বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের চেয়ারম্যান পদ ছাড়লেন ওয়ারেন বাফেট

বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের চেয়ারম্যান পদ ছাড়লেন ওয়ারেন বাফেট
ওয়ারেন বাফেট। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। প্রায় ৫৬ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করার পর এবার তিনি চেয়ারম্যান এমেরিটাস হিসেবে পরিচালনা পর্ষদে থাকবেন। তার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন ছেলে হাওয়ার্ড বাফেট।

বিজ্ঞাপন

৯৬ বছর বয়সী ওয়ারেন বাফেট গত বছরের শেষ দিকে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) দায়িত্ব থেকেও সরে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে থাকা হাওয়ার্ড এবার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেবেন।

‘ওরাকল অব ওমাহা’ নামে পরিচিত বাফেট মূল্যভিত্তিক বিনিয়োগের নীতি অনুসরণ করে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়েকে বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য গড়ে বছরে প্রায় ১৯ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা সামগ্রিক বাজারের প্রবৃদ্ধিকে উল্লেখযোগ্যভাবে ছাড়িয়ে গেছে।

শুক্রবার বার্কশায়ারের শেয়ারহোল্ডারদের উদ্দেশে লেখা এক চিঠিতে বাফেট জানান, তার সরে দাঁড়ানোর অন্যতম কারণ হলো নতুন সিইও গ্রেগ অ্যাবেল তার প্রত্যাশার চেয়েও ভালো কাজ করেছেন। পাশাপাশি নিজের বয়সের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। নিজের এক বছর বয়সী প্রপৌত্রের সঙ্গে তুলনা করে বাফেট লেখেন, সে এখন তার চেয়ে কিছুটা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

চিঠিতে বাফেট আরো লেখেন, ‘সময় সব সময়ই জয়ী হয়।’ তবে তার মতে, সময় তার প্রতি উদার ছিল। কারণ বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আশাবাদী।

বাফেটের উত্তরসূরি গ্রেগ অ্যাবেলও তার অবদানের প্রশংসা করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আমেরিকান ব্যবসার ইতিহাসে বার্কশায়ারা ও এর মালিকদের ওপর বাফেটের প্রভাবের কোনো তুলনা নেই।

ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি বড় পরিসরের দাতব্য কর্মকাণ্ডের জন্যও বাফেট পরিচিত। ২০১০ সালে মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এবং তার তৎকালীন স্ত্রী মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটসের সঙ্গে মিলে ‘দ্য গিভিং প্লেজ’ উদ্যোগ শুরু করেন তিনি। বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের জীবদ্দশায় অথবা মৃত্যুর পর অন্তত অর্ধেক সম্পদ দাতব্য কাজে দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করাই ছিল এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

তবে চলতি বছরের শুরুতে বাফেট জানান, তিনি গেটস ফাউন্ডেশনকে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের শেয়ার দেওয়া বন্ধ করেছেন। পাশাপাশি যৌন অপরাধে দণ্ডিত জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে বিল গেটসের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশের পর গেটসের সঙ্গে তার আর যোগাযোগ নেই বলেও জানান বাফেট।

২০২৫ সালে শেয়ারহোল্ডারদের কাছে লেখা এক চিঠিতে বাফেট জানিয়েছিলেন, তার মৃত্যুর সময় তার সম্পদের ৯৯ শতাংশের বেশি বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হবে। সে সময় পর্যন্ত তার দান করা সম্পদের মূল্য ছিল প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার।

অঢেল সম্পদের মালিক হয়েও বাফেটের জীবনযাপন ছিল বেশ সাদাসিধে। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্যের ওমাহায় একই বাড়িতে বসবাস করেছেন। ১৯৫৮ সালে মাত্র ৩১ হাজার ৫০০ ডলারে বাড়িটি কিনেছিলেন তিনি।

২০১২ সালের এপ্রিলে বাফেট জানান, তিনি প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে সেটি রোগটির সবচেয়ে কম ঝুঁকির পর্যায়ে ছিল। একই বছরের সেপ্টেম্বরে তার রেডিয়েশন চিকিৎসা শেষ হয়। এরপর আরো প্রায় ১৩ বছর বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি।

ধনীদের ওপর উচ্চহারে কর আরোপের পক্ষেও দীর্ঘদিন সরব ছিলেন বাফেট। তিনি বলতেন, একজন ধনী ব্যক্তি হিসেবে তার নিজের আয়ের তুলনায় কম শতাংশ কর দিতে হচ্ছে—যেখানে তার সচিব ও মধ্যবিত্ত করদাতাদের অনেক বেশি হারে কর দিতে হচ্ছে—এটি ন্যায্য নয়। তাঁর এই অবস্থান থেকেই ‘বাফেট রুল’ নামে একটি প্রস্তাব আলোচনায় আসে। এতে বছরে ১০ লাখ ডলারের বেশি আয় করা ব্যক্তিদের ওপর অন্তত ৩০ শতাংশ কার্যকর করহার আরোপের কথা বলা হয়েছিল। ২০১২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পুনর্নির্বাচনী প্রচারে বিষয়টি গুরুত্ব পায়, যদিও রিপাবলিকানদের বিরোধিতায় মার্কিন সিনেটে প্রস্তাবটি পাস হয়নি।

১৯৫১ সালে বাবার বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বাফেট, ফক অ্যান্ড কোম্পানিতে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন বাফেট। পরে নিউইয়র্কের গ্রাহাম-নিউম্যান করপোরেশনে নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেন। এরপর ওমাহায় ফিরে ১৯৫৬ সালে নিজের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

১৯৬২ সালে তিনি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের শেয়ার কেনা শুরু করেন। তখন প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের নিউ বেডফোর্ডের একটি সংকটাপন্ন বস্ত্র প্রস্তুতকারক কোম্পানি ছিল। ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণমূলক শেয়ার অধিগ্রহণ করেন বাফেট। চার বছর পর নিজের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বার্কশায়ারকে তাঁর প্রধান বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন।

পরবর্তী সময়ে বাফেটের নেতৃত্বে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে একটি বিশাল ও বহুমুখী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। এর মালিকানায় আসে বিমা প্রতিষ্ঠান জিইআইসিও, মালবাহী রেলপথ বার্লিংটন নর্দার্ন সান্তা ফে, পোশাক প্রস্তুতকারক ফ্রুট অব দ্য লুম এবং আইসক্রিম চেইন ডেইরি কুইনের মতো প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ নেতৃত্বপর্বে বাফেট বার্কশায়ারকে বৈশ্বিক ব্যবসাজগতের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন।

সূত্র: সিএনএন

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন