নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতার সমাজতত্ত্ব

আবদুল লতিফ মাসুম

নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতার সমাজতত্ত্ব

‘History does not merely repeat itself; it accumulates its unresolved contradictions into new and more complex forms of crisis.’ সামাজিক তাত্ত্বিকদের এই উপলব্ধি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো সমাজে সহিংসতা হঠাৎ করে জন্ম নেয় না; বরং এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত চাপ, নৈতিক অবক্ষয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমষ্টিগত ফলাফল হিসেবে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। কার্ল মার্কস যেমন বলেছিলেন, ‘মানুষ তার নিজের ইতিহাস তৈরি করে, কিন্তু নিজের ইচ্ছামতো নয়,’ তেমনি সামাজিক সহিংসতাও ব্যক্তিগত ইচ্ছার বাইরে বৃহত্তর কাঠামোগত বাস্তবতার মধ্যে গড়ে ওঠে।

সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একটি সমাজের সহিংসতার ধারা বোঝার জন্য কেবল ঘটনাগুলোর ওপর দৃষ্টি দেওয়া যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন এর পেছনের ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা। এমিল ডুর্খাইমের ভাষায়, সমাজ একটি নৈতিক কাঠামো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং যখন সেই কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন ‘anomie’ বা মূল্যবোধহীনতার অবস্থা তৈরি হয়। এই অবস্থায় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আচরণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং সহিংসতা একটি সম্ভাব্য সামাজিক আচরণে পরিণত হয়। এই তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচার করলে দেখা যায়, বর্তমান সময়ের সামাজিক সহিংসতা কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনা নয়; বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ। রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তি—এই তিন স্তরের পারস্পরিক সম্পর্ক যখন ভারসাম্য হারায়, তখন সহিংসতা একটি পুনরাবৃত্ত সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হয়।

বিজ্ঞাপন

এই বোঝাপড়ার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সামাজিক বাস্তবতায় সহিংসতা, নিষ্ঠুরতা ও অপরাধপ্রবণতার যে ধারাবাহিক চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এটি বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক রূপান্তরের ফল, যেখানে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং পারিবারিক-সামাজিক মূল্যবোধ একসঙ্গে জটিল সংকটে পড়েছে। চট্টগ্রামের কলেজছাত্র সাজিদের নির্মম হত্যা, মোহাম্মদপুরের ধারাবাহিক গ্যাং সংঘর্ষ, পিরোজপুরে ডাকাতি-সংঘর্ষে প্রাণহানি, কুমিল্লা ও সুনামগঞ্জে নারীর ওপর সহিংসতা কিংবা পারিবারিক দ্বন্দ্বে শিশুহত্যার মতো ঘটনাগুলো আলাদা করে দেখলে আমরা ভুল করব। এগুলো আসলে একই সামাজিক কাঠামোর ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ, যেখানে সহিংসতা ধীরে ধীরে একটি ‘স্বাভাবিক আচরণ-ব্যবস্থায়’ পরিণত হচ্ছে।

সমাজবিজ্ঞানের ক্লাসিক তাত্ত্বিক এমিল ডুর্খাইম ‘anomie’ ধারণার মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন, যখন সমাজের নৈতিক নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন ব্যক্তি তার আচরণের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা হারায়। তখন অপরাধ শুধু ব্যতিক্রম থাকে না, বরং একটি সামাজিক সম্ভাবনায় পরিণত হয়। বাংলাদেশের নগরায়ণ ও দ্রুত সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই তত্ত্ব অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাব্যবস্থা এবং স্থানীয় সামাজিক নিয়ন্ত্রণ—এই চারটি স্তম্ভ দুর্বল হয়ে পড়ার ফলে একটি নৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা সহিংস আচরণের জন্য উর্বর ভূমি তৈরি করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ‘World Report on Violence and Health (2002)’ অনুযায়ী, সহিংসতা কখনো একক কারণে ঘটে না; এটি ব্যক্তিগত, সম্পর্কগত, সামাজিক ও কাঠামোগত—এই চার স্তরের আন্তঃসম্পর্কের ফল। বাংলাদেশে আমরা যদি এই কাঠামো বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাই—ব্যক্তিগত স্তরে হতাশা ও মানসিক চাপ, সম্পর্কগত স্তরে পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা ও গ্যাং সংস্কৃতি, সামাজিক স্তরে বৈষম্য ও বেকারত্ব এবং কাঠামোগত স্তরে বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে একটি সহিংসতার বাস্তুতন্ত্র তৈরি হয়েছে।

মোহাম্মদপুরের দীর্ঘমেয়াদি অপরাধচক্র এই বাস্তবতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। এখানে অপরাধ কেবল ব্যক্তি পর্যায়ের নয়, বরং একটি নেটওয়ার্কভিত্তিক অর্থনীতি হিসেবে কাজ করে, যেখানে মাদক, চাঁদাবাজি, দখল ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় একে অপরকে পুনরুৎপাদন করে। ক্রিমিনোলজির ‘Organized Crime Theory’ অনুযায়ী, যখন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয় এবং বিকল্প ক্ষমতা কাঠামো গড়ে ওঠে, তখন অপরাধী গোষ্ঠী একটি ছায়া-রাষ্ট্রের মতো আচরণ করতে শুরু করে। মোহাম্মদপুরের ক্ষেত্রে এই ছায়া-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অস্তিত্ব একাধিক গবেষণায় আভাস পাওয়া যায়, যেখানে স্থানীয় গ্যাংগুলো শুধু অপরাধ করে না, বরং সামাজিক নিয়ন্ত্রণও প্রতিষ্ঠা করে।

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো তার ‘Discipline and Punish’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত নয়; এটি সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা দেখি—একদিকে রাষ্ট্রীয় আইন, অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতা কাঠামো। এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষ প্রায়ই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়, যেখানে আইন নয়, বরং শক্তিই নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করে। অর্থনৈতিক বৈষম্য এই সহিংসতার আরেকটি মূল চালিকাশক্তি। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মারটনের ‘Strain Theory’ অনুযায়ী, যখন সমাজ মানুষকে সাফল্যের লক্ষ্য দেয় কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের উপায় সীমিত করে দেয়, তখন ব্যক্তি বিকল্প (এবং অনেক সময় অবৈধ) পথ বেছে নেয়। বাংলাদেশের শহুরে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে বস্তি ও নিম্নআয়ের এলাকাগুলোয় এই বাস্তবতা অত্যন্ত স্পষ্ট। চাকরি, শিক্ষা ও সামাজিক গতিশীলতার সীমাবদ্ধতা তরুণদের অপরাধ জগতের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে দ্রুত অর্থ ও ক্ষমতা অর্জনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সহজ মনে হয়।

মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা এই প্রক্রিয়াকে আরো জটিল করেছে। সহিংসতার দৃশ্য যখন বারবার ভাইরাল হয়, তখন তা একধরনের ‘desensitization’ তৈরি করে, অর্থাৎ মানুষ ধীরে ধীরে সহিংসতার প্রতি সংবেদনশীলতা হারায়। কানাডিয়ান মনোবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট বান্দুরার ‘Social Learning Theory’ অনুযায়ী, মানুষ পর্যবেক্ষণ ও অনুকরণের মাধ্যমে আচরণ শেখে। ফলে যখন তরুণরা দেখে, সহিংসতা ক্ষমতা বা পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে কাজ করছে, তখন তারা তা অনুকরণ করতে উৎসাহিত হয়।

রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই পুরো কাঠামোকে স্থায়ী করে তোলে। যখন অপরাধের দ্রুত ও ন্যায্য বিচার নিশ্চিত হয় না, তখন অপরাধীরা আরো সাহসী হয়ে ওঠে। ক্রিমিনোলজিতে এটিকে বলা হয় ‘Impunity Effect’—শাস্তিহীনতা অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো সহিংসতার ‘স্বাভাবিকীকরণ’। অর্থাৎ সমাজ ধীরে ধীরে সহিংসতাকে একটি নিয়মিত ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। যখন প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি বা গ্যাং সহিংসতার খবর আসে, তখন মানুষের মানসিক প্রতিক্রিয়া দুর্বল হয়ে যায়। এটি শুধু মনস্তাত্ত্বিক নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বিপজ্জনক।

পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যৌথ পরিবার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে একক পরিবারে রূপান্তরিত হওয়ায় শিশু ও তরুণদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া দুর্বল হচ্ছে। আগে যে মূল্যবোধ পরিবার ও সম্প্রদায়ের মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে শেখানো হতো, তা এখন অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। এর ফলে তরুণরা বিকল্প সামাজিক গোষ্ঠী, যেমন গ্যাং বা অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কোনো একক সমাধান যথেষ্ট নয়; বরং এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক পুনর্গঠনের প্রশ্ন—

প্রথমত, আইনের শাসনকে কার্যকর ও দৃশ্যমান করতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

দ্বিতীয়ত, পুলিশিং ব্যবস্থাকে প্রতিক্রিয়াশীল না করে প্রতিরোধমূলক করতে হবে, যেখানে প্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং কমিউনিটি এনগেজমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তৃতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল পরীক্ষাকেন্দ্রিক না রেখে নৈতিক ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশের দিকে নিয়ে যেতে হবে। ফিনল্যান্ডের মতো দেশের শিক্ষা মডেলে দেখা যায়, সেখানে সহানুভূতি, সহযোগিতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও এই দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

চতুর্থত, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো ছাড়া সহিংসতা কমানো সম্ভব নয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শহুরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধি অপরিহার্য। উন্নয়ন অর্থনীতির গবেষণায় দেখা যায়, যেখানে সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী, সেখানে সহিংস অপরাধের হার তুলনামূলকভাবে কম।

পঞ্চমত, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে না পারলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ বারবার ব্যর্থ হবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের ‘Legitimate Monopoly of Violence’ ধারণা অনুযায়ী, সহিংসতার বৈধ ব্যবহার কেবল রাষ্ট্রের হাতে থাকতে পারে; অন্য কোনো গোষ্ঠীর নয়। কিন্তু বাস্তবে যখন এই নিয়ন্ত্রণ বিভক্ত হয়ে যায়, তখন রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে।

সবশেষে বলা যায়, সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা, যা সমাজের ভেতর থেকে জন্ম নেয় এবং সমাজের ভেতরেই পুনরুৎপাদিত হয়। তাই এর মোকাবিলাও হতে হবে কাঠামোগত, দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক—শুধু আইনশৃঙ্খলা দিয়ে নয়, বরং নৈতিক পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং সামাজিক সংহতির পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে। বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দ্রুত আধুনিকায়ন, অন্যদিকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও সহিংসতার বিস্তার। এই দুই প্রবাহের মধ্যে কোনটি প্রাধান্য পাবে, তা নির্ভর করছে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ওপর। যদি আমরা সহিংসতাকে কেবল অপরাধ হিসেবে দেখি, তাহলে আমরা তার গভীর সামাজিক শিকড়কে উপেক্ষা করব। আর যদি আমরা এটিকে একটি সামাজিক রোগ হিসেবে বিবেচনা করি, তবে তার চিকিৎসাও হতে হবে সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি এবং গভীরভাবে কাঠামোগত।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন