ঢাকার কেরানীগঞ্জের তারানগর ইউনিয়নের সিরাজনগর বিল অবৈধ দখল ও ভরাটের কারণে ক্রমেই অস্তিত্ব হারাচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে ধলেশ্বরী নদী ও আশপাশের এলাকার অতিরিক্ত পানি ধারণ করে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই বিল এখন বালু ভরাট, মাছের ঘের এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের ফলে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে জলাধারের ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ড্রেজারের মাধ্যমে বালু ফেলে বিল ভরাট এবং মাটির রাস্তা নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক খাল-নালার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বর্ষায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে, আবার দেশীয় মাছের স্বাভাবিক প্রজননও ব্যাহত হচ্ছে। রাজউকের ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুযায়ী সিরাজনগর বিল ‘ফ্লাড ফ্লো জোন’ ও ‘ওয়াটার রিটেনশন এরিয়া’ হিসেবে চিহ্নিত।
একসময় শীত মৌসুমে বিলটিতে বিপুলসংখ্যক পরিযায়ী ও স্থানীয় জলচর পাখির সমাগম হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য বা ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের তৈরি অ্যাকশন কিট অনুযায়ী, প্রায় ২০০ প্রজাতির পাখির বিচরণক্ষেত্র এই বিল ও এর আশপাশের নিম্নাঞ্চল। এসবের মধ্যে ছোট সরালি, পিয়ং হাঁস, গিরিয়া হাঁস, কানি বক, নিশি বক, ডাহুক ও মাছরাঙাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি রয়েছে। তবে বালু ভরাট, পানির পরিমাণ কমে যাওয়া, মাছ চাষের ধরন পরিবর্তন, যান্ত্রিক নৌযানের শব্দ এবং বর্জ্য-দূষণের কারণে তাদের আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিলটি শুধু একটি জলাভূমি নয়; এটি দক্ষিণ-পশ্চিম ঢাকার প্রাকৃতিক জলাধার। বিলটির ধারণক্ষমতা কমে গেলে বসিলা, তারানগরসহ আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়বে। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে পলিযুক্ত জমিতে কৃষিকাজ এবং দেশীয় মাছের প্রজননও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার আমার দেশকে বলেন, সিরাজনগর বিল বালু দিয়ে ভরাট করা শুধু স্থানীয় পরিবেশ নয়; বরং পুরো ঢাকার জন্য ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনবে। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০ অনুযায়ী জলাশয় ভরাট সম্পূর্ণ বেআইনি। অথচ ১৯৯৯ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ঢাকার চারপাশের প্রায় ১৯ হাজার ৩৮৮ হেক্টর নিচু জমি ও জলাশয় আবাসন নির্মাণ ও বালু ভরাটের কারণে বিলুপ্ত হয়েছে।
তার মতে, দক্ষিণ ঢাকা ও কেরানীগঞ্জের অতিরিক্ত পানি ধারণকারী এই প্রাকৃতিক ‘ওয়াটার রিটেনশন এরিয়া’ নষ্ট হলে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরান ঢাকা ও কেরানীগঞ্জে স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দেবে।
তিনি আরো বলেন, বিলটি ভরাট হলে বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ বাড়বে, স্থানীয় তাপমাত্রা ১.৫ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ কমে যাওয়ায় কেরানীগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় পানির সংকটও তীব্র হবে।
কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, জলাভূমির প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হলে শীতকালে আগত হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি তাদের আবাস ও খাদ্যের উৎস হারাবে। ইতোমধ্যে দেশে উপযোগী জলাভূমি কমে যাওয়ায় অতিথি পাখির আগমন প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ওয়াসার তথ্যানুযায়ী, ঢাকায় প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দুই থেকে তিন মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় অবিলম্বে এই বিলে অবৈধ বালু ভরাট বন্ধ করতে হবে এবং আদালতের নির্দেশনা ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ইতোমধ্যে ভরাট হওয়া অংশ উচ্ছেদ করে খননের মাধ্যমে বিলের স্বাভাবিক নাব্য ও পানি ধারণক্ষমতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। একই সঙ্গে বিলসহ ঢাকার চারপাশের জলাশয়গুলোকে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে রাজউক, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে কার্যকর নজরদারি গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি জলাশয় ও কৃষিজমি সংরক্ষণ করে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব নগরায়ণ নিশ্চিতের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


