জলবায়ু পরিবর্তনকে অর্থনীতির মূল আলোচনায় নিয়ে আসা, অনবায়নযোগ্য সম্পদের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখানো এবং কার্বন নিঃসরণের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণে পথ দেখানো—এসব কাজের মধ্য দিয়ে অর্থনীতির জগতে স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছিলেন নোবেলজয়ী উইলিয়াম ডি. নর্ডহাউস। গত ৩০ অক্টোবর ৮৫ বছর বয়সে মারা গেছেন এই মার্কিন অর্থনীতিবিদ।
অর্থনীতি বলতে সাধারণত উৎপাদন, আয়, ব্যয়, বিনিয়োগ কিংবা বাজারের হিসাবকেই বোঝানো হয়। কিন্তু এসব হিসাবের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক কী? একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে গিয়ে পরিবেশের যে ক্ষতি হয়, তার মূল্য কে দেয়? কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো সীমিত সম্পদ ব্যবহারের সিদ্ধান্তে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ কীভাবে বিবেচনায় আসবে? জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির অর্থনৈতিক হিসাবই-বা কীভাবে করা সম্ভব?
অর্থনীতির এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে গবেষণার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন উইলিয়াম ডি. নর্ডহাউস। তার কাজের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, অর্থনীতিকে কেবল বাজার ও মুনাফার হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃতি, প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবকল্যাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক নর্ডহাউস গত ৩০ অক্টোবর মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। বিশ্ববিদ্যালয়টির তথ্য অনুযায়ী, আগ্রাসী ধরনের মস্তিষ্কের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান তিনি। দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তন ও দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনীতির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার জন্য তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
সীমিত সম্পদ, অসীম চাহিদা
নর্ডহাউসের চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল অনবায়নযোগ্য বা নিঃশেষযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদের অর্থনীতি। তেল, গ্যাস, কয়লা ও তামার মতো সম্পদ সীমিত। এগুলো একবার ব্যবহার হয়ে গেলে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না। ফলে এসব সম্পদ কী হারে উত্তোলন ও ব্যবহার করা হবে, বর্তমানের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ভবিষ্যতের জন্য কতটা অবশিষ্ট রাখা হবে—এসব প্রশ্ন অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল। একদিকে আশঙ্কা ছিল, দ্রুত সম্পদ নিঃশেষ হয়ে গেলে শিল্পোন্নত অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে পারে। অন্যদিকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বিকল্প সম্পদ ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে—এমন সম্ভাবনাও সামনে আসছিল।
নর্ডহাউস এই বিতর্ককে সরলভাবে দেখেননি। তার যুক্তি ছিল, সম্পদের মজুত কতটা আছে, শুধু তা জানলেই হবে না; প্রযুক্তির পরিবর্তন, বিকল্প সম্পদের প্রাপ্যতা, বাজারের আচরণ এবং উত্তোলনের খরচও বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থাৎ কোনো সম্পদ সীমিত হলেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অবধারিতভাবে থেমে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। তবে প্রযুক্তি শেষ পর্যন্ত সম্পদের ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
১৯৭৩ সালে প্রকাশিত তার গবেষণাপত্র ‘দ্য অ্যালোকেশন অব এনার্জি রিসোর্সেস’-এ জ্বালানি সম্পদের কার্যকর বণ্টন, বাজারব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সরবরাহের বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হয়। এ গবেষণায় তেল, গ্যাসসহ নিঃশেষযোগ্য সম্পদের সঠিক মূল্য নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের পরিকল্পনার গুরুত্ব উঠে আসে।
জলবায়ু পরিবর্তনকে অর্থনীতির আলোচনায় আনা
নর্ডহাউসের সবচেয়ে বড় অবদান জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনীতি নিয়ে। ১৯৭০-এর দশকে যখন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল, তখনই তিনি বিষয়টির অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে কাজ শুরু করেন। তার উপলব্ধি ছিল, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একদিকে উৎপাদন ও আয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়ে জলবায়ুর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।
এই ক্ষতির বিষয়টি বাজারের প্রচলিত দামে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। একটি কারখানা কয়লা পুড়িয়ে পণ্য উৎপাদন করলে জ্বালানির দাম ও উৎপাদন ব্যয় হিসাব করে। কিন্তু সেই কার্বন নিঃসরণের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষির ক্ষতি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কিংবা মানুষের জীবনযাত্রায় যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে, তা পণ্যের বাজারদরে সরাসরি যুক্ত থাকে না।
অর্থনীতিতে এ ধরনের সমস্যাকে বলা হয় ‘বহিঃপ্রভাব’ বা এক্সটার্নালিটি। নর্ডহাউস দেখিয়েছেন, কার্বন নিঃসরণের ফলে সমাজ ও পরিবেশের ওপর যে ক্ষতি তৈরি হয়, সেটিও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের হিসাবে আনতে হবে। অন্যথায় দূষণকারী প্রতিষ্ঠান বা ভোক্তা প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে কম খরচে জ্বালানি ব্যবহার করতে পারবে, আর ক্ষতির বোঝা বহন করবে পুরো সমাজ।
ডাইস মডেল: অর্থনীতি ও জলবায়ুর যোগসূত্র
এই চিন্তাকে বাস্তব বিশ্লেষণের কাঠামো দিতে নর্ডহাউস তৈরি করেন ডাইস (ডাইনামিক ইন্টিগ্রেটেড ক্লাইমেট-ইকোনমি) মডেল। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত এই মডেল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কার্বন নিঃসরণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং তার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতিকে একই কাঠামোয় বিশ্লেষণ করে।
মডেলটির মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে কতটা কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে, তা বায়ুমণ্ডলে কী প্রভাব ফেলছে এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে অর্থনীতির কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে। একই সঙ্গে নিঃসরণ কমাতে কী পরিমাণ ব্যয় হতে পারে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে নীতিনির্ধারকেরা জলবায়ু সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণের খরচের সঙ্গে ব্যবস্থা না নিলে সম্ভাব্য ক্ষতির তুলনা করতে পারেন।
ডাইস মডেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কার্বন করের ধারণা। নর্ডহাউসের মতে, কার্বন নিঃসরণের কারণে যে সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতি হয়, তার একটি অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সেই মূল্য করের মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও নিঃসরণ কমাতে উৎসাহিত করতে পারে। অর্থাৎ দূষণের খরচ শুধু সমাজের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে যারা নিঃসরণ করছে, তাদের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যেও সেই খরচ যুক্ত করতে হবে।
নোবেল পুরস্কারের বক্তৃতায় নর্ডহাউস জলবায়ু পরিবর্তনকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, এ ধরনের বহিঃপ্রভাব মোকাবিলায় দূষণের ওপর মূল্য আরোপ বা কার্বন কর কার্যকর উপায় হতে পারে।
শুধু মডেল নয়, বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রশ্নও
নর্ডহাউসের চিন্তা কেবল একটি দেশের অর্থনৈতিক নীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক সমস্যা হওয়ায় কোনো একটি দেশের উদ্যোগ দিয়ে তা পুরোপুরি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। একটি দেশ নিঃসরণ কমানোর ব্যয় বহন করলেও অন্য দেশগুলো একই উদ্যোগ না নিলে সেই প্রচেষ্টার সুফল সীমিত হয়ে যেতে পারে।
এখানেই তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দুর্বলতা এবং ‘ফ্রি রাইডিং’ বা অন্যের উদ্যোগের সুফল বিনা খরচে ভোগ করার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করেন। তার মতে, জলবায়ু চুক্তিতে অংশ নেওয়া ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর প্রণোদনা থাকা জরুরি। এ চিন্তা থেকেই তিনি ‘ক্লাইমেট ক্লাব’ ধারণা সামনে আনেন। এর মূল কথা, জলবায়ু সুরক্ষায় একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী দেশগুলো একটি জোট গঠন করবে এবং জোটের বাইরে থাকা দেশগুলোর জন্য কিছু বাণিজ্যিক শর্ত বা সীমাবদ্ধতা রাখা হবে। এর মাধ্যমে আরো বেশি দেশকে নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগে যুক্ত করা সম্ভব হতে পারে বলে তিনি মনে করতেন।
অর্থনীতির বাইরেও বিস্তৃত ছিল তার কাজ
জলবায়ু অর্থনীতির পাশাপাশি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, উৎপাদনশীলতা, ব্যবসায়িক চক্র, নির্বাচনী চক্রের সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক কল্যাণ পরিমাপ নিয়েও কাজ করেছেন নর্ডহাউস। অর্থনীতিবিদ পল স্যামুয়েলসনের সঙ্গে বহুল পরিচিত অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ের সহলেখক হিসেবেও তার অবদান রয়েছে। ১৯৮৫ সালে তিনি বইটির সহলেখক হন এবং স্যামুয়েলসনের মৃত্যুর পরও এর পরবর্তী সংস্করণগুলো হালনাগাদ করেন।
১৯৪১ সালের ৩১ মে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের আলবুকার্কিতে জন্ম নেন নর্ডহাউস। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শেষে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে ১৯৬৭ সালে পিএইচডি করেন। একই বছর ইয়েলে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রভোস্টসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদেও ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
তার চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা
নর্ডহাউসের গবেষণার মূল শিক্ষা হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব করতে গিয়ে প্রকৃতির ক্ষতিকে উপেক্ষা করা যায় না। আজকের উৎপাদন ও ভোগের সুবিধা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কতটা ব্যয় তৈরি করছে, সেটিও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের অংশ হওয়া উচিত। জলবায়ু পরিবর্তনকে কেবল পরিবেশগত সংকট হিসেবে না দেখে অর্থনীতি, নীতি ও বৈশ্বিক সহযোগিতার সমস্যা হিসেবে বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর কাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তার প্রস্তাবিত মডেল ও নীতির সব অনুমান নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি, ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এবং সেগুলো মোকাবিলার ব্যয় কীভাবে হিসাব করা হবে—এসব প্রশ্নে ভিন্নমতও আছে। তবে এই বিতর্কের মধ্যেও নর্ডহাউসের বড় অবদান হলো, তিনি জলবায়ু পরিবর্তনকে অর্থনীতির মূল আলোচনার বাইরে থাকতে দেননি।
তার মৃত্যুতে অর্থনীতির এমন এক গবেষকের বিদায় ঘটল, যিনি দেখিয়েছেন—প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা যায় না। প্রবৃদ্ধি কতটা হলো, তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ; সেই প্রবৃদ্ধির মূল্য হিসেবে পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কতটা ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে, সেই হিসাবও সমান জরুরি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


