যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে গভর্নর পদে একের পর এক চমকপ্রদ জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এর ফলে কয়েক দশক ধরে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা পাঁচটি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদ হাতছাড়া হয়েছে। এসব অঙ্গরাজ্যেই ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হয়েছিলেন। কোনো কোনো তিনি দুই অঙ্কের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন।
এ জয়ের মধ্য দিয়ে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা গভর্নর পদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯টিতে। এক প্রজন্মের মধ্যে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে দলটি।
বুধবার সকাল পর্যন্ত রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আলাস্কার গভর্নর নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়নি।
ডেমোক্র্যাটদের এই জয় ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও অভিবাসননীতির বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে বিরোধিতা আরো জোরালো করতে পারে। পাশাপাশি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নতুন কিছু অঙ্গরাজ্যকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী এলাকায় পরিণত করার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
ডেমোক্র্যাটিক গভর্নরস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ও কেনটাকির গভর্নর অ্যান্ডি বেসিয়ার মঙ্গলবারের জয়কে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফল বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, কয়েক দশক ধরে রিপাবলিকানদের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে ডেমোক্র্যাটরা।
এক সাক্ষাৎকারে বেসিয়ার বলেন, ‘সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল, এমন প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে আমরা ডেমোক্র্যাট গভর্নর নির্বাচিত করেছি। পাশাপাশি আমাদের নির্বাচনী পরিসরও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৮ সালের নির্বাচনে আইওয়া কিংবা ওহাইওর মতো অঙ্গরাজ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা।’
তিনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য দেখানোর পরিবর্তে সাধারণ মানুষের জীবন ও সমস্যা নিয়ে মনোযোগী প্রচারণার কারণেই তারা জয় পেয়েছেন।

টেক্সাসে গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়ে রাজ্যটির প্রথম লাতিনা নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন জিনা হিনোজোসা। তিন দশকের বেশি সময় পর অঙ্গরাজ্যটিতে প্রথম ডেমোক্র্যাট গভর্নরও হতে যাচ্ছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল সম্প্রসারণের ট্রাম্পের উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন হিনোজোসা। ফলে দেশটির অন্যতম বৃহৎ লাতিনো জনগোষ্ঠীর বসবাস থাকা টেক্সাসে ট্রাম্পের অভিবাসননীতির বিরুদ্ধে নতুন করে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন তিনি।
জর্জিয়ায় রিপাবলিকানদের দখলে থাকা গভর্নর পদটি পুনরুদ্ধার করেছেন আটলান্টার সাবেক মেয়র কিশা ল্যান্স বটমস। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ২০০৩ সালের পর প্রথমবারের মতো জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট গভর্নর পেতে যাচ্ছে।

মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে দলটি। দীর্ঘ ও তিক্ত ব্যক্তিগত আক্রমণনির্ভর নির্বাচনি প্রচারণার পর ওহাইওর প্রথম ডেমোক্র্যাট গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন অ্যামি অ্যাক্টন। প্রায় ২০ বছর পর আইওয়ায় প্রথম ডেমোক্র্যাট গভর্নর হয়েছেন রব স্যান্ড।
অন্যদিকে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্য মিশিগান ও উইসকনসিনেও বিদায়ী ডেমোক্র্যাট গভর্নরদের স্থলাভিষিক্ত করতে নতুন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের নির্বাচিত করেছেন ভোটাররা।

কানসাসে ডেমোক্র্যাট গভর্নর লরা কেলির উত্তরসূরি নির্বাচনে বুধবার সকাল পর্যন্ত লড়াইয়ের ফল চূড়ান্ত হয়নি। তবে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও রাজ্য সিনেটর সিন্ডি হলশার সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন।
আট বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে মাত্র ১৬টিতে গভর্নর ছিল ডেমোক্র্যাটদের। ধারাবাহিক অগ্রগতির ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সংখ্যাটি বেড়ে ২৪-এ দাঁড়ায়। এবারের নির্বাচনের পর দেশটির প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ ডেমোক্র্যাট গভর্নরশাসিত অঙ্গরাজ্যে বসবাস করবেন বলে জানিয়েছে ডেমোক্র্যাটিক গভর্নরস অ্যাসোসিয়েশন।
এবার কোনো রিপাবলিকান প্রার্থী ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকা গভর্নর পদ ছিনিয়ে নিতে পারেননি।
এমনকি রিপাবলিকান প্রার্থীরা যেসব অঙ্গরাজ্যে জয় পেয়েছেন, সেখানেও কয়েকটি ফল ছিল প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান প্রতিনিধি বায়রন ডোনাল্ডস গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের উত্তরসূরি নির্বাচিত হলেও তার জয়ের ব্যবধান ছিল ২ শতাংশের কম। অথচ চার বছর আগে অঙ্গরাজ্যটিতে প্রায় ২০ শতাংশ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল রিপাবলিকানরা।
রিপাবলিকানদের জন্য কিছুটা স্বস্তির জায়গা ছিল নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চল। সেখানে মধ্যপন্থি হিসেবে পরিচিত নিউ হ্যাম্পশায়ারের কেলি আয়োত ও ভারমন্টের ফিল স্কট সহজেই পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।
তবে বাকি প্রায় সব জায়গায় উচ্চমূল্যস্ফীতি, ইরান যুদ্ধ এবং ট্রাম্পের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড নিয়ে জনঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। পাশাপাশি অঙ্গরাজ্যভেদে স্থানীয় সমস্যাগুলোকেও প্রচারণায় গুরুত্ব দিয়েছে দলটি।
আইওয়ায় গভর্নর পদ পুনরুদ্ধার করা রব স্যান্ড কৃষিপ্রধান এলাকায় ক্যানসারের উচ্চহারের বিষয়টি সামনে আনেন। জর্জিয়ায় কিশা ল্যান্স বটমস কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। আর টেক্সাসে জিনা হিনোজোসা তথ্যকেন্দ্র বা ডেটা সেন্টারের দ্রুত বিস্তার নিয়ে প্রচারণা চালান।

নেভাডায় ডেমোক্র্যাট অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যারন ফোর্ড লাস ভেগাসের পর্যটন খাতে মন্দার আশঙ্কাকে সামনে রেখে রিপাবলিকান গভর্নর জো লম্বার্ডোকে পরাজিত করেন।
তবে এসব জয়ের পেছনে মূলত একটি অভিন্ন মনোভাব কাজ করেছে। ভোটারদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে তাদের জীবনযাত্রার মান ক্রমেই খারাপ হচ্ছে এবং ওয়াশিংটন কিংবা অঙ্গরাজ্যের রাজধানীগুলোতে থাকা নেতারা তাদের সমস্যার কথা শুনছেন না।
তবে টেক্সাস, আইওয়া, ওহাইও ও জর্জিয়ায় নতুন নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট গভর্নররা বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এসব অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ডেমোক্র্যাট গভর্নরদের অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। যেমন—গর্ভপাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি কিংবা শ্রমিক ইউনিয়নের সুরক্ষা সম্প্রসারণ। বুধবার সকাল পর্যন্ত এসব অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় ছিল। তবে টেক্সাসের প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাটরা কাছাকাছি অবস্থানে ছিলেন।
তা সত্ত্বেও নিজস্ব পছন্দের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ, নির্বাহী আদেশ জারি এবং রিপাবলিকানদের আনা বিল ভেটো দেওয়ার মাধ্যমে অঙ্গরাজ্যগুলোর নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারবেন নতুন গভর্নররা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


