বর্তমানে চাকরির বাজারে তরুণদের প্রবল প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। একদিকে বিসিএস ও অন্যান্য সরকারি চাকরিতে তরুণদের আগ্রহ বেড়েছে, অন্যদিকে বিভিন্ন চাকরিতে সুযোগ না পেয়ে তারা উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। এ অবস্থায় ক্যারিয়ার গঠনে তরুণরা কীভাবে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে, আগামী পৃথিবীতে চাকরির বাজারে কোন খাতে সুযোগ বাড়তে পারে—ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন এম এ আহাদ শাহীন
প্রশ্ন : আপনি তো শিক্ষা এবং কর্মসংস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি করছেন। বেকারত্বের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার কোনো ঘাটতি লক্ষ করছেন?
উত্তর : বেকারত্বের সঙ্গে শুধু একাডেমিক শিক্ষার সম্পর্ক নেই, আরো অনেক কিছু এর সঙ্গে জড়িত। যেমন, চাকরিপ্রার্থীর দক্ষতা, সরকারের পরিকল্পনা, বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি ইত্যাদি। তবে এটাও ঠিক, আমরা এখনো দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ করতে পারিনি। একই সঙ্গে বাজারের চাহিদার কথা বলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় বিভাগ খোলা হচ্ছে।
প্রশ্ন : বর্তমান চাকরির বাজারে ক্যারিয়ার গড়তে তরুণদের সবচেয়ে বেশি কোন দক্ষতাগুলো প্রয়োজন?
উত্তর : চাকরির পরীক্ষায় এখন শুধু জ্ঞানমূলক প্রশ্ন করা হয় না, প্রার্থীর বিশ্লেষণী দক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন, নেতৃত্ব দেওয়ার গুণ ইত্যাদিও যাচাই করা হয়। সুতরাং নিজেকে তৈরি করার জন্য আইকিউ-জাতীয় প্রশ্নের অনুশীলন করতে হবে এবং বাস্তব জীবনেই সমস্যা সমাধান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপায়গুলো প্রয়োগ করতে হবে। লেখা ও সম্পাদনার জন্য এমএস ওয়ার্ড এবং হিসাব ও বিশ্লেষণের জন্য এমএস এক্সেলের ব্যবহার শিখতে হবে। এছাড়া প্রমিত বাংলা উচ্চারণে পারদর্শী হতে হবে, ইংরেজিতে স্পোকেন দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং গবেষণার পদ্ধতি ও ধরন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে।
প্রশ্ন : একজন শিক্ষার্থী কীভাবে নিজের ক্যারিয়ার বা লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে?
উত্তর : উচ্চশিক্ষার শুরুতেই একজন তরুণকে তার লক্ষ্য ঠিক করতে বলব আমি। যেকোনো পেশায় নিজের সুযোগ ও সম্ভাবনা বাড়াতে চাইলে একাডেমিক রেজাল্টের দিকে সবার আগে মনোযোগ দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাস করার আগে-পরে কোন কোন কাজে বিশেষ সুযোগ রয়েছে, সেটা শিক্ষক বা সিনিয়র শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে। পাশাপাশি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কাজে নিজেকে যুক্ত করতে বলব। এগুলো চাকরির বাজারে প্রার্থীকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে শেখায় এবং আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
প্রশ্ন : একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি কোন ধরনের স্কিল ডেভেলপমেন্ট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর : সবার আগে একাডেমিক রেজাল্ট ভালো করা জরুরি। পাশাপাশি কম্পিউটার, ভাষা ও অনুবাদ, গবেষণা ও প্রজেক্ট ওয়ার্ক ইত্যাদি-বিষয়ক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা তরুণদের এগিয়ে রাখতে পারে। সম্ভাব্য পেশার দিকে নজর রেখে প্রয়োজনে গবেষণাকাজে সহকারী কিংবা প্রজেক্ট ওয়ার্কে সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করতে বলব। তাছাড়া সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজে অংশগ্রহণ তাদের মধ্যে বাস্তব নেতৃত্বগুণ তৈরি করবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াবে।
প্রশ্ন : কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও AI-এর পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করা যায়?
উত্তর : আগামীর পৃথিবী হতে যাচ্ছে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর। কিন্তু এখনো পর্যন্ত মানুষের মৌলিক জ্ঞান ও সৃজনক্ষমতার গুরুত্ব শেষ হয়ে যায়নি। অবশ্যই তরুণদের প্রযুক্তি ও এআই ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে বলব। তবে কোনো কিছুই অনুকরণ বা কপি করে তুলে দিলে হবে না। যেকোনো কিছু আগে নিজে করতে হবে, তারপর এআইয়ের সহায়তা নিয়ে উন্নত করতে হবে। এরপর চূড়ান্তভাবে আবার নিজে দেখতে হবে।
প্রশ্ন : বর্তমানে তরুণদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী?
উত্তর : বর্তমানে তরুণদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাদের অভিজ্ঞতার অভাব। অথচ অধিকাংশ বেসরকারি চাকরিতে অভিজ্ঞতাই সবার আগে দেখা হয়। অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি করার জন্য ইউনিভার্সিটি-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবরেশন জরুরি। যতদিন না সেটা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচ্ছে, তরুণদের উচিত হবে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সহায়তাকারী হিসেবে যুক্ত থেকে কিংবা ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা বাড়ানোর চেষ্টা করা।
প্রশ্ন : ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কী ধরনের সমস্যা দেখা যায়?
উত্তর : তরুণরা এখনো পর্যন্ত নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে মনোযোগী নয়; বরং প্রথাগত চাকরির ধারা অনুযায়ী জ্ঞানমূলক তথ্য মুখস্থ করে মূল্যবান সময় পার করছে। তাছাড়া চাকরির ক্ষেত্রে তরুণদের বিভিন্ন সময়ের দাবি-দাওয়া দেখে মনে হয়, তারা মনে করে চাকরির আবেদনের বয়স বাড়ালেই বুঝি চাকরির সম্ভাবনা বাড়বে! বাস্তবে, এভাবে তাদের আরো বেশি প্রতিযোগীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে। এভাবে তাদের একটা বিশাল অংশ সেই বয়সও হারিয়ে ফেলবে এবং পরবর্তী সময়ে সব ধরনের কাজেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।
প্রশ্ন : সরকারি ও বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?
উত্তর : বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের অনিয়ম দূর করতে হবে। নিয়োগপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ করার জন্য যেসব প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হবে, তাদের একাডেমিক রেজাল্ট ও অন্যান্য যোগ্যতাসহ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা উচিত। তরুণদের চাকরির আবেদনে কোনোভাবেই ২০০ টাকার বেশি ফি নেওয়া যাবে না; নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনে ভর্তুকি দেবে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরি করতে বিভিন্ন পেশাজীবী, নিয়োগকর্তা, উদ্যোক্তা ও গবেষকদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন নতুন উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রশ্ন : উদ্যোক্তা হওয়া কি তরুণদের বেকারত্ব কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে?
উত্তর : অবশ্যই হতে পারে। প্রচুরসংখ্যক তরুণ নিজে উদ্যোক্তা হতে চায়, কিন্তু তাদের হাতে কোনো টাকা নেই। ফলে ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত করে তাদের ক্যারিয়ার গঠনের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।
প্রশ্ন : আগামী ৫-১০ বছরে বাংলাদেশের চাকরির বাজারে কোন খাতগুলো সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে?
উত্তর : প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরো বাড়বে। এছাড়া মেডিকেল, কৃষি, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি বিশেষায়িত ক্ষেত্রগুলোতে তরুণদের চাহিদা বাড়বে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

