আমেরিকায় অপরাধ বাড়ছে। সেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় সোমবার এই আদেশ জারির মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগকে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নেওয়ার অনুমতি দেন তিনি। একই সঙ্গে পেন্টাগনকে ৮০০ ন্যাশনাল গার্ড সদস্য মোতায়েনেরও নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যাদের মধ্যে ১০০ থেকে ২০০ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করবেন। এছাড়া অস্থায়ীভাবে শহরের পুলিশ বিভাগের দায়িত্বও নিয়েছেন তিনি। এটি রাজধানীতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নেওয়ার একটি বিষ্ময়কর বিষয়।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ শহরের নির্বাচিত নেতাদের এড়িয়ে গেছে। এমনভাবে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রয়োগের নজির আধুনিক আমেরিকার ইতিহাসে খুব কম এবং রাজনৈতিক রীতিনীতির বাইরের ঘটনা।
সোমবার হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেছেন, সহিংস দল এবং রক্তপিপাসু অপরাধী, মাদকাসক্ত ও গৃহহীনদের দখলে চলে গেছে রাজধানী। তাই অপরাধ ও অপরাধীদের কবল থেকে শহরকে রক্ষা করতে এ পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি।
যদিও পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৩ সালে সহিংস অপরাধ বেড়েছে কিন্তু তারপর থেকে তা দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। আর ২০২৪ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে সহিংস অপরাধ গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল।
চলতি গ্রীষ্মে দ্বিতীয়বারের মতো রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত শহরে সেনা মোতায়েন করেছেন। এর আগে জুন মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের অনুমোদন ছাড়াই লস অ্যাঞ্জেলেসে ন্যাশনাল গার্ড সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে ট্রাম্প দেশের আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের এই কর্মকাণ্ড আইনের লঙ্ঘন কি না তা নিয়ে স্থানীয় সময় সোমবার থেকে সান ফ্রান্সিসকোতে একটি ফেডারেল বিচার শুরু হয়েছে।
ট্রাম্প আরো বলেছেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজধানীর মধ্য দিয়ে খুব শক্তভাবে কাজ শুরু করেছে তার প্রশাসন। দ্রুত এখানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে। শুধু ডিসি নয়, ডেমোক্রেটিক নেতৃত্বাধীন অন্যান্য প্রধান শহরেও পরবর্তী সময়ে এই পদক্ষেপ নিতেন পারেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। যার মধ্যে থাকবে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত শিকাগো শহর। কারণ দীর্ঘদিন ধরে শহরটি সহিংস অপরাধে জর্জরিত। যদিও বছরের শুরুর দিকে উল্লেখযোগ্যভাবে এখানে অপরাধ কমেছে।
এ নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘যদি আমাদের প্রয়োজন হয়, আমরা শিকাগোতেও একই কাজ করব, যা একটি বিপর্যয়কর শহর হিসেবে এখন পরিচিত। ’
ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারের সময় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের নামে প্রায়ই বর্ণবাদীদের হেনস্তার আভাস ছিল। মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোর, শিকাগো এবং ওয়াশিংটনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোক্র্যাট অধ্যুষিত শহরগুলোকে এককভাবে চিহ্নিতও করেছিলেন তিনি। কারণ এসব শহরের জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই কৃষ্ণাঙ্গ।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ওয়াশিংটনজুড়ে এক ডজনেরও বেশি ফেডারেল সংস্থার শত শত কর্মকর্তা এবং এজেন্ট বিক্ষোভ করেছেন। সংবাদ সম্মেলনের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এবং অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। আর ট্রাম্পের এ পদক্ষেপে পুলিশ বাহিনীর তত্ত্বাবধান করবেন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি।
আমেরিকার সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ন্যাশনাল গার্ড সদস্যরা ‘প্রশাসনিক, রসদ সরবরাহ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে’ সহায়তা করার জন্য সশরীরে উপস্থিত থেকে কাজ করবেন। যেকোনো সময় ১০০ থেকে ২০০ সেনা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহায়তা করবেন।
এদিকে ট্রাম্পের এমন আদেশের বিরোধিতা করেছেন ডিসি মেয়র মিউরেল বাউসার। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ট্রাম্পের এই আদেশকে ‘অশান্তিকর ও নজিরবিহীন’ বলে আখ্যা দেন। তার মতে, গত বছর সহিংস অপরাধ তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল। ট্রাম্পের ব্যাপক অপরাধের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বাউসার বলেছেন, তিনি ও তার প্রশাসন ফেডারেল সরকারের সঙ্গে কাজ করবেন।
২০২৩ সালে খুনসহ সহিংস অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ওয়াশিংটনকে দেশের সবচেয়ে মারাত্মক শহরগুলোর একটিতে পরিণত করেছে। তবে ফেডারেল তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে সহিংস অপরাধ ৩৫ শতাংশ কমেছে। শহর পুলিশের মতে, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে এটি অতিরিক্ত ২৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
অপরদিকে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন সাধারণ মানুষ। সোমবার হোয়াইট হাউসের কয়েক ব্লক দূরে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়ে ‘বু’ ধ্বনি দিয়ে তার পদক্ষেপের বিরোধিতা করেন।
রাজধানীর বাসিন্দাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘ফ্রি ডিসির’ নির্বাহী পরিচালক কেয়া চ্যাটার্জি বলেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ওয়াশিংটন ডিসির বাসিন্দাদের অধিকারের ওপর চরম আঘাত। এটি বড় ধরনের উত্তেজনাকে উসকে দেবে। এটি অস্বাভাবিক একটি ঘটনা। এটি কেবল কর্তৃত্ববাদের বহিঃপ্রকাশ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

