যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে সিনেট নির্বাচন হতে আর মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি। এর মধ্যেই দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিশানায় রয়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী আবদুল এল-সাইদ। তবে রাজনৈতিক আক্রমণের পাশাপাশি তাকে নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে ট্রাম্পের বারবার তার নাম ভুলভাবে উল্লেখ করাকে কেন্দ্র করে। সমালোচকদের মতে, এটি নিছক ভুল নয়; বরং মুসলিম পরিচয় সামনে এনে একজন প্রার্থীকে ‘ভিন্ন’ হিসেবে তুলে ধরার রাজনৈতিক কৌশল।
‘দ্য প্রেসিডেন্ট হু ক্যান্ট সে হিজ নেম’ শীর্ষক নিবন্ধে মিশিগানের সিনেট নির্বাচন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ঘিরে বিতর্ক তুলে ধরা হয়েছে। বৃহস্পতিবারের বিতর্কের পর ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স সিনেট বিতর্কে ‘মোহাম্মদ এল-সাইদকে’ সম্পূর্ণভাবে ধরাশায়ী করেছেন। অথচ রজার্স ওই বিতর্কেই অংশ নেননি।
ট্রাম্প আরো অভিযোগ করেন, ‘মোহাম্মদ একজন জিহাদি উন্মাদ, যিনি আমাদের দেশ ও ডেট্রয়েটের কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে ঘৃণা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা দেখতে চান।’ কিন্তু ডেমোক্রেটিক প্রার্থীর নাম আবদুল এল-সাইদ। ‘মোহাম্মদ’ তার মধ্য নাম, যা তিনি মিসরীয় অভিবাসী বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন। সাধারণত তিনি এই নাম ব্যবহার করেন না।
ট্রাম্পের বারবার ওই নাম ব্যবহারকে নিছক ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং এর মাধ্যমে এল-সাইদকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত জাতীয় পরিচয়ের বাইরে থাকা একজন ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এল-সাইদ নিজেও বিষয়টি নিয়ে বিস্মিত নন। তিনি বলেছেন, ট্রাম্প জানেন তার নাম আবদুল। কারণ, প্রেসিডেন্ট প্রতিদিনই তার নাম উল্লেখ করেন।
ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট নেতা চাক শুমার ট্রাম্পের আক্রমণের সমালোচনা করে বলেছেন, এগুলো বিদ্বেষমূলক বক্তব্য। তার ভাষ্য, ট্রাম্প যতই এমন আক্রমণ করুন না কেন, এল-সাইদ মিশিগানের পরবর্তী সিনেটর হওয়ার পথে রয়েছেন।
মিশিগানে কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের প্রতিনিধি দাউদ ওয়ালিদও বিষয়টিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, এল-সাইদের পুরো নাম বারবার উচ্চারণ করে তাকে এমন একজন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাভাবিক’ পরিচয়ের সঙ্গে খাপ খান না।
একটি সিনেট আসন ঘিরে এত উদ্বেগ কেন
মিশিগানের সিনেট আসনটি ডেমোক্র্যাট গ্যারি পিটার্সের অবসরের কারণে শূন্য হয়েছে। বর্তমানে মার্কিন সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি, আর ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি আসন বাড়াতে হবে।
মিশিগানের আসনটি ইতোমধ্যে ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকায় সেখানে জয়ী হলেও সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণ সরাসরি বদলাবে না। তবে রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্স জয়ী হলে দলটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরো বাড়বে এবং অন্য রাজ্যগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়বে। এ কারণেই মিশিগানের নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্পের এত মনোযোগ। বিশেষ করে অঙ্গরাজ্যটিতে তিনি দুইবার জয়ী হওয়ায় রিপাবলিকানদের কাছে আসনটি পুনরুদ্ধারের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
জরিপে এগিয়ে এল-সাইদ
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের ৬ তারিখ পর্যন্ত রিয়েলক্লিয়ারপলিটিকসের জরিপের গড় হিসাবে এল-সাইদ ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে ছিলেন। রজার্সের সমর্থন ছিল ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে মারিস্ট ও সাফোক বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপেও এল-সাইদ সাত পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। এমনকি ফক্স নিউজের সর্বশেষ জরিপেও সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে তিনি এক পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। আগস্টে চিত্রটি ছিল উল্টো; তখন রজার্স চার পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন।
পলিমার্কেটের বাজির বাজারেও এল-সাইদের জয়ের সম্ভাবনা ৬৯ শতাংশ দেখানো হয়েছিল। তবে এসব জরিপ ও বাজির বাজারের হিসাব নির্বাচনের ফল নিশ্চিত করে না। এল-সাইদের পক্ষে জনমত জরিপে অগ্রগতি দেখা গেলেও নির্বাচনী প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে দুই দল। অক্টোবরের ১০ তারিখ পর্যন্ত রিপাবলিকানপন্থী পক্ষের ব্যয় ছিল ৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ডেমোক্র্যাটদের ব্যয় ছিল ৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
প্রচারের বড় অংশজুড়ে এল-সাইদকে ‘বিপজ্জনকভাবে উগ্র’ ও ‘অতিরিক্ত চরমপন্থী’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তাকে অনলাইন সম্প্রচারক হাসান পাইকারের সঙ্গে সম্পর্কিত করার চেষ্টাও চলছে। পাইকার একসময় বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ৯/১১ হামলার জন্য ‘যোগ্য ছিল’। সেই বক্তব্যের সঙ্গে এল-সাইদের নাম জুড়ে দিয়ে ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের অনুপস্থিতি নিয়ে কটাক্ষ
নির্বাচনের এত কাছে এসেও ট্রাম্প মিশিগানে গিয়ে রজার্সের পক্ষে প্রচার চালাননি। বিষয়টি নিয়ে এল-সাইদও তাকে কটাক্ষ করেছেন। চলতি মাসে পোর্ট হুরনের এক সমাবেশে কালো ভি-নেক শার্ট পরে হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে তিনি বলেন, ‘ডোনাল্ড, তুমি যদি দেখে থাকো, তাহলে কাপুরুষের মতো আচরণ করো না।’
এল-সাইদ রজার্সকে কাপুরুষ এবং ট্রাম্পকে ভীত বলে আক্রমণ করেছেন। তবে লেখকের মতে, ট্রাম্পের অনুপস্থিতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার আক্রমণ নির্বাচনী প্রচারের বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্বেগেরই প্রতিফলন।
জাতীয় রাজনীতিতেও চাপে রিপাবলিকানরা
কংগ্রেসের সম্ভাব্য নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জাতীয় পর্যায়ের ভোটার সমর্থনে এগিয়ে রয়েছেন। নেট সিলভারের চলমান গড় হিসাবে প্রতিনিধি পরিষদের সাধারণ ব্যালটে ডেমোক্র্যাটদের ব্যবধান প্রায় নয় পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা চলতি নির্বাচনী চক্রে তাদের সর্বোচ্চ ব্যবধান। বিভিন্ন পূর্বাভাসে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা ৮২ শতাংশ দেখানো হয়েছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার সম্ভাবনাও তাদের পক্ষে অর্ধেকের বেশি।
দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণই হারালে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ দুই বছর আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ, তখন কংগ্রেসের তদন্ত ও তলব করার ক্ষমতা ব্যবহার করে তাঁর প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়াতে পারবেন বিরোধীরা। এই রাজনৈতিক হিসাবও মিশিগানের একটি সিনেট আসনকে জাতীয় গুরুত্ব দিয়েছে।
এল-সাইদের জন্যও ঝুঁকি রয়েছে
তবে এল-সাইদের নির্বাচনী প্রচার পুরোপুরি বাধাহীন নয়। ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার ঘটনায় তার অবস্থান নিয়ে একটি ফাঁস হওয়া অডিওতে বিতর্ক তৈরি হয়। সেখানে তাকে ডিয়ারবর্নের শোকাহত ভোটারদের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে স্পষ্ট অবস্থান এড়িয়ে যেতে শোনা গেছে। রিপাবলিকানরা বিষয়টি প্রচারে ব্যবহার করছে।
মিশিগানের কয়েকজন ডেমোক্র্যাটও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দলের ভেতরে সংশয়ী ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে এল-সাইদের অনীহা নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সিনেটর এলিসা স্লটকিন, যিনি দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে নিরপেক্ষ ছিলেন, পরে এল-সায়েদের পক্ষে দলকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছেন।
এল-সাইদের সমর্থকেরাও স্বীকার করেন, তার নির্বাচনী কৌশল মূলত নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করার ওপর নির্ভর করছে; প্রচলিত মধ্যপন্থী ভোটারদের কাছে পৌঁছানোই তার একমাত্র লক্ষ্য নয়। নির্বাচনের আগে তিন সপ্তাহ দীর্ঘ সময়। জরিপে সামান্য ব্যবধান যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে। মিশিগানে ১৯৯৪ সালের পর কোনো সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকানরা জয়ী হননি। ২০২৪ সালে রজার্স ডেমোক্র্যাট এলিসা স্লটকিনের কাছে এক শতাংশেরও কম ব্যবধানে হেরেছিলেন।
প্রতিপক্ষের নাম বারবার ভুলভাবে উচ্চারণ করে তাকে আক্রমণ করা কোনো প্রেসিডেন্টের শক্তিমত্তার পরিচয় নয়। বরং মিশিগানের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের উদ্বেগ এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করছে এই ঘটনা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

