যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলকে হারিয়ে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ—সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারা। সিনেটের ৩৫টি নির্বাচনি আসনের মধ্যে অন্তত ২০টিতে জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদে দলটির আসন বেড়েছে অন্তত ৩০টি। দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রণ ভেঙে কংগ্রেসের দুই কক্ষের কর্তৃত্ব ফিরে পাওয়াকে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৪ নভেম্বরের প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, সিনেটের ৩৫টি আসনের মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা জয় পেয়েছে ২০টিতে এবং রিপাবলিকানরা ১৩টিতে। বাকি দুটি আসনের ফল তখনো ঘোষণা হয়নি। অর্থাৎ সব আসনের ফল নিশ্চিত না হলেও ঘোষিত ফলের ভিত্তিতে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের হার দাঁড়িয়েছে ৬০ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের জয়ের হার ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
নির্বাচনের আগে এই ৩৫টি আসনের মধ্যে ২২টি ছিল রিপাবলিকানদের দখলে এবং ১৩টি ডেমোক্র্যাটদের। এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সাতটি আসন ছিনিয়ে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। বিপরীতে নিজেদের দখলে থাকা ১৩টি আসনই ধরে রাখতে পেরেছে দলটি। ফলে ঘোষিত ফল অনুযায়ী, রিপাবলিকানদের ২২টি আসনের মধ্যে ১৫টি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বাকি সাতটির মালিকানা বদলে গেছে। রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসনের প্রায় ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ হারিয়েছে দলটি। মোট ৩৫টি আসনের ২০ শতাংশের দলীয় নিয়ন্ত্রণ বদলেছে।
ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্য উল্লেখযোগ্য হলেও সিনেটের আসন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এটি ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড নয়। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ১৯৫৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নির্বাচনি উপাত্ত অনুযায়ী, ১৯৫৮ ও ১৯৭৮ সালের নির্বাচনে সিনেটের ১৩টি করে আসনের দলীয় নিয়ন্ত্রণ বদলেছিল। ১৯৮৬ সালে ১০টি, ২০১৪ সালে ৯টি এবং ১৯৬২ ও ১৯৯৪ সালে ৮টি করে আসনের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন হয়েছিল। সেই তুলনায় ২০২৬ সালের সাতটি আসনের পরিবর্তন বড় রাজনৈতিক ঘটনা হলেও অতীতের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়নি। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের তুলনায় এটি বেশ বড় পরিবর্তন।
অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদ বা নিম্নকক্ষের সব ৪৩৫টি আসনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৫ নভেম্বর বাংলাদেশ সময় সকাল পর্যন্ত প্রকাশিত সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ফল ঘোষণা হওয়া ৩৮৭টি আসনের মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছে ২৪০টি এবং রিপাবলিকানরা ১৪৭টি। তখনও ৪৮টি আসনের ফল ঘোষণা বাকি ছিল। অর্থাৎ ফল ঘোষিত আসনগুলোর প্রায় ৬২ শতাংশ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। দলটি আগের নির্বাচনের তুলনায় নিট ৩০টি আসন বাড়িয়েছে এবং রিপাবলিকানদের কাছ থেকে ৩০টি আসন নিজেদের দখলে নিয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ২১৮টি আসন; ফলে ফল ঘোষিত আসনগুলোর হিসাবেই সেই সীমা ছাড়িয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে ডেমোক্র্যাটরা। এর মধ্য দিয়ে ২০২৩ সাল থেকে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা নিম্নকক্ষের কর্তৃত্ব ফিরে পেয়েছে দলটি। তবে ৪৮টি আসনের ফল তখনো বাকি থাকায় চূড়ান্ত আসনসংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের এই জয়ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। তবে আসন বৃদ্ধির হিসাবে এটি রেকর্ড নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ইতিহাস ও আর্কাইভ বিভাগের তথ্য এবং ঐতিহাসিক নির্বাচনী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রায় ৬৩ থেকে ৬৪টি আসন বাড়িয়েছিল। ১৯৯৪ সালে দলটি ৫৪টি আসন বাড়িয়ে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নেয়। অন্যদিকে ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ৪১টি আসন বাড়িয়ে নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছিল। ২০০৬ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ডেমোক্র্যাটদের আসন বেড়েছিল ৩১টি। সে হিসাবে ২০২৬ সালের অন্তত ৩০ আসনের বৃদ্ধি ২০০৬ সালের ফলের কাছাকাছি হলেও ২০১৮, ১৯৯৪ কিংবা ২০১০ সালের বড় আসন পরিবর্তনের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়নি।
এখানে আসন পরিবর্তনের দুটি হিসাব আলাদা করে দেখা জরুরি। কোনো দল প্রতিপক্ষের কাছ থেকে যতটি আসন ছিনিয়ে নেয়, আর আগের নির্বাচনের তুলনায় দলটির মোট আসন যতটি বাড়ে—দুটি এক বিষয় নয়। কোনো দল প্রতিপক্ষের কাছ থেকে ৩১টি আসন জিতলেও নিজেদের একটি আসন হারালে নিট বৃদ্ধি হবে ৩০। প্রতিনিধি পরিষদের এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের আসন বৃদ্ধির হিসাব বোঝার ক্ষেত্রেও এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পেছনে ভোটারদের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ, ইরান যুদ্ধের প্রভাব, শুল্কনীতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে ডেমোক্র্যাটরা মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের ব্যয়ভার কমানো এবং প্রশাসনের জবাবদিহির বিষয়কে গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রচার চালালেও ভোটারদের একটি বড় অংশ অর্থনৈতিক ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
রিপাবলিকানদের জন্য এবারের ফলের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে তাদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে। সিনেটে টেক্সাসে ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জয় পেয়েছেন। কানসাসেও প্রায় ৯০ বছর পর একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া আইওয়া, ওহাইও, মেইন, নর্থ ক্যারোলাইনা ও সাউথ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকানদের কাছ থেকে আসন ছিনিয়ে নিয়েছে দলটি। বিশেষ করে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প যে সাউথ ক্যারোলাইনায় প্রায় ১৮ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন, সেখানেও তার সমর্থিত সিনেট প্রার্থীকে হারিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
সিনেটে সাতটি আসন নিজেদের দখলে নেওয়া এবং প্রতিনিধি পরিষদে অন্তত ৩০টি আসন বাড়ানোর মধ্য দিয়ে ডেমোক্র্যাটরা ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছে। তবে সিনেট কিংবা প্রতিনিধি পরিষদ—কোনো কক্ষেই আসন পরিবর্তনের সংখ্যা ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ রেকর্ড নয়। বরং এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝপথে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ বিরোধী দলের হাতে চলে যাওয়া। এতে আগামী দুই বছর ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, বাজেট ও গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত উদ্যোগ বাস্তবায়নে বড় বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সূ্ত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স, ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন ও যুক্তরাষ্ট্রের হাউস হিস্ট্রি বিভাগ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


