অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে সামরিক শক্তি প্রদর্শন উত্তর কোরিয়ার

অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে সামরিক শক্তি প্রদর্শন উত্তর কোরিয়ার

ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেডের পরীক্ষা চালাল উত্তর কোরিয়া, লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের দাবি

উত্তর কোরিয়া তাদের স্বল্পপাল্লার কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেড সংযুক্ত করে পরীক্ষা চালিয়েছে। শনিবারের এ পরীক্ষায় ১২ থেকে ১৩ হেক্টর এলাকাজুড়ে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটি।

বিজ্ঞাপন

পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশটির সাম্প্রতিক ধারাবাহিক অস্ত্র পরীক্ষার অংশ হিসেবে সর্বশেষ এই পরীক্ষা চালানো হলো। উত্তর কোরিয়ার সরকারি সংবাদমাধ্যম পরীক্ষাটিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ অস্ত্র পরীক্ষা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

কেসিএনএর প্রতিবেদনে দেশটির প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়, পরীক্ষায় ‘স্ট্যান্ডার্ড টাইপ-২ ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেডের’ কার্যকারিতা যাচাই করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি, এই ওয়ারহেড সর্বোচ্চ ঘনত্বের আঘাতের মাধ্যমে ১২ থেকে ১৩ হেক্টর আয়তনের একটি লক্ষ্যবস্তু এলাকাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে সক্ষম।

প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকাশিত ছবিতে হোয়াসং-১১ডি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের দৃশ্য দেখা গেছে। ছবিতে একটি দ্বীপকে লক্ষ্যবস্তু করে ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেডের আঘাত হানার দৃশ্যও তুলে ধরা হয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র প্রশাসন জানিয়েছে, এ ধরনের ওয়ারহেড চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। তবে শ্রেণিগুলোর বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। ক্ষেপণাস্ত্র প্রশাসনের মহাপরিচালকের বরাত দিয়ে কেসিএনএ বলেছে, ‘চলতি বছরের মধ্যেই সামরিক ইউনিটগুলোকে তাদের অভিযানের লক্ষ্য ও লক্ষ্যবস্তুর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সব ধরনের ওয়ারহেড বেছে নিয়ে ব্যবহারের সক্ষমতা দেওয়া হবে।’

পরীক্ষাটি পরিচালনা করেন উত্তর কোরিয়ার অস্ত্র কর্মসূচির উন্নয়নে যুক্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জেনারেল কিম জং-সিক। দেশটির নেতা কিম জং উন এতে উপস্থিত ছিলেন না। দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদ সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, কিম জং-সিক ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের সদস্য এবং কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম উপবিভাগীয় পরিচালক।

ক্লাস্টার বোমা যেভাবে কাজ করে

ক্লাস্টার বোমা এমন এক ধরনের অস্ত্র, যার মূল বোমা বা ওয়ারহেড বিস্ফোরণের পর ভেতরে থাকা অসংখ্য ছোট বোমা বা সাবমিউনিশন বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে একই সঙ্গে বড় একটি এলাকার বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানতে পারে এই অস্ত্র। এসব ছোট বোমার কিছু বিস্ফোরিত না হয়ে মাটিতে পড়ে থাকতে পারে। পরে সেগুলোও বিস্ফোরিত হয়ে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার কারণ হতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রসের (আইসিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ক্লাস্টার বোমার বিস্ফোরণের সময় এবং অবিস্ফোরিত ছোট বোমা থেকে পরবর্তী সময়ে—দুই পর্যায়েই বেসামরিক মানুষের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। ২০২৫ সালে নথিভুক্ত ক্লাস্টার বোমাজনিত হতাহতের ৮৭ শতাংশই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক।

২০০৮ সালে গৃহীত ক্লাস্টার মিউনিশনবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশনে এ ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার, উৎপাদন, মজুত ও স্থানান্তর নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে উত্তর কোরিয়া এ কনভেনশনের সদস্য নয়। ল্যান্ডমাইন অ্যান্ড ক্লাস্টার মিউনিশন মনিটরের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে দেশটিকে ক্লাস্টার বোমা উৎপাদনকারী ও মজুতকারী রাষ্ট্রগুলোর তালিকায় রাখা হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক অস্ত্র পরীক্ষা

উত্তর কোরিয়া সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তির পরীক্ষা চালিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দেশটির পূর্ব উপকূল থেকে সাগরের দিকে প্রায় ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। ওই দিন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস দক্ষিণ কোরিয়া সফরে ছিলেন। তাঁর সফরের সময়ই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ঘটনাটি ঘটে।

এর আগে গত ১৭ অক্টোবর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও নির্দিষ্ট পথে পরিচালিত হতে সক্ষম নতুন ধরনের টর্পেডো পরীক্ষা করার কথা জানায় পিয়ংইয়ং। ‘জাম-২.০’ নামের উচ্চগতির এই টর্পেডোর প্রযুক্তিগত উন্নয়ন যাচাই করতে পরীক্ষা চালানো হয়েছিল বলে কেসিএনএ জানায়। দেশটির দাবি, টর্পেডোর লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ ও পরিচালনার কাজে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।

এ ছাড়া এর আগে সাবমেরিন থেকে দুই ধরনের কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার কথাও জানিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। দেশটির সামরিক বাহিনী নৌযুদ্ধের সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পরীক্ষা চালাচ্ছে।

গত সপ্তাহে কিম জং উন একটি চালকবিহীন উড়োজাহাজ প্রযুক্তির প্রদর্শনী ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। সেখানে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি উন্নত ড্রোনও প্রদর্শন করা হয়। এ সময় তিনি ড্রোন প্রযুক্তিতে ‘পরম শ্রেষ্ঠত্ব’ অর্জনের জন্য দেশটির প্রতি আহ্বান জানান।

দুই কোরিয়ার উত্তেজনার মধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা

সাম্প্রতিক অস্ত্র পরীক্ষাগুলো এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে উত্তেজনা আবারও বেড়েছে। গত সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তের কাছে উত্তর কোরিয়ার একটি স্বচালিত কামান প্রকাশ্যে দেখা যায়। দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত সুরক্ষিত সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের ভারী অস্ত্রের দৃশ্যমান উপস্থিতি অস্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেছে রয়টার্স।

সংবাদমাধ্যমটির একজন প্রত্যক্ষদর্শী দক্ষিণ কোরিয়ার একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র থেকে সীমান্তের কাছে উত্তর কোরিয়ার তিনটি সাঁজোয়া যান দেখতে পান। দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদ সংস্থা ইয়োনহাপ অস্ত্রগুলোকে ১২২ মিলিমিটার স্বচালিত হাউইটজার হিসেবে শনাক্ত করে। অস্ত্রগুলোর নল দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে তাক করা ছিল বলেও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া সীমান্তের অসামরিকীকৃত অঞ্চলে (ডিএমজেড) উত্তর কোরিয়ার প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন সেনাকে বেড়া নির্মাণের কাজ করতে দেখা যায়। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগও উঠেছে।

ট্রাম্প-কিম বৈঠকের আগে সামরিক শক্তি প্রদর্শন?

চীনের শেনজেনে চলতি মাসের ১৮ ও ১৯ নভেম্বর এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপেক) সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ওই সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে আলোচনা চলছে।

ট্রাম্প একাধিকবার কিমের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে উত্তর কোরিয়ার নেতা এখনো প্রকাশ্যে তাঁর প্রস্তাবে সাড়া দেননি। সাম্প্রতিক অস্ত্র পরীক্ষাগুলো সম্ভাব্য বৈঠকের আগে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন এবং আলোচনায় দর-কষাকষির অবস্থান শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

তবে বৈঠকটি হওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, উত্তর কোরিয়া যদি ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের উদ্বেগের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী হয়, তাহলে ট্রাম্প কিমের সঙ্গে বৈঠকে বসতে প্রস্তুত। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বৈঠকের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়নি।

রয়টার্স গত ২৩ অক্টোবর মার্কিন ও দক্ষিণ কোরীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, চলতি বছর ট্রাম্প-কিম বৈঠকের সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে। উত্তর কোরিয়া এখনো যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগের উদ্যোগে সাড়া দেয়নি। যদিও এপেক সম্মেলনের সময় বৈঠক আয়োজনের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।

পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে অনড় যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া

শনিবার যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান উত্তর কোরিয়ার সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। আটলান্টায় জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এ বিষয়ে আলোচনা করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন এবং জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞাগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের বিষয়েও একমত হন। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে অর্থায়ন হতে পারে—এমন কার্যক্রম বন্ধের ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা।

তবে পিয়ংইয়ং পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। দেশটির আইনেই নিজেদের পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিম জং উন ও দেশটির অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তা বারবার বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার ত্যাগ করার কোনো প্রশ্নই নেই।

ফলে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিরস্ত্রীকরণের দাবি, অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ধারাবাহিক উদ্যোগ—দুই কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছে।

সূত্র: কোরীয় সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ), রয়টার্স, ইয়োনহাপ নিউজ এজেন্সি, সিএসআইএস, ইনভেস্টিং ডটকম ও আইসিআরসি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন