১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর থেকে কোরিয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেট এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রভান্ডার থাকা সত্ত্বেও এসব অভিযানের অনেকগুলোতেই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি ওয়াশিংটন। কোথাও যুদ্ধ শেষ হয়েছে অমীমাংসিত অবস্থায়, কোথাও সেনা প্রত্যাহারের পর প্রতিপক্ষ আবার ক্ষমতায় ফিরেছে, আবার কোথাও সামরিক সাফল্যের পরও তৈরি হয়েছে নতুন নিরাপত্তা সংকট।
ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ সেই পুরোনো প্রশ্নকে আবার সামনে এনেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি ও সামরিক চাপের মধ্যেও তেহরানকে ঘিরে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য কতটা অর্জিত হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশ্লেষকদের একাংশের। তাদের মতে, সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকা আর যুদ্ধের চূড়ান্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা এক বিষয় নয়।
কোরিয়া যুদ্ধ থেকে শুরু করে ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাক—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে এমন একাধিক উদাহরণ রয়েছে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল বয়ে আনেনি। বিপুল অর্থ ব্যয়, প্রাণহানি, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এবং নতুন প্রতিপক্ষের উত্থানও অনেক ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোরিয়া যুদ্ধ: তিন বছর লড়েও মেলেনি চূড়ান্ত সমাধান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সীমাবদ্ধতা বোঝার ক্ষেত্রে কোরিয়া যুদ্ধ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ১৯৫০ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে সরাসরি অংশ নেয় মার্কিন বাহিনী। লক্ষ্য ছিল উত্তর কোরিয়ার অগ্রযাত্রা ঠেকানো এবং কোরীয় উপদ্বীপে নিজেদের মিত্রদের অবস্থান সুরক্ষিত রাখা।
প্রায় তিন বছর ধরে চলা সংঘর্ষের পর ১৯৫৩ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে দুই কোরিয়ার মধ্যে স্থায়ী শান্তিচুক্তি হয়নি। উত্তর কোরিয়ার সরকারও ক্ষমতায় টিকে যায়। ফলে দেশটিকে সামরিকভাবে পরাজিত করে পুরো উপদ্বীপে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র।

পরবর্তী দশকগুলোতে উত্তর কোরিয়ার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটি ব্যাপক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়লেও নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নিতে থাকে পিয়ংইয়ং। ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালায় দেশটি। পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাও বাড়িয়েছে তারা।
উত্তর কোরিয়ার এই সামরিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘদিনের সামরিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা যায়নি।
ভিয়েতনাম: দীর্ঘ যুদ্ধের পর সেনা প্রত্যাহার
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে আরেকটি বড় অধ্যায় ভিয়েতনাম যুদ্ধ। ১৯৫৫ সালে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষে প্রথম দিকে সরাসরি যুদ্ধে না নেমে দক্ষিণ ভিয়েতনামকে সামরিক পরামর্শ ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল ওয়াশিংটন। তবে ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন সেনা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে শুরু করে। একই সঙ্গে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালানো হয়।
প্রযুক্তি, বিমানশক্তি ও অস্ত্রভান্ডারে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট বাহিনীকে পরাজিত করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘ আট বছরের বেশি সময় ধরে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালানোর পর ১৯৭৩ সালে মার্কিন বাহিনী দেশটি থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
ভিয়েতনাম যুদ্ধে ৫৮ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা নিহত হন। বিপুল প্রাণহানি ও যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও জনমত ক্রমশ বিরূপ হয়ে ওঠে। যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন ও রাজনৈতিক চাপও মার্কিন সরকারের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
১৯৭৫ সালে সায়গনের পতনের মধ্য দিয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। পরবর্তী সময়ে উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম একীভূত হয়ে কমিউনিস্ট শাসনের অধীনে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক সম্পৃক্ততা শেষ পর্যন্ত দেশটিতে ওয়াশিংটনের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
আফগানিস্তান: সোভিয়েতবিরোধী লড়াইয়ের উল্টো ফল
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার ইতিহাস আরো জটিল। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তানে প্রবেশ করার পর তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়তা দেয় ওয়াশিংটন। পাকিস্তানের সহযোগিতায় আফগান মুজাহিদিনদের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর এই গোপন কর্মসূচি পরিচিত ছিল ‘অপারেশন সাইক্লোন’ নামে।
দীর্ঘ সংঘর্ষের পর ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যায়। তবে দেশটিতে স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সোভিয়েতবিরোধী লড়াইয়ে অংশ নেওয়া বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যকার বিরোধ পরবর্তী সময়ে নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই আফগানিস্তানে আল-কায়েদার উত্থান ঘটে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে বের করার লক্ষ্য নিয়ে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে ওয়াশিংটন। ‘অপারেশন এন্ডুরিং ফ্রিডম’ নামে পরিচালিত এই অভিযানে তালেবান সরকারের পতন ঘটে এবং কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয় মার্কিন বাহিনী ও তাদের মিত্ররা।
তবে প্রাথমিক সামরিক সাফল্য দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। বিন লাদেনকে ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন কমান্ডো অভিযানে হত্যা করা হয়। কিন্তু আফগানিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলতে থাকে।
দুই দশকের যুদ্ধের পর ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহার করে নিলে তালেবান আবারও কাবুলের ক্ষমতা দখল করে। দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতি, বিপুল অর্থ ব্যয় এবং প্রাণহানির পরও আফগানিস্তানে নিজেদের সমর্থিত সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে পারেনি ওয়াশিংটন।
আল-কায়েদাকেও পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে আফগানিস্তান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের কঠিন বাস্তবতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে আছে।
ইরাক: সাদ্দামের পতনের পর নতুন সংকট
১৯৯০ সালে কুয়েত দখল করে ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেনের সরকার। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বহুজাতিক জোট ১৯৯১ সালে সামরিক অভিযান শুরু করে। ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’ নামে পরিচিত ওই অভিযানে ইরাকি বাহিনীকে কুয়েত থেকে হটিয়ে দেওয়া হয় এবং দেশটির স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে ইরাকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত সেখানেই শেষ হয়নি। ২০০৩ সালে আবারও দেশটিতে সামরিক অভিযান চালায় মার্কিন বাহিনী। এবার সাদ্দাম সরকারের পতন ঘটে এবং সাদ্দাম হুসেন গ্রেপ্তার হন। পরে বিচারের মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর ইরাকে স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সহজ হয়নি। সাম্প্রদায়িক সংঘাত, বিদ্রোহ ও নিরাপত্তাহীনতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। পরবর্তী সময়ে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। সংগঠনটি ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়।
একই সময়ে ইরাকের রাজনীতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় ইরানের প্রভাবও বাড়ে। ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করে।
সাদ্দাম সরকারের পতন যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক সামরিক সাফল্য হলেও তার পরবর্তী পরিণতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, যুদ্ধের আগে ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে পরবর্তী বাস্তবতার বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছিল। ফলে ইরাক অভিযানকে শুধু সামরিক বিজয়ের নিরিখে মূল্যায়ন করলে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়।
কসোভো: সামরিক হস্তক্ষেপে রাজনৈতিক সমস্যার অবসান হয়নি
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট ১৯৯৯ সালে যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালায়। এর পর কসোভো থেকে যুগোস্লাভ বাহিনী প্রত্যাহার করা হয় এবং অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক প্রশাসনের অধীনে আসে।
তবে সামরিক হস্তক্ষেপের পরপরই কসোভোর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত হয়নি। ২০০৮ সালে অঞ্চলটি স্বাধীনতা ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশ কসোভোকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও সার্বিয়া, রাশিয়া ও চীনসহ কয়েকটি দেশ এই স্বাধীনতা মেনে নেয়নি।
কসোভোর ঘটনাটি দেখায়, সামরিক পদক্ষেপ কোনো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ বা ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারলেও তার আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান নিশ্চিত করে না।
ইরান যুদ্ধ: পুরোনো অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি?
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এর পর সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায়। ইরানও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে পাল্টা জবাব দেয়। আঞ্চলিক মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং দেশটির পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ঘিরে সৃষ্ট নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলা করা। কিন্তু সামরিক আঘাতের মাধ্যমে এসব লক্ষ্য কতটা অর্জন করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধের ব্যয় নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) ২৩ জুন প্রকাশিত এক হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের ব্যয় আনুমানিক ৪০০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবের পরিসর ছিল ৩৪০০ কোটি থেকে ৪২০০ কোটি ডলার। পরবর্তী সময়ের ব্যয় এতে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা হয়। ফলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে বহু দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায়।
১১ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জবাবকে অপর্যাপ্ত বলে উল্লেখ করেছে ইরান। এতে বোঝা যায়, সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের ফলাফল তাই শুধু কতটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস হয়েছে বা কতটা সামরিক ক্ষতি হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা কঠিন। যুদ্ধ শেষে ইরানের সামরিক সক্ষমতা কতটা কমবে, আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আসবে এবং হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।
কেন সামরিক শক্তি থাকলেই যুদ্ধ জেতা যায় না?
যুক্তরাষ্ট্রের অতীত যুদ্ধগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি সাধারণ প্রবণতা চোখে পড়ে। প্রথমত, সামরিক অভিযানের লক্ষ্য নির্ধারণে অস্পষ্টতা থাকলে যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনের পরও রাজনৈতিক সমাধান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, কোনো দেশের সরকার বা সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা তুলনামূলক সহজ হলেও সেখানে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা অনেক বেশি জটিল।
তৃতীয়ত, প্রতিপক্ষের সামরিক শক্তি কমিয়ে দিলেও তাদের রাজনৈতিক আদর্শ, জাতীয়তাবাদ বা প্রতিরোধের মনোভাব নির্মূল করা যায় না। ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতায় এই বিষয়টি স্পষ্ট। একইভাবে ইরাকে সরকার পরিবর্তনের পরও নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান দেখিয়েছে, ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
এ ছাড়া যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয়, সেনাদের প্রাণহানি এবং দেশের অভ্যন্তরে জনসমর্থন কমে যাওয়াও সামরিক অভিযানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য না থাকলে শক্তিশালী রাষ্ট্রের পক্ষেও কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কাঠামোতেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে। ১৯৮৬ সালের গোল্ডওয়াটার-নিকোলস আইন সামরিক বাহিনীর কমান্ড কাঠামো ও যৌথ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনে। তবে সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কৌশলগত সমন্বয়, বেসামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক এবং যুদ্ধের রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণের গুরুত্ব থেকেই যায়।
বিজয়ের সংজ্ঞা নিয়েই প্রশ্ন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র কোনো যুদ্ধেই জয় পায়নি—এমন দাবি অবশ্যই অতিরঞ্জিত। ১৯৯১ সালে কুয়েতকে ইরাকি দখলমুক্ত করার অভিযানসহ বিভিন্ন সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করেছে। তবে কোরিয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো দীর্ঘ সংঘাতে সামরিক সাফল্য এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ফলাফলের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের আলোচনায় তাই মূল প্রশ্নটি হলো, একটি যুদ্ধে জয় বলতে কী বোঝায়। প্রতিপক্ষের সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা, সরকার পরিবর্তন করা কিংবা কোনো অঞ্চল থেকে শত্রুপক্ষকে সরিয়ে দেওয়া এক ধরনের সাফল্য। কিন্তু সেই সাফল্যকে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানে রূপ দেওয়া ভিন্ন বিষয়।
ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের সামনে একই চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সামরিক শক্তি ব্যবহার করে তেহরানের সক্ষমতা দুর্বল করা সম্ভব হলেও এর ফলে দেশটির নীতিতে স্থায়ী পরিবর্তন আসবে কি না, আঞ্চলিক সংঘাত কমবে কি না এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত হবে কি না—সেসবই শেষ পর্যন্ত অভিযানের কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অতীত অভিজ্ঞতা অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে, যুদ্ধ শুরু করার সক্ষমতা আর নিজের শর্তে যুদ্ধ শেষ করার সক্ষমতা এক নয়। ইরান সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতিও নির্ভর করবে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনীতি, রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা কতটা কার্যকরভাবে সামাল দেওয়া যায়, তার ওপর।
সূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


