তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করছে চীন। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ নদীর পানিপ্রবাহ বাড়তে পারে, যা চলতি শতাব্দীতে ভাটির দেশ ভারত ও বাংলাদেশে বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন চীনা গবেষকেরা। তাদের মতে, এ পরিস্থিতি আঞ্চলিক পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও আন্তসীমান্ত নদীর পানি নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের সোমবারের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। চীনের বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী চায়না সায়েন্স বুলেটিন-এ গত ৮ অক্টোবর প্রকাশিত এক গবেষণায় নদীটির অতীতের পানিপ্রবাহ এবং ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকেরা।
চীনের বিজ্ঞান একাডেমি ও ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলটি দক্ষিণ-পূর্ব তিব্বত মালভূমির গাছের বর্ষবলয়ের তথ্য ব্যবহার করে ১৩২৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় সাত শতাব্দীর নদীপ্রবাহ পুনর্গঠন করেছে। পরে জলবায়ুসংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে এসব উপাত্ত মিলিয়ে ভবিষ্যতের বিভিন্ন জলবায়ু পরিস্থিতিতে নদীটির পানিপ্রবাহ কেমন হতে পারে, তা মডেলের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ভবিষ্যতে নদীটির পানিপ্রবাহ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের ঘটনা, যেমন বন্যা, আরো ঘন ঘন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। গবেষকদের মতে, নদীটির পানিপ্রবাহের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন সম্পর্কে এ বিশ্লেষণ ভবিষ্যতের পানিসম্পদসংক্রান্ত ঝুঁকি মূল্যায়নে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেবে।
গবেষকেরা বলেছেন, ভবিষ্যতের পানিপ্রবাহের সম্ভাব্য পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে পানিসম্পদ উন্নয়ন ও পানি সংরক্ষণের অবকাঠামো পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এ অঞ্চলে একাধিক দেশের মধ্যে অভিন্ন নদীর পানি নিয়ে সৃষ্ট ঝুঁকিও মূল্যায়ন করতে হবে।
তিব্বত মালভূমিতে তাপমাত্রা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ হারে বাড়ছে বলে উল্লেখ করেছেন চীনা গবেষকেরা। এর প্রভাবে ওই অঞ্চলের বরফের আচ্ছাদন এবং পানিচক্রে পরিবর্তন আসছে। তাদের ভাষ্য, ইয়ারলুং সাংপো নদীর অববাহিকায় জলবায়ু উষ্ণায়নের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পানিপ্রবাহের ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
তিব্বতে নদীটি ইয়ারলুং সাংপো নামে পরিচিত। ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশের পর এটি প্রথমে অরুণাচল প্রদেশে সিয়াং নামে পরিচিত এবং পরে ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত হয়েছে। নদীটি ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ফলে এর পানিপ্রবাহের পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার বন্যা ও খরার পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
১৬ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের প্রকল্প
ব্রহ্মপুত্রের ওপর চীনের নির্মাণাধীন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ১৬ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। তিব্বতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারতের সঙ্গে বিতর্কিত সীমান্তের কাছাকাছি মেডোগ বা চীনা নামে মোটুও জেলায় প্রকল্পটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
হিমালয় অঞ্চলে নদীটি একটি গভীর গিরিখাতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় তীক্ষ্ণ ইউ-আকৃতির বাঁক নিয়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশের দিকে এগিয়েছে। এই ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়েই বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বেইজিং।
প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে এর স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৬০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে হিসাবে এটি চীনের থ্রি গর্জেস বাঁধের প্রায় তিন গুণ সক্ষমতার হতে পারে। বর্তমানে স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতার বিচারে থ্রি গর্জেস বাঁধ বিশ্বের বৃহত্তম চালু জলবিদ্যুৎকেন্দ্র।
তবে প্রকল্পটি নিয়ে পরিবেশগত ও ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকির উদ্বেগ রয়েছে। গত জুলাইয়ে চীনা ভূতত্ত্ববিদেরা সতর্ক করেছিলেন, প্রস্তাবিত বাঁধের ঠিক নিচ দিয়ে একটি সক্রিয় ভূ-চ্যুতি রেখা চলে গেছে, যা প্রকল্পটির কাঠামোগত স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হতে পারে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেডিমেন্টারি জিওলজি অ্যান্ড টেথিয়ান জিওলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় ভূতত্ত্ববিদেরা বাঁধ নির্মাণে ভূমির ঢালের স্থিতিশীলতা জোরদার এবং ভূমিধস ও ধসের ঝুঁকি কমাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন।
হিমালয় অঞ্চলে দুর্যোগের ঝুঁকি
হিমালয় অঞ্চলের ভঙ্গুর ভূপ্রকৃতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও প্রকল্পটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ২৬ আগস্ট চীন-নেপাল সীমান্ত এলাকায় আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটে। বরফ ও পাথরের ধসের কারণে অস্থায়ীভাবে নদীর প্রবাহ আটকে যাওয়ার পর সেই বাধা ভেঙে বন্যা সৃষ্টি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই দুর্যোগে নেপাল ও চীনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষের মৃত্যু এবং ৫ হাজার ৫০০ জনের বেশি নিখোঁজ হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে।
ভূমিকম্পপ্রবণ ভূত্বকীয় পাতের সংযোগস্থলের কাছে প্রকল্পটির অবস্থান হওয়ায় নির্মাণকাজে বড় ধরনের প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তা সত্ত্বেও চীন প্রকল্পটির কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
এদিকে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর আগে প্রকল্পটি নিয়ে উদ্বেগের জবাবে বলেছে, এর ফলে ভাটির দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কয়েক দশকের গবেষণা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট উদ্বেগ মোকাবিলা করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে বেইজিং।
তবে নতুন গবেষণায় ব্রহ্মপুত্রের ভবিষ্যৎ পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি এবং বন্যার ঝুঁকি নিয়ে যে সতর্কতা দেওয়া হয়েছে, তা নদীটির ওপর নির্ভরশীল ভারত ও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন, বাঁধ নির্মাণ এবং আন্তসীমান্ত পানিব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো এ অঞ্চলে ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইন
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


