মালয়েশিয়ার মাউন্ট কিনাবালুতে অনুমতি ছাড়া ওঠার পর দুর্ঘটনায় পড়ে কয়েক দিন আটকে থাকা এক ক্রোয়েশীয় পর্বতারোহীকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত জরিমানা করা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এ অর্থের পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা। ৪৬ বছর বয়সি ওই পর্বতারোহীর নাম মাউরো পারসিক। তিনি লন্ডনে বসবাস করেন।
পারসিক ৬ সেপ্টেম্বর মাউন্ট কিনাবালুতে ওঠার সময় একটি অননুমোদিত পথ ব্যবহার করেন। এ সময় তিনি প্রায় ১০ মিটার নিচে পড়ে যান। পরে দুর্বল মোবাইল ফোনের সংকেতের মধ্যেই জরুরি সহায়তার জন্য এসওএস পাঠান। দুর্ঘটনায় তার ডান পা ও পাঁজরে আঘাত লাগে। পরে প্রায় পাঁচ দিন ধরে অভিযান চালিয়ে উদ্ধারকারীরা তাকে পাহাড় থেকে নামিয়ে আনেন।
উদ্ধার অভিযানটি সহজ ছিল না। পারসিক যে পথে পাহাড়ে উঠেছিলেন, সেটি নির্ধারিত বা চিহ্নিত পথ ছিল না। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, বৃষ্টিপাত ও কম দৃশ্যমানতার কারণে উদ্ধারকারীদের বড় ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। দড়ি ও মই ব্যবহার করে তাকে স্ট্রেচারে করে নিচে নামানো হয়। অভিযানে বিভিন্ন সংস্থার অন্তত ৪৩ জন সদস্য অংশ নেন।
পাহাড়ে আটকে থাকার সময় পারসিককে কয়েক দিন খাবার ছাড়াই থাকতে হয়। কাছের একটি ঝরনা থেকে পানি সংগ্রহ করে তিনি বেঁচে ছিলেন। পরে ভারি বৃষ্টির কারণে সেখানে আকস্মিক বন্যার পরিস্থিতিও তৈরি হয়। একপর্যায়ে ঘুমের ব্যাগ পানির স্রোতে ভেসে যায় এবং তিনি একটি পাথরের সঙ্গে যুক্ত দড়ি ধরে নিজেকে নিরাপদ রাখেন।
মাউন্ট কিনাবালু মালয়েশিয়ার সর্বোচ্চ পর্বত। এর উচ্চতা ৪ হাজার ৯৫ মিটার। এটি বোর্নিও দ্বীপের সাবাহ রাজ্যে অবস্থিত এবং কিনাবালু পার্কের অংশ। পাহাড়টি স্থানীয় কাদাজানদুসুন জনগোষ্ঠীর কাছে সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পাহাড়ে ওঠার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম ও অনুমতির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
উদ্ধারের পর পারসিককে কিনাবালু পার্কে অনুমতি ছাড়া প্রবেশের জন্য সর্বোচ্চ ২৫ হাজার রিঙ্গিত জরিমানা করা হয়। সাবাহ পার্কস কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জরিমানার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং তিনি অর্থ পরিশোধ করেন। এরপর তাঁকে পাহাড়ে ওঠার নিয়ম, নিরাপত্তাবিধি ও অনুমোদিত পথ ব্যবহারের বিষয়ে জানানো হয়।
পারসিক পরে সাবাহর স্থানীয় জনগণের কাছে ক্ষমা চান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, স্থানীয় মানুষ, সংস্কৃতি বা পাহাড়কে অসম্মান করার কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না। তার দাবি, প্রবেশ ফি এড়ানো বা ইচ্ছাকৃতভাবে আইন ভাঙা তার উদ্দেশ্য ছিল না। পাহাড়টির সৌন্দর্য দেখে আকস্মিকভাবে সেখানে ওঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, পাহাড়ের পরিবেশের ক্ষতি না করার চেষ্টা করেছিলেন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পাহাড়টির পবিত্রতার বিষয়টিও সম্মান করতে চেয়েছিলেন। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, পাহাড়ে ওঠার আগে নিজের সিদ্ধান্তের ঝুঁকি ও পরিণতি যথেষ্ট বিবেচনা করেননি।
ঘটনাটি শুধু একজন পর্যটকের দুর্ঘটনার বিষয় নয়। অনুমোদিত পথের বাইরে পাহাড়ে ওঠা পর্যটকের নিজের জীবন যেমন ঝুঁকিতে ফেলে, তেমনি তাকে উদ্ধারে উদ্ধারকারী দলের সদস্যদেরও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়। মাউন্ট কিনাবালুর মতো দুর্গম ও আবহাওয়াপ্রবণ এলাকায় তাই অনুমতি, প্রশিক্ষিত গাইড এবং নির্ধারিত পথ অনুসরণ করার বিষয়টি পর্যটন নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষও ঘটনার পর পর্যটকদের অনুমোদিত পথ ও নিরাপত্তাবিধি মেনে চলার বিষয়ে সতর্ক করেছে। পারসিকের ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত প্রাণহানিতে পরিণত না হলেও তার উদ্ধারে বহু মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান চালাতে হয়েছে। জরিমানা ও পরবর্তী সতর্কতা তাই পাহাড়ি পর্যটনে ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও নিরাপত্তাবিধি মানার বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে।
তথ্যসূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, দ্য বার্নামা, দ্য স্টার, মালায় মেইল ও স্ট্রেইটস টাইমস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


