যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। গতকাল সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একটি কার্গো জাহাজ আটক করলে নতুন এ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। নিজেদের জাহাজ আটকের পর মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে এ পরিস্থিতিতে কোনো শান্তি আলোচনায় বসবে না বলে জানিয়েছে তেহরান। অন্যদিকে সম্ভাব্য এই আলোচনা ঘিরে পাকিস্তানের ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ২০ হাজার সদস্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে। এদিকে আলোচনার জন্য গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় পাকিস্তানে পৌঁছানোর কথা মার্কিন প্রতিনিধি দলের। শান্তি আলোচনার অনিশ্চয়তায় বিশ্বে তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। আলোচনা অনিশ্চয়তার মধ্যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানিয়েছেন, ইরানের বন্দরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধই শান্তি আলোচনার প্রধান অন্তরায়। খবর বিবিসি, আলজাজিরা ও রয়টার্সের।
নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য জেডি ভ্যান্স, স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার ইসলামাবাদের পথে রয়েছেন। তবে এ বিষয়ে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এখনো যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। তিনি পাকিস্তানের উদ্দেশে যাত্রা করেননি। দ্বিতীয় দফার আলোচনার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত হওয়ায় ভ্যান্স ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা দেননি। সোমবার রয়টার্সকে এক শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শান্তি আলোচনায় অংশগ্রহণের বিষয়ে তারা বিবেচনা করছে। এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি তেহরান।
পরস্পরবিরোধী বার্তা দেওয়ার পরও সোমবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয়ই আরো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা পাকিস্তানে শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে আলোচক পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মঙ্গলবার ওয়াশিংটন থেকে ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময়ে ইরানের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ, যিনি আগের দফার আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন, তিনি উপস্থিত থাকবেন, যদি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট উপস্থিত থাকেন। খবর নিউ ইয়র্ক টাইমসের।
জাহাজ আটকের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় মার্কিন নির্দেশ অমান্য করায় জাহাজটিতে আক্রমণ চালানো হয়। সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, টানা ছয় ঘণ্টা ধরে বারবার সতর্ক বার্তা দেওয়ার পরও তুসকা নামে ওই জাহাজের ক্রুরা তা মেনে চলেনি। পরবর্তী সময়ে ৩১তম মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিটের মার্কিন মেরিন সেনারা তুসকায় উঠে জাহাজটি দখলে নেয়।
এই ঘটনাকে ইরান ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকেই বলেছেন, সমস্যা সমাধানে কূটনৈতিক তৎপরতায় ওয়াশিংটন বিশ্বাস করে না। এছাড়া তেহরান তার প্রস্তাবিত দাবি থেকে সরে আসবে না বলেও জানান তিনি। বাকেই বলেন, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কোনো আলটিমেটাম বা ডেডলাইনে তেহরান বিশ্বাস করে না। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইসলামবাদে আবারও শান্তি আলোচনা শুরুর আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ওয়াশিংটন অবাস্তব এবং অযৌক্তিক দাবি করছে বলে অভিযোগ ইরানের। তেহরানের এক সিনিয়র কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছে, তাদের বন্দরগুলোতে ওয়াশিংটনের অবরোধ শান্তি আলোচনাকে অবমূল্যায়ন করছে।
হরমুজে মার্কিন অবরোধ আলোচনার অন্তরায় : পাকিস্তান
হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধ শান্তি আলোচনার প্রধান অন্তরায় বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রধান আসিম মুনির। আলোচনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সময় তিনি এ মন্তব্য করেন। ট্রাম্পকে অসীম মুনির বলেন, ‘ইরানি বিভিন্ন বন্দরে মার্কিন অবরোধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পুনরায় শান্তি আলোচনা শুরুর ক্ষেত্রে বড় বাধা তৈরি করেছে।’ ওই সূত্র বলেছে, ‘ট্রাম্প মুনিরকে জানিয়েছেন, তিনি তার এই পরামর্শ বিবেচনা করবেন।’ সূত্রটি বলেছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে পাকিস্তানে একটি প্রতিনিধি দল পাঠানোর অনুরোধ জানাতে যোগাযোগ করেছিলেন। তবে পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ইরান কোনো প্রতিনিধি দল পাঠাবে না।
চুক্তিতে স্বাক্ষর না করলে ইরানকে উড়িয়ে দেওয়া হবে : ট্রাম্প
চুক্তিতে স্বাক্ষর না করলে ইরানকে উড়িয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ হুমকি দেন। ট্রাম্প আরো বলেন, প্রতিনিধিদল সোমবার সন্ধ্যার মধ্যেই পাকিস্তানে পৌঁছাবে এবং চুক্তিটি ‘আজই’ স্বাক্ষরিত হবে। চুক্তি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও ট্রাম্প কড়া ভাষায় ইরানকে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, এটি ইরানের জন্য একটি ন্যায্য ও যুক্তিসংগত চুক্তিতে আসার শেষ সুযোগ। ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেন, যদি তারা এই চুক্তিতে স্বাক্ষর না করে, তবে পুরো দেশটি উড়িয়ে দেওয়া হবে। তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সেতুগুলো লক্ষ্য করে হামলার হুঁশিয়ারিও দেন।
আলোচনা অনিশ্চয়তায়, আবার বাড়ছে তেলের দাম
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পুনরায় আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বার্তার জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গতকাল এশিয়ায় অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক বাজারদর বা ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম সাত শতাংশের বেশি বেড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মার্কিন অবরোধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় ইরানের পতাকাবাহী একটি মালবাহী জাহাজ মার্কিন বাহিনী জব্দ করেছে। এই ঘটনার পরপরই তেলের দামের সাম্প্রতিক এই উল্লম্ফন ঘটে।
মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে জেডি ভ্যান্স
ইরানের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনার জন্য পাকিস্তানে যাওয়া মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেন, তার ‘প্রতিনিধিরা’ সোমবার সন্ধ্যায় ইসলামাবাদে পৌঁছাবেন। এর আগে, হোয়াইট হাউস জানায়, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। তবে এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তা শঙ্কায় ভ্যান্স ইসলামাবাদে যাবেন না। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন, এই প্রতিনিধিদলে ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফ ও তার জামাতা জ্যারেড কুশনারও থাকবেন।
দ্বিতীয় দফার আলোচনার সাফল্যের প্রত্যাশা ইসলামাবাদের
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি গতকাল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নাটালি বেকার এবং ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদামের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। ইসলামাবাদের ডিপ্লোম্যাটিক এনক্লেভে মার্কিন দূতাবাসে নাটালি বেকারের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে মহসিন নকভি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আসন্ন দ্বিতীয় দফার আলোচনার নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মহসিন নকভি বলেছেন, পাকিস্তান তাদের সব বিশেষ অতিথির জন্য বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, দ্বিতীয় দফার এই আলোচনার সাফল্যের জন্য প্রার্থনা করছে ইসলামাবাদ।
মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান
ইরানি পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ জব্দের পাল্টা জবাব হিসেবে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে। তবে ড্রোন হামলায় জাহাজটির কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না বা হয়ে থাকলে কতটুকু ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এর আগে, গত রোববার ইরানি পতাকাবাহী পণ্যবাহী একটি জাহাজ আটক করে মার্কিন নৌবাহিনী।
পাকিস্তানে ৪৮ ঘণ্টায় ছয় মার্কিন বিমানের অবতরণ
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানে গত ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত ছয়টি মার্কিন বিমান অবতরণ করেছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ছয়টি মার্কিন সরকারের বিমান যোগাযোগের সরঞ্জাম, মোটরকেড সহায়তা এবং অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর ঘাঁটি নূর খান-এ অবতরণ করেছে এবং সেখান থেকে ফিরে এসেছে। এর মধ্যে অন্তত দুটি বিমান গতকাল অবতরণ করেছে, বাকি চারটি বিমান গত ৪৮ ঘণ্টায় অবতরণ করেছে।
যুদ্ধবিরতির পর লেবাননের ৩৯ গ্রামে ইসরাইলের হামলা
যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের ৩৯টি গ্রামে ইসরাইলি বাহিনী হামলা চালিয়েছে। গতকাল হিজবুল্লাহর মিত্র ও লেবাননের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ আলি হাসান খলিল এই তথ্য জানিয়েছেন। লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরির শীর্ষ সহযোগী আলি হাসান খলিল বলেন, ইসরাইলি বাহিনীর চালানো শক্তিশালী বিস্ফোরণে বেসামরিক নাগরিকদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং গ্রামগুলোতে বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর অবকাঠামো লক্ষ্য করে এসব অভিযান পরিচালনা করছে।
ইসরাইলের সঙ্গে আলোচনা ইসলামাবাদ আলোচনার থেকে ভিন্ন : লেবাননের প্রেসিডেন্ট
ইসরাইলের সঙ্গে আসন্ন আলোচনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শান্তি আলোচনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বলে জানিয়েছেন লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে মি. আউন বলেন, এই আলোচনায় লেবাননের প্রতিনিধিত্ব করবেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সাবেক লেবানিজ রাষ্ট্রদূত সাইমন কারাম। আলোচনার তিনটি প্রধান লক্ষ্য হলো—সংঘাত বা শত্রুতা বন্ধ করা, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ঘটানো এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দক্ষিণ সীমান্ত পর্যন্ত লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েন করা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

