তিনটি সংখ্যা—৩১৩, ৩৩৪ ও ৩৫০। সংখ্যাগুলো দেখলে ক্রিকেটের স্কোরবোর্ডের সাধারণ তিনটি অঙ্কই মনে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ইতিহাসে এই তিনটি সংখ্যার আলাদা ভাষা আছে। আছে তিনটি সময়বন্দি ফ্রেম, তিনটি মাঠ, তিনটি ভিন্ন চরিত্রের ব্যাটিং এবং তিনজন ব্যাটারের অসাধারণ ধৈর্যের গল্প। গল্পটি বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ট্রিপল সেঞ্চুরির।
বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে একসময় তিনশ রান ছিল অচেনা এক ঠিকানা। সেখানে প্রথম পৌঁছেছিলেন রকিবুল হাসান। এরপর এক যুগ পেরোনো দীর্ঘ অপেক্ষা। ১৩ বছর পর সেই ক্লাবের দরজায় পা রাখেন তামিম ইকবাল। তাওহিদ হৃদয় সেই ক্লাবে প্রবেশ করলেন তামিমের ছয় বছর পর, বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে রেকর্ডটি নিয়ে গেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে।
১৯ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ট্রিপল সেঞ্চুরির গল্প এখন তিনজনের। রকিবুলের ৩১৩, তামিমের ৩৩৪ এবং হৃদয়ের ইতিহাস ছোঁয়া ৩৫০; তিনজনই ছিলেন অপরাজিত। সংখ্যা তিনটি আলাদা, গল্পগুলোর পথও আলাদা। তবে একটির সঙ্গে আরেকটির যোগসূত্র আছে ইতিহাসে।
প্রথম দরজাটা খুলেছিলেন রকিবুল
২০০৭ সালের মার্চ। জাতীয় ক্রিকেট লিগের ম্যাচ, ফতুল্লার নারায়ণগঞ্জ ওসমানী স্টেডিয়াম। বরিশাল বিভাগের বিপক্ষে সিলেট বিভাগ। চার দিনের ম্যাচটির শেষ ফল ড্র হলেও সেটি ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে গেঁথে আছে অন্য কারণে। বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সেদিন প্রথমবার তিনশ রান ছুঁয়েছিলেন রকিবুল হাসান।
দ্বিতীয় দিনে ব্যাটিংয়ে নেমেছিলেন। দিনের শেষেও উইকেটে ছিলেন, ৪৭ রানে। তৃতীয় দিনের খেলা শেষ হওয়ার সময় তার রান ১৮৬। অর্থাৎ দুই দিন ধরে তৈরি হচ্ছিল এমন একটি ইনিংসের ভিত, যার শেষ দিনটি বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের ইতিহাসে জায়গা করে নেয়। ৬০৯ বল, ৬৬০ মিনিট এবং ৩৩টি চার। রকিবুল শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন ৩১৩ রানে। তার ম্যারাথন ইনিংসের ওপর দাঁড়িয়ে ৭ উইকেটে ৭১২ রান করে ইনিংস ঘোষণা করেছিল বরিশাল। হান্নান সরকারের ৯৫ ও আরিফুল হকের ১১৫ রানের ইনিংসও ছিল, তবে ম্যাচের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন রকিবুলই। আরিফুলের সঙ্গে সপ্তম উইকেটে তার ২৩৮ রানের জুটিও বড় সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
তামিমের নতুন ঠিকানা
২০২০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের ম্যাচ। পূর্বাঞ্চলের হয়ে আগের দিন ২২২ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছেড়েছিলেন তামিম ইকবাল। পরের দিনের অপেক্ষাটা ছিল ট্রিপল সেঞ্চুরির। শেষ দিনের সকালটা ছিল অন্যরকম; গ্যালারিতে দর্শকের সমাগম, মাঠে এসেছিলেন নির্বাচকরা, সাংবাদিকদের সংখ্যাও অন্য দিনের চেয়ে বেশি। সবাই অপেক্ষা করছেন একটি সংখ্যার জন্য, ২৯৯। সেই সংখ্যায় পৌঁছানোর পর ধুরুধুরু অপেক্ষা। শুভাগত হোমের বল স্কয়ার লেগে ঠেলে দৌড় দিলেন তামিম। দুই রান নিয়ে পৌঁছে গেলেন তিনশর ঘরে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ইতিহাসে লেখা হলো বাংলাদেশের দ্বিতীয় ট্রিপল সেঞ্চুরিয়ানের নাম। শেষ পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলের ইনিংস ঘোষণায় ৪২৬ বল খেলে ৪২ চার ও ৩ ছক্কায় অপরাজিত ৩৩৪ রানের ইনিংস নিয়েই মাঠ ছাড়েন তামিম।
ঘটনার সবচেয়ে সুন্দর অংশটি অবশ্য মাঠেই ছিল। যার রেকর্ড ভেঙেছিলেন, সেই রকিবুল হাসান প্রতিপক্ষ মধ্যাঞ্চলের হয়ে মাঠেই ছিলেন। ১৩ বছর ধরে নিজের দখলে থাকা রেকর্ড হাতছাড়া হওয়ার দিন নতুন রেকর্ডধারীকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরিয়ান।
হৃদয়ের নতুন সীমানা
রেকর্ড গড়া হয় ভাঙা-গড়ার জন্যই। তামিমের রেকর্ডও টিকল ছয় বছর। এবার তামিমের পরের প্রজন্ম হৃদয়। গল্পের মঞ্চ দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুম। বাংলাদেশ ‘এ’ দলের প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’। বাংলাদেশ ৩৭ রানে ২ উইকেট হারানোর পর উইকেটে এসেছিলেন তাওহিদ হৃদয়। শুরুতে দলকে বিপদ থেকে টেনে তোলা, এরপর ইনিংসকে বড় করা এবং শেষ পর্যন্ত সেটিকে ইতিহাসে পরিণত করা; হৃদয়ের ইনিংসের পথটা ছিল এমনই।
জাকের আলীর সঙ্গে পঞ্চম উইকেটে ১৫১ রান যোগ করেন। জাকের ৯৪ রানে ফেরার পর মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনকে নিয়ে ষষ্ঠ উইকেটে আরো ১৮৫ রান। তৃতীয় দিনের শেষেও তার ইনিংস চলছিল। চতুর্থ দিনে এসে পৌঁছে যান ট্রিপল সেঞ্চুরির সামনে। ম্যাথু বোস্টের বল মিড অনে ঠেলে দুই রান নিয়ে পূর্ণ করেন ৩০০। ৪৫১ বল, ২৫ চার ও ৬ ছক্কায় ট্রিপল সেঞ্চুরি। বিদেশের মাটিতে প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার হিসেবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তিনশ রানের কীর্তিও তখন তার। কিন্তু হৃদয়ও তিনশতে থামেননি। একসময় পেরিয়ে যান রকিবুলের ৩১৩। তারপর তামিমের ৩৩৪। বাংলাদেশ ‘এ’ দল ইনিংস ঘোষণা করার সময় ৪৮১ বলে ৩৫০ রানে অপরাজিত ছিলেন এই তরুণ। ম্যাচটি ড্রও হয়েছে হৃদয়ের কল্যাণে।
রকিবুল প্রথম দেখিয়েছিলেন তিন শ রান করা যায়। তামিম সেই সীমাকে আরো ওপরে তুলেছিলেন। হৃদয় সেটিকে আরো ওপরে নিয়ে গেলেন। ফতুল্লা থেকে মিরপুর, মিরপুর থেকে পচেফস্ট্রুম; ১৯ বছরে তিন বাংলাদেশির ট্রিপলের গল্পটা সীমানা ছাড়ানো। অসীম সীমান্তের এই গল্পে বিরামচিহ্নের আগে লাল-সবুজের আর কত কীর্তি যোগ হয়, সেটারই ক্ষণগণনা এখন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


