যশোরের শার্শায় একটি আলোচিত খামারে লোডশেডিংয়ের কারণে মাছের মৃত্যু হয়নি। বরং মাছের মৃত্যুর জন্য অব্যবস্থাপনা ও অবৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষাবাদসহ বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটি। ঘটনার মাত্র দুই দিনের মাথায় আজ বুধবার পাঁচ সদস্যের এই তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
রিপোর্টে বলা হয়, সোনামুখী বিলের এএফ খামারে মাছ মরেছে সত্য, কিন্তু এই ঘটনার সঙ্গে লোডশেডিংয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। ‘লোডশেডিংয়ের কারণে মাছ মরেছে’ মর্মে যেসব গণমাধ্যম খবর প্রকাশ করেছে, তার কোনো সত্যতা মেলেনি।
তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমে যা-ই বলা হোক না কেন, আলোচ্য খামারটির আয়তন ৪১ দশমিক ৮২ একর বা ১২৬ বিঘা। খামার কর্তৃপক্ষ সেখানে ৬০ লাখ পাবদা ও ৬০/৭০ হাজার অন্যান্য মাছ থাকার কথা মিডিয়াকে জানিয়েছিল। তদন্ত কমিটি খামার মালিক আলফাজুল হকের সাক্ষাৎ পায়নি। তদন্ত কমিটিকে তিনি প্রথমে নিজের অসুস্থতার কথা জানান। পরে তিনি ফোন বন্ধ করে দেন।
তদন্ত রিপোর্টে মৎস্য বিভাগের কারিগরি প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে বলা হয়, প্রতি শতাংশে দেড় হাজার পাবদা ও ১৬টি কার্প জাতীয় মাছ মজুদের তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু খামারের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতি শতাংশে ৮০০টি পাবদা ও পাঁচ থেকে ছয়টি করে কার্প জাতীয় মাছ চাষ করা উচিত। তার অর্থ, খামারটিতে মাছের ঘনত্ব ছিল অত্যধিক।
রিপোর্টে বলা হয়, খামারটির পানির গুণাগুণ পরীক্ষা করে দেখা গেছে সেখানে স্বাভাবিকের তুলনায় পিএইচ লেভেল বেশি। পানিতে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের আধিক্যের কারণে পানি সবুজ বর্ণ ধারণ করে। এছাড়া ওই পানিতে অ্যামোনিয়ার মাত্রাও সহনীয় পর্যায়ের চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া যায়। ফলে মাছের অতিরিক্ত ঘনত্ব, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের আধিক্য ও অপর্যাপ্ত এয়ারেশন-এ তিনটি বিষয় পরস্পর সম্পর্কযুক্ত গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি তৈরি করেছিল।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ৪২ একর জলাশয়ের বিপরীতে খামারে মাত্র পাঁচটি দুই হর্সপাওয়ার ক্ষমতার এয়ারেটর ব্যবহৃত হচ্ছিল; যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। সেখানে অন্তত ৩০টি এয়ারেটর প্রয়োজন ছিল। এছাড়া বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও করেনি খামার কর্তৃপক্ষ।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বিষয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে, তদন্তে দেখা গেছে, ঘটনার রাত ১টা ৪২ মিনিট থেকে ২টা ২৬ মিনিট অর্থাৎ মোট ৪৪ মিনিট লোডশেডিং ছিল। ঘটনার পূর্বের রাতে সাকুল্যে এক ঘণ্টা লোডশেডিং ছিল। এই সামান্য লোডশেডিং মাছের মৃত্যুর কারণ নয়। যদি তা-ই হতো, তাহলে আশপাশের আরও ১২টি বড় মাছের ঘেরেও মাছ মারা যেত। কিন্তু এমনটি ঘটেনি।
জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটির নেতৃত্ব দেন শার্শা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফজলে ওয়াহিদ। অন্য চার সদস্য ছিলেন ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের বিতরণ বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন, নাভারন সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আরিফ হোসেন, শার্শা উপজেলা আইসিটি অফিসার শুভেন্দু হালদার এবং একই উপজেলার সিনিয়র মৎস্য অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) সজীব সাহা।
প্রসঙ্গত, গত ২২ আগস্ট রাতে শার্শার ওই খামারটিতে ২০/২৫ কোটি টাকার মাছ মারা যায় এবং এর জন্য বিদ্যুতের লোডশেডিংকে দায়ী করা হয়। এই বিষয়ে একদিন পর দৈনিক আমার দেশে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
তদন্ত কমিটির রিপোর্টে যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, আমার দেশের রিপোর্টেও মোটামুটি একই তথ্য দেওয়া হয়েছিল। তবে কিছু গণমাধ্যমে একপাক্ষিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, যা বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে তদন্ত রিপোর্টে প্রমাণিত হলো।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

