বাংলাদেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে হাম (মিজলস) রোগের প্রাদুর্ভাব। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশজুড়ে প্রায় ৪০০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, বাংলাদেশে শুরু হওয়া এই সংকট সীমান্ত পেরিয়ে বৈশ্বিক ঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) জানিয়েছে, দেশে সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫৬ হাজার ছাড়িয়েছে। এপ্রিলের শুরু থেকে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল রোগীতে উপচে পড়ছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। অনেক জায়গায় শয্যা সংকটের কারণে রোগীদের মেঝেতে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি মিগুয়েল মাতেওস মুনিওজ জানান, আক্রান্তদের বড় অংশই এমন শিশু যারা হয় টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি, নয়তো আংশিক টিকা পেয়েছে। তিনি বলেন, কার্যকর সুরক্ষার জন্য হাম প্রতিরোধী টিকার দুটি ডোজ প্রয়োজন। কিন্তু গত কয়েক বছরে আমরা বিপুল সংখ্যক শিশু দেখেছি যারা হয় একটি ডোজ নিয়েছে, নয়তো কোনো টিকাই নেয়নি।
তিনি আরো জানান, গত বছর সরকার টিকার সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করায় সরবরাহে বিলম্ব ঘটে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।
হাম কেন এত ভয়ংকর?
বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক ভাইরাসগুলোর একটি হলো হাম। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে বাতাসে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারেন, যা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাতাসে ভাসমান থাকতে পারে। কোনো টিকাবিহীন ব্যক্তি ভাইরাসের সংস্পর্শে এলে তার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ।
শিশু ও বয়স্করা এ রোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। হাম থেকে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ, স্থায়ী অক্ষমতা, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সিডিসি জানিয়েছে, আক্রান্ত ব্যক্তি শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার চার দিন আগে থেকে এবং পরবর্তী চার দিন পর্যন্ত অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, হাম রোগের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। অধিকাংশ রোগী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠলেও অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, এনসেফালাইটিস, অন্ধত্ব এবং মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ডব্লিউএইচও-এর হিসাবে, ২০২৪ সালে কার্যকর টিকা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে প্রায় এক লাখ মানুষ হাম রোগে মারা গেছে।
সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা
বাংলাদেশের ঘনবসতিপূর্ণ শহর এবং শরণার্থী শিবিরগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে হাম। ইউনিসেফের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলাতেই ইতোমধ্যে রোগ শনাক্ত হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উন্মুক্ত সীমান্ত এবং মানুষের চলাচলের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও বাড়ছে উদ্বেগ
বাংলাদেশের এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও। সিডিসি বারবার সতর্ক করে বলেছে, বিশ্বের যেকোনো স্থানের হাম প্রাদুর্ভাব অন্য দেশগুলোর জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যেখানে টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৬০-এর দশক থেকেই হাম প্রতিরোধী টিকা চালু থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাগ্রহণের হার কমে গেছে। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মে পর্যন্ত দেশটিতে ১ হাজার ৮৪২টি নিশ্চিত হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে, যা ৩৯টি অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯৩ শতাংশই বড় আকারের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মোট হাম রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ২৮৫। কিন্তু ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২৮৮-এ, যা ১৯৯১ সালের পর সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-১৯ মহামারির পর যুক্তরাষ্ট্রে এমএমআর (হাম, মাম্পস ও রুবেলা) টিকার হার ৯৫ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৯২ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে লাখো শিশু এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলার বিকল্প নেই।
সূত্র: সিবিএস নিউজ
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


