দেশের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান নৌ-চ্যানেল ও বহির্নোঙরের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ৩৬ ঘণ্টার ব্যবধানে বহির্নোঙরের আলফা অ্যাংকরেজে চারটি মাদার ভেসেলের সংঘর্ষ, গত এক মাসে একাধিক বিদেশি জাহাজে ডাকাতি এবং নৌ-চ্যানেলে জেলেদের অবৈধ জাল পেতে মাছ ধরার ঘটনায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের সমুদ্রবাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা ও জাতীয় অর্থনীতিতে।
বন্দর সূত্র জানায়, পতেঙ্গা থেকে কুতুবদিয়া পর্যন্ত প্রায় ৬২ নটিক্যাল মাইল দীর্ঘ নেভিগেশনাল রুটে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তাজনিত ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের পরও পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। ফলে বিদেশি জাহাজের পাশাপাশি দেশি লাইটার জাহাজের মালিক ও নাবিকদের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
সবশেষ গত শনিবার রাতে আলফা অ্যাংকরেজে নোঙর করার সময় সিমেন্ট তৈরির কাঁচামালবাহী জাহাজ এমভি আনাসসা আগে থেকে নোঙর করে রাখা এমভি জাহান জাহাজকে ধাক্কা দেয়। এতে আনাসসার বাইরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর আগের দিন শুক্রবার চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ডিজেলবাহী ট্যাংকার এমটি সি স্পাইক নোঙর করে থাকা বাল্ক ক্যারিয়ার এমভি সান শাইনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। প্রায় ৩৩ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল নিয়ে আসা ট্যাংকারটি তীব্র স্রোতের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সান শাইনকে ধাক্কা দেয় বলে জানা গেছে। এতে সি স্পাইকের ইঞ্জিনকক্ষে ফাটল সৃষ্টি হয়ে পানি ঢুকে পড়ে এবং সাময়িক বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দেয়। এর আগে গত ৩ আগস্ট চ্যানেলে চলাচলের সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কনটেইনারবাহী জাহাজ এমভি সিএনসি ইউরেনাস ২ নম্বর রেড বয়ায় ধাক্কা খেয়ে রিটেইনিং ওয়ালে আটকে যায়। জাহাজটির কর্তৃপক্ষ যান্ত্রিক ত্রুটিকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে দাবি করেছে।
দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো বা নোঙর করা একটি জটিল ও সুশৃঙ্খল সামুদ্রিক প্রক্রিয়া। নিরাপদে জাহাজকে জেটি, বার্থ কিংবা বহির্নোঙরে নিতে পাইলটিং
ও বার্থিংয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে বৃষ্টি, প্রবল বাতাস ও তীব্র স্রোতের সময় এই সতর্কতা আরো বাড়াতে হয়।
তিনি বলেন, জাহাজের লোডিংয়ে ত্রুটি, যান্ত্রিক সমস্যা কিংবা অন্য কোনো ত্রুটির কারণেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে দুর্ঘটনা ঘটলে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব তদন্ত কমিটি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এতে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসে না। নিরপেক্ষ সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করা হলে দুর্ঘটনার
প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
তার মতে, বন্দরে বারবার দুর্ঘটনা ঘটলে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা ও জট তৈরি হয়। ফলে আমদানি করা কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় পৌঁছাতে পারে না এবং তৈরি পণ্যও নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা ও জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে।
এক মাসে তিন জাহাজে ডাকাতি
শুধু দুর্ঘটনাই নয়, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। গত এক মাসে বহির্নোঙরে তিনটি বিদেশি পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কয়েক কোটি টাকার যন্ত্রাংশ, জাহাজের সরঞ্জাম ও মূল্যবান মালামাল লুট হয়েছে।
সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই ভোরে চার্লি অ্যাংকরেজে নোঙর করে থাকা সিয়েরা লিওনের পতাকাবাহী ট্যাংকার তাই শুয়েন-এ হামলা চালায় প্রায় ২০ জন সশস্ত্র ডাকাত। পাঁচটি কাঠের নৌকায় করে এসে তারা জাহাজটিতে হামলা চালায়। হংকং থেকে সীতাকুণ্ডের জনতা স্টিলের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য জাহাজটি আনা হয়েছিল।
জাহাজে ডাকাতির ঘটনায় চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক নৌপরিবহনমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে বহির্নোঙরে নিরাপত্তা জোরদারে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের আন্তর্জাতিক সুনাম, বৈদেশিক বাণিজ্য ও দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অবৈধ জালে বাধাগ্রস্ত লাইটার জাহাজ
চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নৌ-চলাচল চ্যানেলেও তৈরি হয়েছে আরেক ধরনের ঝুঁকি। পতেঙ্গা জেলেপাড়া থেকে ভাসানচর পর্যন্ত বিভিন্ন নৌপথে স্থানীয় জেলেরা ‘বিন্দি জাল’ পেতে মাছ ধরছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব জাল লাইটার জাহাজসহ বিভিন্ন নৌযানের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে।
বিশেষ করে জাহাজের প্রপেলারে জাল পেঁচিয়ে গেলে নাবিকদের ঝুঁকিতে পড়তে হয়। এ অবস্থায় ১৭ আগস্টের মধ্যে নৌপথ থেকে সব অবৈধ জাল অপসারণের দাবি জানায় বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাল সরানো না হলে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেয় সংগঠনটি।
বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আফছার হোসেন বলেন, নৌযান চলাচলের নির্ধারিত চ্যানেলে জাল ফেলা নিষিদ্ধ হলেও জেলেরা তা উপেক্ষা করে নিয়মিত মাছ ধরছেন। এতে নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে।
তিনি বলেন, জাহাজের প্রপেলারে জাল আটকে গেলে অনেক সময় জেলেরা সংঘবদ্ধ হয়ে নাবিকদের ওপর হামলা চালান। এমনকি পাথর ছুড়ে জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত করার ঘটনাও ঘটেছে। ভাসানচর এলাকায় দুটি জাহাজের মাস্টার ও সুকানিকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পরে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় তাদের উদ্ধার করা হয়।
‘প্রাকৃতিক কারণেই’ দুর্ঘটনা
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব কেফায়েত হামিম বলেন, সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলো প্রাথমিকভাবে প্রাকৃতিক কারণেই ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। নদীর প্রবল স্রোতের কারণে জাহাজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে। প্রতিটি ঘটনার জন্য পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দুর্ঘটনার অন্যান্য কারণও জানা যাবে।
তিনি বলেন, বন্দরের সার্বিক নিরাপত্তায় কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সমন্বয়ে নিয়মিত মনিটরিং চলছে। পাশাপাশি স্থানীয় মাঝিদের পাতানো অবৈধ জালের বিরুদ্ধেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

