মোবাইলে হঠাৎ একটি বার্তা—‘আপনার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে’, ‘বিশেষ অফারটি পেতে এখনই ক্লিক করুন’ কিংবা ‘সাবস্ক্রিপশন নবায়ন করুন’। সঙ্গে দেওয়া হয় একটি লিংক। লিংকে ঢুকতেই চাওয়া হয় মোবাইল নম্বর, পাসওয়ার্ড কিংবা ব্যক্তিগত কোনো তথ্য। কখনো আবার বলা হয়, একটি অ্যাপ ইনস্টল করতে হবে। ব্যবহারকারী না বুঝে প্রয়োজনীয় অনুমতি দিয়ে ফেললেই শুরু হতে পারে প্রতারণা।
কখনো ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হয়, কখনো ক্ষতিকর অ্যাপের মাধ্যমে ডিভাইসের তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আবার পরিচিত ব্যক্তি, ব্যাংক কর্মকর্তা কিংবা সরকারি কর্মকর্তার পরিচয় ব্যবহার করেও অর্থ বা তথ্য চাওয়া হয়। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনলাইন প্রতারণার ধরনও বদলেছে। প্রতারকেরা এখন একাধিক কৌশল একসঙ্গে ব্যবহার করছে।
চট্টগ্রামের খুলশীতে গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশির বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগও এমন ডিজিটাল প্রতারণাকে ঘিরে। নগর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্রের সদস্য। তবে তারা কী ধরনের প্রতারণা করতেন, তাদের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন এবং প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ কোথায় যেত—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
তদন্তে এরই মধ্যে নতুন একটি বিষয় সামনে এসেছে। ৬৩ বিদেশি একা ছিলেন না। তাদের দেশীয় ও বিদেশি সহযোগী ছিল। পুলিশের দাবি, দেশীয় সহযোগীদের কয়েকজনকে ইতিমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।
খুলশীর বাড়িতে অভিযান
১০ সেপ্টেম্বর বিকেলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানাধীন কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের একটি আটতলা বাড়িতে অভিযান চালায় সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও খুলশী থানা-পুলিশ। অভিযানে চীন, পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের ৬৩ নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে ২০ জন নারী।
মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা প্রায় দেড় মাস আগে ওই বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন। বাড়িটি একজন দুবাইপ্রবাসীর। ওই বাড়ি ব্যবহার করেই তারা প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
তবে এটি তাদের একমাত্র ঠিকানা ছিল না বলে জানিয়েছে পুলিশ। এর আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় অবস্থান করে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণা এবং অন্যান্য অনলাইন অপরাধ চালিয়ে আসছিলেন তারা।
এ কারণে তদন্তে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—দেশের আর কোন কোন এলাকায় তাদের আস্তানা ছিল, এসব বাসা কারা ভাড়া দিয়েছিল, ভাড়ার চুক্তি কার নামে হয়েছিল এবং সেসব জায়গাতেও একই ধরনের কার্যক্রম চলত কি না।
পেছনে দেশীয় সহযোগী
পুলিশের ভাষ্য, বাংলাদেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে পরিচালনার জন্য ওই বিদেশিদের দেশীয় ও বিদেশি সহযোগী ছিল। কয়েকজন অজ্ঞাতনামা সহযোগী এখনো পলাতক। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পেরেছে, এসব সহযোগীর কয়েকজন চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. শামীম হোসেন বলেন, ৬৩ বিদেশি একটি আবাসিক এলাকায় এসে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছেন। তাদের জন্য বাসা ভাড়া, ইন্টারনেট সংযোগ, যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, খাবার ও যাতায়াতসহ নানা ধরনের লজিস্টিক সহায়তার প্রয়োজন হয়েছে। এসব সহায়তার সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে তদন্তের স্বার্থে এখন পর্যন্ত এসব সহযোগীর কারও নাম প্রকাশ করেনি পুলিশ।
উদ্ধার ১৯১ ডিভাইস
অভিযানে বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার হওয়ায় তদন্তের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা হয়েছে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, একটি অ্যাপল ট্যাব, একটি সিপিইউ, একটি মনিটর, কিবোর্ড, মাউস, প্রিন্টার, পাঁচটি পেনড্রাইভ ও চারটি সিমকার্ড।
এ ছাড়া তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একটি কম্বোডিয়ান কর্মসংস্থান কার্ডও পাওয়া গেছে। শুধু মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপের সংখ্যাই ১৯১টি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ডিভাইসের ভেতরে থাকা তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। চট্টগ্রামের প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বাংলাদেশ সাইবার এক্সপ্রেসের প্রধান নির্বাহী রিদুয়ান হৃদয় বলেন, কোন মোবাইল কে ব্যবহার করতেন, কোন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা হয়েছে, কোন অ্যাকাউন্টে যোগাযোগ করা হয়েছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এবং অর্থ লেনদেনের কোনো রেকর্ড রয়েছে কি না—ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে এসব তথ্য বের করা সম্ভব।
তার মতে, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে পলাতক সহযোগীদের পরিচয়ও পাওয়া যেতে পারে।
যেভাবে চলে অনলাইন প্রতারণা
পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনলাইন প্রতারণার ক্ষেত্রে প্রথমে ব্যবহারকারীর মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করা হয়। এরপর তাকে এমন কোনো লিংক, ওয়েবসাইট, অ্যাপ বা যোগাযোগের মাধ্যমে নেওয়া হয়, যেখানে তথ্য বা অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
যেমন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হলো—‘মাত্র ১০ হাজার টাকা বিনিয়োগে প্রতিদিন আয়’। ব্যবহারকারী প্রথমে অল্প টাকা জমা দিলেন। অ্যাপে তার হিসাবে লাভও দেখানো হলো। কখনো সামান্য টাকা ফেরত দিয়ে তার বিশ্বাস আরও বাড়ানো হয়। এরপর বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়। একপর্যায়ে দেখা যায়, অ্যাকাউন্টে যে লাভ দেখানো হচ্ছিল, তা আসলে শুধু পর্দায় দেখানো কিছু সংখ্যা।
চাকরির বিজ্ঞাপনের নামেও একই ধরনের প্রতারণা হয়। ‘বাড়িতে বসে আয়’, ‘অনলাইনে কাজ’ কিংবা ‘বিদেশি প্রতিষ্ঠানে চাকরি’—এমন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আবেদনকারীর কাছ থেকে নিবন্ধন ফি বা ব্যক্তিগত তথ্য নেওয়া হতে পারে।
প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করেও প্রতারণার ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের পর ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা হয়। পরে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে ভুয়া অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে টাকা জমা দিতে বলা হয়।
আবার কখনো ব্যাংক কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা কিংবা পরিচিত ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে বলা হয়—‘আপনার অ্যাকাউন্টে সমস্যা হয়েছে’, ‘আপনার নামে মামলা হয়েছে’ কিংবা ‘এখনই টাকা না দিলে বিপদ হবে’। ভয় ও তাড়াহুড়ার মধ্যে ফেলে তখন অর্থ বা ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
অনলাইন জুয়ারও তথ্য পেয়েছে পুলিশ
অনলাইন জুয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। যেমন, বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট ম্যাচ চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রথম ওভারে কত রান হবে, কোনো ব্যাটার কত রান করবেন কিংবা কোনো বোলার কত রান দেবেন—এসব বিষয়ে বাজি ধরার সুযোগ দেওয়া হয়।
ব্যবহারকারী একটি অ্যাপে প্রবেশ করে অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা জমা দেন। কিন্তু অ্যাপটি যদি অননুমোদিত হয়, সেখানে দেওয়া ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা নিয়ে ঝুঁকি থেকেই যায়।
খুলশীতে গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশি এমন অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন—এমন প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ।
প্রতারণার টাকা কোথায় যেত?
প্রতারণার মূল উদ্দেশ্য যদি অর্থ আত্মসাৎ হয়, তাহলে তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—সেই টাকা কোথায় যেত?
মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সংঘবদ্ধভাবে আর্থিক প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং আইনানুগ কর্তৃত্ববহির্ভূত ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে অপরাধ করছিলেন।
তবে প্রতারণার অর্থের গতিপথ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, কার্ড কিংবা অন্য কোনো ডিজিটাল লেনদেনের সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ডের যোগসূত্র ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতারণার অর্থ বাংলাদেশে রাখা হতো, নাকি বিদেশে পাঠানো হতো—সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
নেটওয়ার্ক কত বড়?
খুলশীর একটি বাড়ি থেকে ৬৩ বিদেশিকে গ্রেপ্তার করা হলেও পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনা শুধু ওই বাড়ি বা ৬৩ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা এর আগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করেছেন। তাদের দেশীয় ও বিদেশি সহযোগীও ছিল। কয়েকজন সহযোগী এখনো পলাতক এবং চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, কারা তাদের বাংলাদেশে এনেছিল, কারা বাসা ভাড়া করে দিয়েছিল, কারা লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছিল, তারা আগে কোথায় ছিলেন এবং বাংলাদেশের কারা তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
একই সঙ্গে ১৩৪টি মোবাইল ফোন ও ৫৭টি ল্যাপটপে থাকা তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এসব ডিভাইস থেকেই তাদের যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, সম্ভাব্য সহযোগী এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই বোঝা যাবে খুলশীর বাড়িটি শুধু একটি আস্তানা ছিল, নাকি এটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বড় কোনো অনলাইন প্রতারণা নেটওয়ার্কের একটি কেন্দ্র।
মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, দেশীয় যারা জড়িত, তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। আমরা আরও ভেতরে ঢুকতে চাই। তারপর তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


