আত্মহত্যা প্রতিরোধে বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি

আত্মহত্যা প্রতিরোধে বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি

আত্মহত্যাকে শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সংকট হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করা সংগঠনের সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেছেন, আত্মহত্যামূলক আচরণকে সম্পূর্ণভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় এনে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আত্মহত্যা নিয়ে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে সহানুভূতিশীল পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, আত্মহত্যার চিন্তা বা প্রবণতায় থাকা একজন মানুষ অনেক সময় তার আচরণ, কথাবার্তা কিংবা বিভিন্ন সংকেতের মাধ্যমে নিজের মানসিক অবস্থার জানান দেন। এসব সংকেতকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সাড়া দেওয়া গেলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আগেই তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, বিচার বা অবহেলা না করা, মানসিক যন্ত্রণা বোঝার চেষ্টা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর.সি. মজুমদার অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘চেইঞ্জিং দ্য ন্যারেটিভ অন সুইসাইড’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। আত্মহত্যা প্রতিরোধমূলক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ব্রাইটার টুমোরো ফাউন্ডেশন (বিটিএফ) এ সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, আত্মহত্যা নিয়ে সমাজে এখনো নানা ধরনের মিথ, ভুল ধারণা ও নেতিবাচক মানসিকতা রয়েছে। এর ফলে মানসিক সংকটে থাকা অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় সহায়তা চাইতে সংকোচ বোধ করেন। অনেকে সামাজিক বিচার, পারিবারিক প্রতিক্রিয়া কিংবা কলঙ্কের ভয়ে নিজের সমস্যার কথা প্রকাশ করেন না। ফলে তাদের মানসিক যন্ত্রণা আরও গভীর হতে পারে।

এ অবস্থায় আত্মহত্যাকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে এর পেছনে থাকা মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যাগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব নয় বলে মত দেন বক্তারা। আত্মহত্যা প্রতিরোধে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র-সব পর্যায়েই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তারা বলেন, আত্মহত্যা নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রেও সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। আত্মহত্যার চিন্তা বা অনুভূতিতে থাকা ব্যক্তিকে দুর্বল, ব্যর্থ বা অপরাধী হিসেবে না দেখে তার মানসিক যন্ত্রণা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার পথ তৈরি করে দেওয়াকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সেমিনারে কি-নোট স্পিকার হিসেবে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে সাত লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যায় মারা যান। বিশ্বজুড়ে সংঘটিত আত্মহত্যার প্রায় ৭৭ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঘটে।

তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া মানুষের অধিকার। সর্বোচ্চ মানের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আত্মহত্যামূলক আচরণকে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ডা. ফারজানা রহমান বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে শুধু মৃত্যুর ঘটনা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি। এজন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থার পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন স্তরে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

তার বক্তব্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, একজন মানুষ যখন মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যান, তখন তার প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকা জরুরি। সময়মতো সহায়তা পেলে সংকট মোকাবিলা করা এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ব্রাইটার টুমোরো ফাউন্ডেশনের (বিটিএফ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জয়শ্রী জামান বলেন, আত্মহত্যা নিয়ে প্রচলিত ধারণা পরিবর্তনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন প্রয়োজন। এমন বহুমাত্রিক নীতির পক্ষে কথা বলতে হবে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো হবে এবং প্রয়োজনের সময়ে মানুষকে সহায়তা প্রদান করা হবে।

তিনি বলেন, যারা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি সহানুভূতি ও করুণা জাগিয়ে তোলা দরকার। আত্মহত্যার চিন্তা ও অনুভূতির সঙ্গে প্রচণ্ড যন্ত্রণা ও কষ্ট জড়িত। এ ধরনের পরিস্থিতিতে থাকা ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, তার কথা শোনা এবং তাকে সমর্থন দেওয়া অপরিহার্য

জয়শ্রী জামান বলেন, অধিকাংশ মানুষ জানেন না বা বিশ্বাস করেন না যে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা যায়। প্রচলিত মিথ এবং অসংখ্য মিথ্যা ও ভুল তথ্যের ভিড়ে প্রকৃত সত্য অনেক সময় চাপা পড়ে যায়।

তিনি বলেন, কেউ আত্মহত্যা করতে চাইলে নানাভাবে সংকেত দিতে পারেন। এসব সংকেত শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে তার প্রতি সাড়া দেওয়া গেলে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই পরিবার, বন্ধু, সহপাঠী ও সহকর্মীদের এসব বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

সংকটে থাকা মানুষের কথা শুনতে হবে

সেমিনারে বক্তারা বলেন, আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। তার অনুভূতি বা সমস্যাকে তুচ্ছ করা, তাকে দোষারোপ করা কিংবা ‘এগুলো কিছুই না’ ধরনের মন্তব্য করা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।

তাদের মতে, পরিবারের কোনো সদস্য, বন্ধু, সহপাঠী কিংবা সহকর্মীর আচরণে আত্মহত্যার প্রবণতা বা সংকেত দেখা গেলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। তার সঙ্গে কথা বলতে হবে এবং সে কী ধরনের মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজন হলে তাকে কাউন্সেলিং বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।

বক্তারা আরও বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। একজন মানুষের সবচেয়ে কাছের মানুষরাই অনেক সময় তার আচরণে পরিবর্তন প্রথমে দেখতে পান। ফলে পরিবার, বন্ধু ও সহপাঠীদের সচেতনতা আত্মহত্যা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

র‌্যালির মধ্য দিয়ে কর্মসূচির শুরু

সেমিনারের আগে বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে একটি র‌্যালির আয়োজন করা হয়। আর.সি. মজুমদার অডিটোরিয়ামের সামনে থেকে র‌্যালিটি শুরু হয়। পরে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন ও ডাকসু ভবন হয়ে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে গিয়ে শেষ হয়।

র‌্যালিতে আত্মহত্যা প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং আত্মহত্যা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা পরিবর্তনের আহ্বান জানানো হয়।

সেমিনারে বক্তব্য রাখেন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের অধ্যাপক (অব.) কাজী লুতফুন নেসা, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক কবিতা দিলাওয়ার, বিনির্মাণ সংগঠনের সভাপতি নিলুফার বিলকিস এবং ইনারহুইল ক্লাব অব ওয়েসিস ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট-৩৪৫-এর প্রেসিডেন্ট সাদিয়া জিনাত। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি ও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) উপ-প্রধান বার্তা সম্পাদক কবি জুনান নাশিত এবং বিটিএফের উপদেষ্টা, লেখক, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মী এমিলি জামান। অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করেন সৈয়দা তাসফিয়া জাহান সাবা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইনারহুইল ক্লাব অব লবেলিয়া ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট-৩৪৫-এর ফাতিমা হাসনাত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন