মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিতে পারে যে ১০ আসন

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিতে পারে যে ১০ আসন
ছবি: সিএনএন।

নভেম্বরের নির্বাচন আসন্ন হওয়ায় মার্কিন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে আসার ব্যাপারে উচ্ছ্বাস তুঙ্গে, কিন্তু বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। তবে সিনেটের আসনগুলোর ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক হিসাব ডেমোক্র্যাটদের জন্যও কঠিন।

বিজ্ঞাপন

সিএনএনের এসএসআরএস পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, নিজ নিজ কংগ্রেসনাল আসনে পছন্দের প্রার্থীর ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের চেয়ে ১০ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। একই জরিপ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন মাত্র ৩৩ শতাংশ।

নর্থ ক্যারোলাইনা

ডেমোক্র্যাটিক দলের সাবেক গভর্নর রয় কুপার, যিনি মার্কিন সিনেটের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ছবি: সংগৃহীত।
ডেমোক্র্যাটিক দলের সাবেক গভর্নর রয় কুপার, যিনি মার্কিন সিনেটের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ছবি: সংগৃহীত।

নর্থ ক্যারোলাইনার সিনেট আসনটি ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দলটির সাবেক গভর্নর রয় কুপার রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলির চেয়ে জরিপে এগিয়ে রয়েছেন। প্রচারের শেষ দুই সপ্তাহে ডেমোক্র্যাটরা বিজ্ঞাপনে ১ কোটি ৩২ লাখ ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। বিপরীতে রিপাবলিকানদের বরাদ্দ মাত্র ২৫ লাখ ডলার।

ওহাইও

১২ই অক্টোবর ওহাইওর ইয়াংস্টাউনের কোভেলি সেন্টারে একটি নির্বাচনি সমাবেশে সিনেটর জন হাস্টেডের বক্তব্য শুনছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত।
১২ই অক্টোবর ওহাইওর ইয়াংস্টাউনের কোভেলি সেন্টারে একটি নির্বাচনি সমাবেশে সিনেটর জন হাস্টেডের বক্তব্য শুনছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত।

ওহাইওতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও সাবেক সিনেটর শেরড ব্রাউন এবং রিপাবলিকান সিনেটর জন হুস্টেডের লড়াই হাড্ডাহাড্ডি। সিএনএনের জরিপগুলোর গড় হিসাবে ব্রাউন ৪৯ শতাংশ এবং হুস্টেড ৪৪ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। নির্বাচনের শেষ দুই সপ্তাহে এই রাজ্যে দুই দল মিলিয়ে প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিজ্ঞাপনে ব্যয় করতে পারে।

আলাস্কা

আলাস্কার কোডিয়াকে আলাস্কার মার্কিন সিনেটর ড্যান সালিভান এবং আলাস্কার প্রাক্তন মার্কিন প্রতিনিধি মেরি পেল্টোলা। ছবি: সংগৃহীত।
আলাস্কার কোডিয়াকে আলাস্কার মার্কিন সিনেটর ড্যান সালিভান এবং আলাস্কার প্রাক্তন মার্কিন প্রতিনিধি মেরি পেল্টোলা। ছবি: সংগৃহীত।

আলাস্কায় ডেমোক্র্যাট সাবেক কংগ্রেস সদস্য মেরি পেলটোলা রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনার এক জরিপে পেলটোলা সাত পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সমালোচনা করে সুলিভান বলেছেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়া প্রয়োজন। কারণ এর অর্থনৈতিক প্রভাব রাজ্যটিতে পড়েছে, যার ফলে রাজ্যের গ্যাসের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।

মেইন

মেইনের ব্যাঙ্গরের গ্র্যাসি থিয়েটারে অনুষ্ঠিত বিতর্ক চলাকালীন মেইনের মার্কিন সিনেটর সুসান কলিন্স এবং ডেমোক্র্যাটিক প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রয় জ্যাকসনকে দেখা যাচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত।
মেইনের ব্যাঙ্গরের গ্র্যাসি থিয়েটারে অনুষ্ঠিত বিতর্ক চলাকালীন মেইনের মার্কিন সিনেটর সুসান কলিন্স এবং ডেমোক্র্যাটিক প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রয় জ্যাকসনকে দেখা যাচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত।

মেইনে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের সঙ্গে ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠেছে। সাম্প্রতিক জরিপে কোনো প্রার্থীই স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে নেই। ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ এবং গর্ভপাতের অধিকার নিয়ে কলিন্সের অবস্থান নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের জেতা একটি রাজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী একমাত্র রিপাবলিকান সিনেটর হলেন কলিন্স।

টেক্সাস

টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট জেমস টালারিকো ও রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের লড়াইয়ে হাড্ডাহাড্ডি পরিস্থিতি। সিএনএনের জরিপগুলোর গড় হিসাবে টালারিকো ৪৯ শতাংশ এবং প্যাক্সটন ৪৭ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এমন তীব্র করে তোলার ক্ষেত্রে টালারিকোর দক্ষতা এবং প্যাক্সটনের রাজনৈতিক বুঝ ডেমোক্র্যাটদের আশা জাগাচ্ছে যে, তারা হয়তো অবশেষে রাজ্যব্যাপী নির্বাচনে তাদের ৩২ বছরের পরাজয়ের ধারা ভাঙতে পারবে। কিন্তু তা করতে হলে, টালারিকোকে এমন একটি রাজ্যে জিততেই হবে যেখানে ২০২৪ সালে ট্রাম্প প্রায় ১৪ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।

তবে নির্বাচনি বিজ্ঞাপনে রিপাবলিকানদের ব্যয় ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় অনেক বেশি। প্রাইমারি ও সাধারণ নির্বাচন মিলিয়ে প্যাক্সটনের পক্ষে ৩৮ কোটি ডলারের বেশি বিজ্ঞাপন ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

মিশিগান

১৮ই অক্টোবর মিশিগানের ফ্লিন্টে একটি নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন আবদুল এল-সায়েদ।  ছবি: সংগৃহীত।
১৮ই অক্টোবর মিশিগানের ফ্লিন্টে একটি নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন আবদুল এল-সায়েদ। ছবি: সংগৃহীত।

মিশিগানে ডেমোক্র্যাট আবদুল এল-সাইয়েদ ও সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়েছে। সিএনএনের জরিপগুলোর গড় হিসাবে এল-সাইয়েদ ৪৯ শতাংশ এবং রজার্স ৪৭ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন।

মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুড একটি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটিক মনোনীত প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদকে ইসলামী সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত স্বার্থের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছে এবং এর বিপরীতে এল-সায়েদ যুক্তি দিচ্ছেন যে, সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি ও বারাক ওবামার মতো একই ‘দ্বৈত আনুগত্যের’ জন্য তাকে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে।

শেষ দুই সপ্তাহে রিপাবলিকানদের প্রায় ২ কোটি ৭২ লাখ ডলার এবং ডেমোক্র্যাটদের দেড় কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

আইওয়া

আইওয়ায় ডেমোক্র্যাট জশ টুরেক ও রিপাবলিকান অ্যাশলি হিনসনের মধ্যে প্রতিযোগিতা কাছাকাছি। সিএনএনের জরিপগুলোর গড় হিসাবে টুরেক ৪৭ শতাংশ এবং হিনসন ৪৬ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। রাজ্যটিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিন-চতুর্থাংশ ভোটারের ধারণা, ট্রাম্পের নীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।

কানসাস

হাচিনসনের কানসাস স্টেট ফেয়ারে অনুষ্ঠিত মার্কিন সিনেট বিতর্কের সময় অ্যাডাম হ্যামিল্টন (বামে) মার্কিন সিনেটর রজার মার্শালের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। ছবি: সংগৃহীত।
হাচিনসনের কানসাস স্টেট ফেয়ারে অনুষ্ঠিত মার্কিন সিনেট বিতর্কের সময় অ্যাডাম হ্যামিল্টন (বামে) মার্কিন সিনেটর রজার মার্শালের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। ছবি: সংগৃহীত।

কানসাসে ডেমোক্র্যাট অ্যাডাম হ্যামিল্টন রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনার জরিপে দুজনের সমর্থন সমান দেখা গেছে। ৯৪ বছর ধরে রাজ্যটিতে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত না হওয়ায় এই লড়াই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থনীতি ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ মার্শালের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

নিউ হ্যাম্পশায়ার

নিউ হ্যাম্পশায়ারের ডেমোক্র্যাটিক মার্কিন সিনেট প্রার্থী ক্রিস পাপাস ১৭ই অক্টোবর নিউ হ্যাম্পশায়ারের ন্যাশুয়াতে সমর্থকদের অভিবাদন জানাচ্ছেন। ছবি: সংগৃহীত।
নিউ হ্যাম্পশায়ারের ডেমোক্র্যাটিক মার্কিন সিনেট প্রার্থী ক্রিস পাপাস ১৭ই অক্টোবর নিউ হ্যাম্পশায়ারের ন্যাশুয়াতে সমর্থকদের অভিবাদন জানাচ্ছেন। ছবি: সংগৃহীত।

নিউ হ্যাম্পশায়ারে ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ক্রিস পাপাস রিপাবলিকান সাবেক সিনেটর জন সুনুনুর বিরুদ্ধে লড়ছেন। ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ারের এক জরিপে পাপাস আট পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। রাজ্যটিতে ট্রাম্পের কম জনপ্রিয়তা ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর জন্য সুবিধা তৈরি করতে পারে।

জর্জিয়া

১৩ই অক্টোবর আটলান্টায় আটলান্টা প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন সংক্রান্ত সিনেট বিতর্ক চলাকালে মার্কিন প্রতিনিধি মাইক কলিন্স (বামে) মার্কিন সিনেটর জন অসফের সাথে কথা বলছেন। ছবি: সংগৃহীত।
১৩ই অক্টোবর আটলান্টায় আটলান্টা প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন সংক্রান্ত সিনেট বিতর্ক চলাকালে মার্কিন প্রতিনিধি মাইক কলিন্স (বামে) মার্কিন সিনেটর জন অসফের সাথে কথা বলছেন। ছবি: সংগৃহীত।

নভেম্বরে হাতবদল হওয়ার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যগুলোর তালিকায় জর্জিয়া একেবারে তলানিতে রয়েছে, কারণ ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর জন অসফ সেই রাজ্যটিতে নিজের জয় প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেছেন বলে মনে হচ্ছে, যেটিতে ট্রাম্প ২০২৪ সালে জয়ী হয়েছিলেন। জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে পরিচালিত আটলান্টা জার্নাল-কন্সটিটিউশনের এক জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইক কলিন্সের চেয়ে অসফ ৮ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন (৪৮% বনাম ৪০%)। এই অবস্থানের কারণে রাজ্যটি রিপাবলিকানদের হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা আসনগুলোর তালিকায় নিচের দিকে রয়েছে।

সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে এসব রাজ্যের ফল গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে জরিপ ও নির্বাচনি প্রচারের বর্তমান পরিস্থিতি চূড়ান্ত ফল নিশ্চিত করে না; নির্বাচনের আগের দিনগুলোতে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন ডেমোক্র্যাটরা। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা, মূল্যস্ফীতি ও ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ দলটির প্রার্থীদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। তবে নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও, আলাস্কা ও টেক্সাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা তীব্র হবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। অন্যদিকে, রিপাবলিকানদের শক্তিশালী নির্বাচনি অবস্থান, বিজ্ঞাপনে বিপুল ব্যয় এবং রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক সমীকরণ ডেমোক্র্যাটদের পথ কঠিন করে তুলতে পারে। ফলে জনমত জরিপে এগিয়ে থাকলেও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...