দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন পেছনে ফেলে তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথে এগোচ্ছে ফ্রান্স। ইউরোপের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা সব মিলিয়ে প্যারিস এখন আঙ্কারাকে ভবিষ্যৎ ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
পশ্চিমা একাধিক কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সিরিয়া, আর্মেনিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগর ইস্যুতে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্যের পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে। এক পশ্চিমা সূত্রের ভাষ্য, ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুরস্ককে বিবেচনা করছে ফ্রান্স।
সম্প্রতি কায়রোতে গাজা শান্তি চুক্তি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পেছনে দাঁড়ানোর পরিবর্তে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর প্রস্তাবে দর্শক সারিতে পাশাপাশি বসেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর দুই নেতার এই উপস্থিতি সম্পর্কের পরিবর্তিত চিত্রের প্রতীক।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বদলে দিয়েছে হিসাব
ফরাসি নীতিনির্ধারকদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কের শীতলতা প্যারিসের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। ২০২৩ সালের পর থেকে এরদোয়ান ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক হয়নি। পাশাপাশি মস্কোর ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে আঙ্কারার সহযোগিতা এবং রাশিয়ার সঙ্গে বড় গ্যাস ক্রয়চুক্তি নবায়ন না করাও ফ্রান্স ইতিবাচকভাবে দেখছে।
ফ্রান্সের সাবেক রাষ্ট্রদূত জেরার আরোর মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই তুরস্ক এমন কৌশল অনুসরণ করেছে, যাতে প্রায় কারও সঙ্গে সরাসরি বিরোধে না জড়িয়ে কার্যত কিয়েভের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউরোপের নির্ভরতা কমে আসছে এবং রাশিয়ার চাপ মোকাবিলায় তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে অভিন্ন স্বার্থ
সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে সমর্থন, লেবাননে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান এবং ইরান ইস্যুতে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান এসব ক্ষেত্রে ফ্রান্স ও তুরস্কের অবস্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল দেখা যাচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, ইসরাইলের সঙ্গে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং লেবানন ইস্যুতে ফ্রান্স-ইসরাইল মতবিরোধও প্যারিস ও আঙ্কারার কৌশলগত সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা
দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে প্রতিরক্ষা শিল্প। তুরস্ক ফ্রান্স-ইতালির যৌথ উদ্যোগে তৈরি এসএএমপি/টি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও যৌথ উৎপাদন নিয়ে মতবিরোধের কারণে এতদিন এই চুক্তি আটকে থাকলেও এখন তা পুনর্বিবেচনা করছে প্যারিস।
ফরাসি প্রতিরক্ষা খাতের প্রতিষ্ঠান সাফরান এবং তুরস্কের শীর্ষ ড্রোন নির্মাতা বাইরাক্তার সম্প্রতি কৌশলগত অংশীদারত্বে পৌঁছেছে। এই চুক্তির আওতায় ড্রোন প্রযুক্তি, অপট্রনিক সেন্সর, নেভিগেশন ব্যবস্থা এবং গাইডেড অস্ত্র প্রযুক্তি যৌথভাবে উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে বাইরাক্তার টিবি-২ ড্রোনে সাফরানের ইউরোফ্লির ইলেকট্রো-অপটিক্যাল সিস্টেম সংযুক্ত হবে।
এছাড়া ড্রোন ও হেলিকপ্টার প্রযুক্তিতেও যৌথ সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনা করছে ফ্রান্স। গত বছর তুরস্কের প্রতিরক্ষা রপ্তানি ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের দ্রুত উত্থানের প্রমাণ।
মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক বাধা রয়ে গেছে
তবে সম্পর্ক উন্নয়নের পথে এখনো বেশ কিছু জটিলতা রয়েছে। ফরাসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএফআরআইর বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্স মনে করে তুরস্ক ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক পথে এগোচ্ছে এবং আঙ্কারার পররাষ্ট্রনীতি অনেক ক্ষেত্রে ইউরোপীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এছাড়া আর্মেনিয়ার সঙ্গে সীমান্ত খুলে দেওয়া, তুরস্কে ফরাসি দূতাবাস পরিচালিত বিদ্যালয় নিয়ে বিরোধ এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্রিস-তুরস্ক উত্তেজনাও দুই দেশের সম্পর্কের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
ফ্রান্সের সঙ্গে গ্রিসের প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং গ্রিসের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ম্যাক্রোঁর প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েও আঙ্কারার অসন্তোষ রয়েছে। তবে তুর্কি কর্মকর্তাদের দাবি, তুরস্ক কখনোই গ্রিসে হামলার পরিকল্পনা করেনি এবং ফরাসি অবস্থান মূলত এথেন্সের কাছে আরও অস্ত্র বিক্রির কূটনৈতিক কৌশল।
অনিশ্চয়তার আরেক কারণ ম্যাক্রোঁর বিদায়
আগামী বছরের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ম্যাক্রোঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। ফলে তার উত্তরসূরি বিশেষ করে ডানপন্থী নেতা মারিন লে পেন বা জর্দান বারদেলা ক্ষমতায় এলে ফ্রান্সের তুরস্কনীতি পরিবর্তিত হতে পারে। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তুরস্ক ইতোমধ্যে ফ্রান্সের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের মতবিরোধ পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগলেও ইউরোপের নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির নতুন বাস্তবতা ফ্রান্স-তুরস্ক সম্পর্ককে একটি নতুন কৌশলগত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।
সূত্র: মিডলইস্ট আই
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



মসজিদের ইমাম থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা
শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি ভোলেননি তার বন্ধু ও সহযোদ্ধারা
বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা দ্রুত চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর