ভারতের অর্থনীতিতে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এই হার অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক বেশি। প্রবৃদ্ধির এই তথ্যকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে একই সঙ্গে জিডিপির হিসাব কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে বড় বিতর্কও শুরু হয়েছে।
প্রবৃদ্ধির তথ্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মোদি লিখেছেন, ‘যারা ভারতের পতনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তারাই ব্যর্থ হয়েছেন। ভারত আবারও এগিয়ে গেছে।’
৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এমন সময়ে এসেছে, যখন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং তরুণদের বেকারত্ব নিয়ে মোদি সরকারের তীব্র সমালোচনা চলছে। এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সম্প্রতি ক্ষোভ দেখা গেছে।
এসব পুরোনো উদ্বেগ অবশ্য দূর হয়নি। তবে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধির এই তথ্য বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে তেলের সরবরাহে বড় ধাক্কা এলেও ভারত তা সামাল দিতে পেরেছে। দেশটি অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
জেপি মরগানের প্রধান ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সাজ্জিদ চিনয়ের মতে, গত ছয় মাস ধরেই ভারতের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি ফিরছিল। এর পেছনে বড় ধরনের সরকারি প্রণোদনা কাজ করেছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরাসরি কর কমানো, সেপ্টেম্বরে ভোগের ওপর কর কমানো এবং ২০২৫ সালের শুরু থেকে সুদের হার প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমানো ছিল এর অংশ।
চিনয় ইন্ডিয়া টুডেকে বলেন, ‘প্রশ্ন ছিল, মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাগুলো থেকে ভারত এই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে কতটা সুরক্ষিত রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে বড় কৃতিত্ব দিতে হয়।’
তার মতে, হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের মুখে ভারত দ্রুত জ্বানি আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনে। এতে দেশটি প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে পেরেছে।
বিশ্বের জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যেও ভারতের অর্থনীতি এগিয়ে যাওয়ার পেছনে রপ্তানি দ্রুত বাড়া এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়াও ভূমিকা রেখেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগের বিষয় ছিল।
শুল্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও ভারতের রপ্তানি ১২ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্ববাজারে শক্তিশালী চাহিদা এবং দুর্বল রুপির কারণে রপ্তানি বাড়ার গতি এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির ১৫ শতাংশ দরপতন দেশটির পণ্যকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করেছে। এতে ভারতীয় পণ্যের চাহিদা বেড়েছে।
এদিকে বেসরকারি কোম্পানিগুলোও নতুন ভবন ও কারখানায় বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করেছে বলে মনে হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে মোট বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সূচক মোট স্থায়ী মূলধন গঠন চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক অব বরোদার প্রধান অর্থনীতিবিদ মদন সাবনাভিস বিবিসিকে বলেন, বেসরকারি তথ্যেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়ার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। ডেটা সেন্টার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ধাতু খাতেই এসব বিনিয়োগের ঘোষণা বেশি এসেছে।
তিনি বলেন, ‘অবশ্য বেসরকারি বিনিয়োগ এখনো সব খাতে ছড়িয়ে পড়েনি। তবে এগুলো বিনিয়োগ বাড়ার স্পষ্ট লক্ষণ।’
প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী এই তথ্য প্রকাশের পর কয়েকটি বেসরকারি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ভারতের পুরো বছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে। তবে একই সঙ্গে অনলাইনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজনীতিকদের মধ্যেও শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য।
বিরোধী নেতা জয়রাম রমেশ এই হিসাবকে ‘পরিসংখ্যানের কারসাজি’ বলে অভিহিত করেছেন। তার অভিযোগ, ভারতের ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক বাস্তবতা’ আড়াল করতে সরকার বারবার হিসাবের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছে।
ভারতের সাবেক এক অর্থসচিবও জিডিপির হিসাব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, নতুন করে সংশোধিত তথ্য এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কম ভিত্তির ওপর হিসাব করায় এবারের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে। সরকার অবশ্য এই অভিযোগ জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, জিডিপি হিসাবের ক্ষেত্রে তথ্য সংশোধন স্বাভাবিক বিষয়।
সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করেছেন বিশ্বব্যাংকের ভারতের নির্বাহী পরিচালক নীলকণ্ঠ মিশ্র। তিনি বলেন, নতুন জিডিপি সিরিজে তথ্যের ত্রুটি দূর করা হয়েছে। হিসাবের পদ্ধতিও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা হয়েছে। এতে জিডিপির হিসাবের বিশ্বাসযোগ্যতা বেড়েছে।
তবে ভারতের নতুন জিডিপি সিরিজে অর্থনীতির আকার মাপার পদ্ধতি নতুন করে সাজানো হয়েছে। এর ফলে আগের কয়েক বছরের জিডিপির হিসাবও বড়ভাবে সংশোধন করা হয়েছে। তাই আগের হিসাবের তুলনায় বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার স্বাভাবিকভাবেই বেশি দেখাচ্ছে।
শুধু হিসাবের পদ্ধতি নিয়ে নয়, প্রবৃদ্ধির বাস্তব প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর রঘুরাম রাজন জানতে চেয়েছেন, অর্থনীতি যদি সত্যিই এত দ্রুত বাড়ে, তাহলে দেশে আরও কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না কেন? বিদেশি বিনিয়োগই বা বাড়ছে না কেন?
এর মধ্যে শেয়ারবাজারেও জিডিপির ইতিবাচক খবরের তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। বাজার মোটের ওপর এই খবরকে উপেক্ষা করেছে।
এতে সরকারের জন্যও পরিস্থিতি কিছুটা জটিল হয়েছে। সরকার আশা করেছিল, প্রবৃদ্ধির এই তথ্য ভারতের অর্থনীতির অসম বিকাশ নিয়ে বাড়তে থাকা সমালোচনার জবাব দিতে সাহায্য করবে।
তবে প্রবৃদ্ধির এই গতি নিয়ে এখনই উচ্ছ্বসিত হওয়ার কারণ নেই। প্রথমত, আগামী কয়েক মাসে সরকারি ব্যয় কমে আসতে পারে। বাজেট ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ বাড়বে। এ ছাড়া পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) কমানোর ফলে ভোগ বাড়ার যে প্রভাব দেখা যাচ্ছে, সেটিও শিগগির কমে আসতে পারে বলে মনে করছে এইচএসবিসি।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দুর্বল বর্ষা ও এল নিনোর মতো আবহাওয়া। এতে ভারতের কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষের জীবিকা এই অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। ২৭ আগস্ট পর্যন্ত ভারতে মোট বৃষ্টিপাত দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে ১৩ শতাংশ কম ছিল।
রেটিং সংস্থা কেয়ারএজ এক নোটে বলেছে, এর ফলে কৃষি, গ্রামীণ চাহিদা ও খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে ‘স্পষ্ট ঝুঁকি’ তৈরি হবে। তবে অতীতের এমন পরিস্থিতির তুলনায় ভারত এবার ভালোভাবে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
দেশজুড়ে চিনি ও পেঁয়াজের দাম ইতোমধ্যে বেড়েছে। চাহিদা মেটাতে সরকারকে শহরগুলোতে বিশেষ ট্রেনে পণ্য পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হয়েছে।
এদিকে ভারতের খুচরা মূল্যস্ফীতি মে মাসে ১৫ মাসের সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠেছে। সামনে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, দুর্বল বর্ষার কারণে মূল্যস্ফীতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহনীয় সীমার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
উচ্চ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ঋণের সুদের হার বাড়ার পূর্বাভাস দিচ্ছে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এতে ভারতীয় পণ্যের চাহিদা কমতে পারে। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কাঁচামাল ও জ্বালানির খরচও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে ভারতের প্রবৃদ্ধির এই চমক—তা হিসাবের দিক থেকে কতটা বিশ্বাসযোগ্য, সেই বিতর্কের বাইরে গিয়েও—সম্ভবত সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

