ইরান যুদ্ধসংশ্লিষ্ট মার্কিন সামরিক সদস্যদের মৃত্যুসংখ্যা সংশোধন করে ২১-এ উন্নীত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। একই সঙ্গে যুদ্ধে আহত মার্কিন সামরিক সদস্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬৫ জনে। ৯ অক্টোবর পেন্টাগনের প্রকাশ্য হতাহত-সংক্রান্ত তথ্যভান্ডার হালনাগাদ করার পর ১০ অক্টোবর এ তথ্য প্রকাশ্যে আসে।
সংশোধিত হিসাবের মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন দুজন সামরিক সদস্য, যাদের মৃত্যু সরাসরি যুদ্ধের আঘাতে হয়নি। তাদের একজন নিউইয়র্ক আর্মি ন্যাশনাল গার্ডের মেজর সরফ্লাই ডেভিয়াস। তিনি গত ৬ মার্চ কুয়েতে দায়িত্ব পালনকালে চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিস্থিতিতে মারা যান। অন্যজন নৌবাহিনীর একজন তালিকাভুক্ত সদস্য, যার মৃত্যু সেপ্টেম্বরে আত্মহত্যাজনিত। তার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
আগে কেন বাদ পড়েছিল মৃত্যুর তথ্য?
পেন্টাগনের হতাহত-সংক্রান্ত সরকারি তথ্যভান্ডারটির নাম ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেম (ডিসিএএস)। এই ব্যবস্থায় ইরান যুদ্ধসংশ্লিষ্ট মৃত্যুর হিসাব সংশোধনের পর মোট সংখ্যা ২১ হয়েছে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট গত মাসে জানিয়েছিল, সরকারি তথ্যভান্ডারে যতজনের মৃত্যুর কথা প্রকাশ করা হচ্ছিল, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে বেশি হতে পারে। ছয়জন মার্কিন কর্মকর্তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যমটি এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সে সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ওই প্রতিবেদনকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। পরে পেন্টাগনের সরকারি হিসাব সংশোধন করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯ অক্টোবরের হালনাগাদের আগে ডিসিএএসের তথ্য সর্বশেষ সংশোধন করা হয়েছিল ২৯ সেপ্টেম্বর। ফলে নতুন করে যুক্ত হওয়া মৃত্যুর ঘটনাগুলো নিয়ে সরকারি হিসাবের যথার্থতা ও হালনাগাদের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আহত ৮৬৫ জন, হিসাবেও পরিবর্তন
পেন্টাগনের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট অভিযানে আহত মার্কিন সামরিক সদস্যের সংখ্যা ৮৬৫। তবে যুদ্ধের সময় আহত ও নিহতদের হিসাব কীভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হচ্ছে, তা নিয়েও আগে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছরের শুরুর দিকে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শেষ হয়েছে বলে ঘোষণা দেওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘর্ষ চলতে থাকে। এ অবস্থায় পেন্টাগন পরবর্তী সময়ের কিছু হতাহতের ঘটনা আগের অভিযানের নামের অধীনে না রেখে ‘ওভারসিজ কনটিনজেন্সি অপারেশনস’ নামে পৃথক শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করে।
এতে যুদ্ধের সামগ্রিক মানবিক মূল্য নিরূপণ করা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আইনপ্রণেতাদের জন্যও কঠিন হয়ে পড়ে। শ্রেণিবিন্যাসের এই পরিবর্তন সরকারি হিসাবের পূর্ণতা বোঝার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মোট মৃত্যু ২২, তবে একটি ঘটনা ইরান যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত নয়
পেন্টাগন আরও একজন মার্কিন সেনাসদস্যের মৃত্যুর তথ্য স্বীকার করেছে। সার্জেন্ট ডেভিন এ. সিবেল মে মাসে ইরাকে একটি প্রশিক্ষণ দুর্ঘটনায় মারা যান। তবে তাঁর মৃত্যু ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; সরকারি হিসাবে তাঁকে ইসলামিক স্টেটবিরোধী দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই মৃত্যুসহ ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সদস্যের মোট মৃত্যুসংখ্যা ২২। তবে এ সংখ্যার মধ্যে ইরান যুদ্ধসংশ্লিষ্ট ২১ জনের পাশাপাশি পৃথক প্রশিক্ষণ দুর্ঘটনায় নিহত ওই সেনাসদস্যও রয়েছেন। তাই যুদ্ধসংশ্লিষ্ট মৃত্যু এবং ওই সময়কালে অঞ্চলে ঘটে যাওয়া সব সামরিক মৃত্যুকে একই হিসাব হিসেবে দেখলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
কংগ্রেসের আইনপ্রণেতাদের সমালোচনা
হতাহতের হিসাব সংশোধনের পর প্রতিনিধি পরিষদের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির দুই শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য অ্যাডাম স্মিথ ও ক্রিসি হুলাহান সংশোধনকে স্বাগত জানান। একই সঙ্গে তারা বলেন, এত বড় ধরনের ভুল সংশোধনের জন্য কংগ্রেসকে হস্তক্ষেপ করতে হওয়া সামরিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বিব্রতকর।
অন্যদিকে, পেন্টাগন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সামরিক সদস্যদের হতাহতের তথ্য স্বচ্ছ ও নির্ভুলভাবে প্রকাশে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দপ্তরটি আরও জানিয়েছে, হিসাবের অনিষ্পন্ন ঘটনাগুলো পর্যালোচনার জন্য ‘পেন্ডিং অ্যাডজুডিকেশন’ নামে নতুন একটি শ্রেণি যুক্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে যেসব মৃত্যুর ঘটনা বা শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি, সেগুলো আলাদাভাবে পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে।
যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য নিরূপণে স্বচ্ছতার গুরুত্ব
যুদ্ধে হতাহতের হিসাব কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি সামরিক সদস্যদের নিরাপত্তা, তাঁদের পরিবারের অধিকার, সরকারি জবাবদিহি এবং যুদ্ধের সামগ্রিক প্রভাব মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। মৃত্যুর কারণ, আহতের সংখ্যা এবং বিভিন্ন অভিযানের অধীনে হতাহতের শ্রেণিবিন্যাসে অসংগতি থাকলে যুদ্ধের প্রকৃত মানবিক মূল্য নিরূপণ কঠিন হয়ে পড়ে।
ইরান যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সরকারি হিসাব সংশোধনের ঘটনা তাই শুধু সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয় নয়; বরং সামরিক হতাহতের তথ্য সংগ্রহ, শ্রেণিবিন্যাস ও প্রকাশের পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। পেন্টাগন হিসাব আরও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে নতুন তথ্য যুক্ত হলে সরকারি সংখ্যায় আবারও পরিবর্তন আসতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, টাস্ক অ্যান্ড পারপাস ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


