পাহাড়, ঝরনা, সাগর ও সবুজের টানে সীতাকুণ্ডে পর্যটকের ঢল নামলেও সেই চাপ সামাল দিতে পারছে না রেলওয়ে। সরকারি ছুটি ও বিশেষ দিবসে ট্রেনে জায়গা না পেয়ে একশ্রেণির যাত্রী ছাদে উঠে জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন।
অন্যদিকে বিলম্বিত মেইল ট্রেন গভীর রাতে কুমিরা স্টেশনে পৌঁছালে নারী-শিশুসহ যাত্রীদের পড়তে হচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা ও পরিবহন সংকটে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিনা টিকিটের যাত্রীর কাছ থেকে রেল কর্মকর্তা পরিচয়ে অর্থ আদায় এবং ট্রেনের ভেতরে অ্যাটেনডেন্টদের টাকা নেওয়ার অভিযোগ। সব মিলিয়ে পর্যটননির্ভর সীতাকুণ্ডে রেলসেবা এখন স্বস্তির বদলে ভোগান্তি ও আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে।
ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বুধবার সকালে চট্টগ্রামমুখী ঢাকা মেইল সীতাকুণ্ড স্টেশনে পৌঁছালে কামরার পাশাপাশি ছাদ থেকেও দলে দলে যাত্রী নামতে দেখা যায়। মুহূর্তেই স্টেশন চত্বর ভরে যায় পর্যটকের ভিড়ে। পরে সিএনজি অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনে চড়ে তারা ছুটে যান চন্দ্রনাথ পাহাড়, গুলিয়াখালী, মহামায়া ও ইকোপার্কসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ছুটির দিনে যাত্রীর চাপ কয়েক গুণ বাড়লেও অতিরিক্ত কোচ কিংবা বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয় না। ফলে দাঁড়ানোর জায়গা না পেয়ে অনেকে ছাদে উঠছেন। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
তাদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে ছাদযাত্রা বন্ধ করা যাবে না; বাড়তি যাত্রীর চাপ বিবেচনায় রেলের পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
রেলযাত্রীদের আরেক বড় ভোগান্তির নাম কুমিরা স্টেশন। যাত্রীদের অভিযোগ, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের কয়েকটি মেইল ট্রেন বিলম্বে গভীর রাতে কুমিরায় পৌঁছায়। পরিবার নিয়ে নামার পর সীতাকুণ্ডে ফেরার পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় অনেককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
কেউ কেউ অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে ফিরতে বাধ্য হন। রাত গভীর হওয়ায় নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও বাড়ে উদ্বেগ।
স্থানীয় বাসিন্দা ইলিয়াস ভুঁইয়া বলেন, সীতাকুণ্ড রেলস্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের নিয়মিত যাত্রাবিরতি হলে পর্যটক ও সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ কমত। কুমিরা মূল এলাকা থেকে দূরে হওয়ায় গভীর রাতে সেখানে নেমে অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন। এ কারণে সীতাকুণ্ডে আন্তঃনগর ট্রেনের স্টপেজের দাবি দীর্ঘদিনের।
কুমিরা রেলস্টেশন মাস্টার আশরাফ আমার দেশকে বলেন, রাত ৩টার দিকে ট্রেন থামলে স্টেশন এলাকায় বখাটে ও মাদকসেবীদের উৎপাত বেড়ে যায়। স্টেশনটি চারদিক থেকে উন্মুক্ত এবং স্থায়ী জিআরপি পুলিশের উপস্থিতি নেই। ফলে নারী যাত্রীদের পাশাপাশি স্টেশন কর্মীরাও নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
রেলসেবার অনিয়ম নিয়েও অভিযোগ করেছেন স্টেশন মাস্টার আশরাফ। তার অভিযোগ, ট্রেনের ভেতরে থাকা অ্যাটেনডেন্টদের কেউ কেউ বিনা টিকিটের যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন। ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না পড়ায় রেল রাজস্ব হারাচ্ছে। ট্রেনের ভেতরে টাকা দেওয়ার পর স্টেশনে আবার নির্ধারিত অর্থ চাইলে যাত্রীরা রেলকর্মীদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ছেন।
সীতাকুণ্ড রেলস্টেশনের মাস্টার নিজাম উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, একটি চক্র টিকিটবিহীন যাত্রীদের টার্গেট করে স্টেশন মাস্টার ও রেল কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। সম্প্রতি এক যাত্রীর কাছ থেকে দেড় হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়ার কথাও জানান তিনি। তার বক্তব্য, টিকিট ছাড়া ভ্রমণ করলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিন্তু কর্মকর্তা পরিচয়ে বেআইনিভাবে অর্থ আদায়ের কোনো সুযোগ নেই।
রেলওয়ে পুলিশের এসআই দীপক দেওয়ান আমার দেশকে বলেন, বিনা টিকিটে ভ্রমণ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তবে জোর করে টাকা আদায়, ভয়ভীতি দেখানো বা শারীরিক নির্যাতনের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে পর্যটকের আনাগোনায় সীতাকুণ্ডের হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় ব্যস্ততা বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, নিরাপদ ও সহজ রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করা গেলে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে। এতে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
স্থানীয়দের দাবি, ছুটির দিনে অতিরিক্ত কোচ ও বিশেষ ট্রেন চালু, সীতাকুণ্ডে আন্তঃনগর ট্রেনের নিয়মিত স্টপেজ, প্রয়োজনীয় মেইল ট্রেনের যাত্রাবিরতি ও সময়নিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ছাদযাত্রা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, কুমিরা ও সীতাকুণ্ড স্টেশনে রাতের নিরাপত্তা জোরদার, জিআরপি পুলিশের টহল বাড়ানো এবং কর্মকর্তা পরিচয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পর্যটনের সম্ভাবনায় সীতাকুণ্ড এগিয়ে গেলেও রেলসেবার দুর্বলতা সেই সম্ভাবনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাদে মৃত্যুঝুঁকি থেকে গভীর রাতে কুমিরায় নেমে নিরাপত্তাহীনতা, সব মিলিয়ে পর্যটননগরীর রেল যোগাযোগে এখনই শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


-8ed6c2.jpg)