকর্জ শোধ করতেন– যা করতে পারতেন না, তার জন্য আবার নতুন ব্যবস্থা করতেন। এসব করে, সে দিন পুরোনো সব হিসাব-কিতাব সেরে, নতুন বছরের জন্য নতুন ‘হালখাতা’ খুলতেন। এসব দায়দায়িত্ব পালনে সফলতার জন্য আল্লাহতায়ালার শুকরিয়া আদায় করার জন্য, সে দিনের দিবাগত রাতের ভোর রাতে, সাধারণত সেকালের স্বাভাবিক অভ্যাসমত পান্তা ভাত দিয়ে সাহরি খেয়ে, নতুন বছরের প্রথম দিন– ১লা মহররম, ‘শোকরানা’ রোজা রাখতেন। পরের দিন, নতুন অর্থনৈতিক জীবনের সূচনায় বিকেলের দিকে নতুন ফসল বিক্রিসহ, তাকে ঘিরে যে পুরো অর্থনীতি, তার কর্মকাণ্ড সম্বলিত হাট বা মেলা বসত। সেটা এক ধরনের আনন্দময় উৎসবের মতোই হতো। এর একটি বিশেষ দিক ছিল দরিদ্র অভাবীদেরও এই উৎসবে দান-খয়রাত, কাঙালিভোজ ইত্যাদির মাধ্যমে শরিক করা হতো। মিলাদ শরিফ, সারি-জারি-মুর্শিদী ইত্যাদিরও অনুষ্ঠান করা হতো। তাতে কাঙালিভোজের জিয়াফতের সঙ্গে মিষ্টান্ন, হালুয়া-রুটিও খাওয়ানো হতো।
কিন্তু চান্দ্র হিজরি সনের ১লা মুহররমে ফসল তোলা, ফসল দিয়ে জাকাত-ফিতরা, উশর-খেরাজ, দান-খয়রাত এসবকে ঘিরে অমন ‘নববর্ষ’-এর এমন উৎসব-উদযাপনে একটি সমস্যা ছিল। তা ছিল এই যে, ফসল ফলত ও তোলা হতো সৌর সনের কালক্রম ধরে, প্রাকৃতিক কারণেইÑ ফসল ফলে সূর্যের তাপের হিসেবে, আর চান্দ্র সনের তারিখ ধরে ফসল তোলার মরশুম আবার জিলহজে ফিরে এসে পরের মাস, মুহররমের ১ তারিখ, ঘুরে ঘুরে আসত ৩৩ বছর পর একবার করে। ফলে ১ মুহররমে নতুন ফসলকেন্দ্রিক ধর্মীয় দায়িত্ব ঘিরে নববর্ষের উৎসব সমস্যার বিষয় হয়ে পড়ে। এ সমস্যাটি শুধু বাঙ্গলায়ই নয়, সমগ্র ভারতবর্ষসহ সৌর তাপনির্ভর ফসলকেন্দ্রিক অর্থনীতি-ভিত্তিক নববর্ষ উদযাপনকারী অনেক মুসলিম সমাজেই এই সমস্যা অনুভূত হয়। এর সমাধানেই আকবরের শাসনামলে একজন পারস্যিক পণ্ডিতের বুদ্ধিতে চান্দ্র হিজরি সন গণনা রীতিমতো যে সনটি প্রথম হিজরি সন গণনা করা হয়, সেই সনকেই প্রথম সন ধরে একটি সৌর সন চালু করা হয় ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে, যাতে ফসল তোলার মরশুম প্রতি বছর মোটামুটি একই মাসের একই দিন-ক্ষণে পড়ে। এই গণনা রীতিই প্রথমে ফসলি সন ও পরে বাঙ্গলা সন বা বঙ্গাব্দ বলে পরিচিত হয়। আর এভাবে গণনা করা সৌর সনের মাস-দিন-ক্ষণ মতে যে দিনটি বছরের শেষ দিন দাঁড়ায়, তাতে জাকাত ফিতরা, ধারদেনা সব শোধ করে, সে দিনের দিবাগত রাতের ভোর রাতে পান্তা ইত্যাদির সাহরি খেয়ে পরের দিন, নববর্ষের ১ তারিখে, শোকরানার রোজা রেখে নববর্ষের উদযাপন শুরু হতো– অনেকটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আরো পরে প্রচলিত করা ‘থ্যাংকস-গিভিং ডে’-এর মতো। সে দিন বিকেলে নয়া বছরের নতুন অর্থনৈতিক কাজকর্ম শুরুর হাট ও মেলা বসত, মিলাদ-মুর্শিদী ইত্যাদির আসর হতো, সন্ধ্যায় কাঙালিভোজসহ নতুন ধানের ভাত– ‘নবান্ন’সহ ভালো খাবারের ইফতার-জিয়াফত হতো।
এখানে উল্লেখ্য, নতুন যে সৌর হিজরি সন চালু হয় ‘ফসলি সন’ বা ‘বঙ্গাব্দ’ হিসেবে, তাতে চান্দ্র হিজরি সনে ব্যবহৃত আরবি মাসের নাম ব্যবহার না করে, ফারসি মাসের নাম ব্যবহার করা হয় শুরুতে – সম্ভবত:, চান্দ্র হিজরি সনের হিসাবে অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানের হিসাব-কিতাবে সৌর হিজরি আর চান্দ্র হিজরি সনের হিসাব গুলিয়ে ফেলার সম্ভাবনা থেকে বাঁচবার জন্য। কিন্তু, পরে ফারসিতে তেমন পারঙ্গম নন যে ব্যাপকতর কৃষক সমাজ, তাদের সুবিধার জন্য, বাঙ্গলায় উপ-সুলতান হিসেবে এক সময় নিয়োগপ্রাপ্ত, পরবর্তী সময়ে সম্রাট শাহজাহান, তা বদলে বরং সমগ্র ভারতবর্ষে পূর্ব থেকে পরিচিত মাসের নামগুলোই ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন। ফলে বাঙ্গলা নববর্ষের প্রথম মাসকে বলা হয়, ‘বৈশাখ’। সেখান থেকেই বাঙ্গলা নববর্ষ ‘১লা বৈশাখ’ বলে পরিচিত হয়। লক্ষণীয়, মাস ও সপ্তাহের দিনগুলোর নাম বহু শতাব্দী ধরেই ভারতবর্ষে প্রচলিত নামের মতোই রেখে দিলেও, মাত্র প্রায় ৪৭৫ বছর পূর্বে সূচিত অনার্য বাঙ্গলা মুসলিম হিজরি সৌর সন, ‘বঙ্গাব্দ’ - আর দু’হাজারেরও পূর্বে সূচিত আর্য ভারতীয় হিন্দু সৌর সন, ‘বিক্রমাব্দ’, মৌলিকভাবেই সম্পূর্ণ ভিন্ন। এমন কী মাসসমূহের একই নাম ব্যবহার করলেও, মূলত: মুসলিম অনার্য বাঙ্গলা সনের সূচনা হয়, ‘বৈশাখ’ দিয়ে, শেষ ‘চৈত্র’ দিয়ে – মূলত: হিন্দু আর্য ভারতীয় সন শুরু হয় ‘চৈত্র’ দিয়ে, শেষ হয় বৈশাখে। বাঙ্গলা সনের হিসাবে প্রথমবর্ষ ধরা হয় হজরত মোহাম্মদের (দ:) নিজস্ব ও স্বাধীনভাবে স্বধর্ম চয়নের অধিকার রক্ষায় দৃঢ়-প্রতিজ্ঞদের ধর্ম রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যাচারীদের প্রতিবন্ধকতার মুখে স্বীয় দেশ ছেড়ে মদিনা শরীফের ধর্মানুরাগীদের আমন্ত্রণ ও সহায়তায় মদিনা শরীফ স্থানান্তর হওয়া, তথা ‘হিজরত’ করেন। বিক্রমী সনের হিসাবে প্রথমবর্ষ ধরা হয়, নিজেকে ‘বিক্রমাদিত্য’ বলে অহংকারমণ্ডিত ঘোষণা দিয়ে, বলপ্রয়োগে পরের দেশ দখল করে সেখানকার সবার ওপর নিজস্ব বর্ণবৈষম্যমূলক ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার রক্তক্ষয়ী আগ্রাসী যুদ্ধে বিজয়ের সনকে। চেতনাই ভিন্ন!
উপসংহার : সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার নিয়ামক
ওপরে বর্ণিত পালনাচার ও চেতনাই ছিল বাঙ্গলার আবহমান সংস্কৃতির অন্যতম পার্বণ হিসেবে বাঙ্গলা নববর্ষের উদযাপন-উৎসবের আদি ও আসল ঐতিহ্যবাহী রূপ ও চেতনা। সেটাই কৃষিনির্ভর, ধর্মানুরাগী রক্ষণশীল ঐতিহ্যবাহী কৃষক-প্রধান লোক-বাঙ্গলার উপযোগময় সংস্কৃতি। তার প্রহসনমূলক যে শহুরে নগণ্য কিছুর চারু কলা-শিল্পকলা আর রমনার বটমূলে ইলিশ খেতে না পারা কৃষককে অপমান করার সমতুল্য ইলিশ পান্তার ‘লেইট ব্রেকফাস্ট (!)’ করা আর গান গাওয়া, মঙ্গল বা বৈশাখী ‘শোভাযাত্রা’ আর টেলিভিশনের শহুরে রুচির অনুষ্ঠানে সীমিত ‘নববর্ষ’ পালনের প্রহসন– তার ভড়ং বাদ দিয়ে, লোকবাঙ্গলার সেই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ উদযাপনের কর্মকাণ্ড ও চেতনায় ফিরে যাওয়া আবশ্যক। জাতীয় সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা, তথা স্বাধীনতার স্বার্থেই।
লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মী, ইতিহাসবেত্তা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকার আইন বিশেষজ্ঞ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

