জন হেনলির বিশ্লেষণ

ফ্রান্সের পুলিশ এত সহিংস কেন

ফ্রান্সের পুলিশ এত সহিংস কেন

প্যারিসের বিভিন্ন চত্বরে কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়া, মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ এবং আতঙ্কিত কিশোরদের স্ট্যান গ্রেনেডের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার—কখনো এর চেয়েও ভয়াবহ—পরিচিত দৃশ্যগুলো আবারও ফ্রান্সের পুলিশি পদ্ধতির দিকে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ প্রতিবেশী দেশ যেখানে সাধারণত জনতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা ও উত্তেজনা প্রশমনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে পুলিশি কৌশল নির্ধারণ করে, সেখানে ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরেই রাস্তায় নেমে আসা সামাজিক আন্দোলনগুলোর মোকাবিলায় কখনো কখনো চমকে দেওয়ার মতো শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করে আসছে।

বিজ্ঞাপন

এর পেছনের কারণগুলো জটিল। ইতিহাস, রাজনীতি, রাষ্ট্রের কাঠামো এবং একটি বিশেষ নিরাপত্তা সংস্কৃতির সম্মিলিত প্রভাব এতে রয়েছে। কয়েক দশক, এমনকি কয়েক শতাব্দী ধরে এই সংস্কৃতি গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে। আজও এর সীমা ক্রমাগত আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

ফ্রান্সের পুলিশি নীতির শিকড় নেপোলিয়নের অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক দর্শনে নিহিত। ফ্রান্সে পুলিশ রাষ্ট্রের একটি হাতিয়ার। রাষ্ট্রকে সুরক্ষা দেওয়া, তার আইন প্রয়োগ করা এবং জনশৃঙ্খলা বজায় রাখাই পুলিশের প্রধান দায়িত্ব।

ধারণাগতভাবে, এই দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাজ্যের অবস্থান থেকে অনেকটাই আলাদা। সেখানে উনিশ শতকের শুরুর দিক থেকেই পুলিশকে জনগণের সেবক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জনগণের সম্মতি থেকেই পুলিশের কর্তৃত্ব আসে এবং শান্তি বজায় রাখাই তাদের প্রধান দায়িত্ব।

ফরাসি পুলিশ কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতিনিধি। এর অর্থ হলো, বিক্ষোভ, অবরোধ ও ব্যাপক বিশৃঙ্খলাকে কেবল নাগরিক জীবনের সাময়িক অসুবিধা হিসেবে দেখা হয় না; বরং এগুলোকে প্রজাতন্ত্রের কর্তৃত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পুলিশের অগ্রাধিকার আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা নয়, বরং রাস্তাগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা।

এ কারণেই জনতাকে পরিকল্পিতভাবে ঘিরে ফেলা ও আটকে রাখার মতো আক্রমণাত্মক কৌশল ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি তথাকথিত ‘মধ্যবর্তী’ বা প্রাণঘাতী নয়—এমন অস্ত্রের ব্যবহারও অব্যাহত রয়েছে। এসব অস্ত্রের অনেকগুলোই ইউরোপের অন্যত্র নিষিদ্ধ অথবা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।

প্রতিরক্ষামূলক কাজে ব্যবহৃত বল নিক্ষেপকারী অস্ত্র থেকে ঘণ্টায় ১৮৫ মাইল (৩০০ কিলোমিটার) বেগে রাবারের গুলি ছোড়া হয়। ২০১০-এর দশকের শেষ দিকে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের বিক্ষোভকারীদের আহত করা এবং ২০১৪ সালে পরিবেশ আন্দোলনের এক বিক্ষোভকারীকে হত্যার জন্য দায়ী বিস্ফোরক গ্রেনেডগুলো পর্যায়ক্রমে ব্যবহার থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে সেগুলোর পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে পাইরোটেকনিক স্টান গ্রেনেড।

আঘাতের পাশাপাশি ১৬০ ডেসিবেল মাত্রার তীব্র শব্দের ধাক্কা সৃষ্টি করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য এসব গ্রেনেড তৈরি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এগুলোর কারণে বহু মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন চোখ ও দাঁত হারানো ব্যক্তি, চোয়ালের হাড় ভেঙে যাওয়া মানুষ এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কেটে ফেলতে বাধ্য হওয়া কয়েকজন। এসব গ্রেনেড প্রায়ই ব্যাপক আতঙ্কও সৃষ্টি করে।

ফ্রান্সের রাস্তায় বিক্ষোভের প্রায় অনন্য এক সংস্কৃতিও সহিংস পুলিশি পদ্ধতিকে উৎসাহিত করে। ১৭৮৯ সালের বিপ্লব পর্যন্ত বিস্তৃত বিদ্রোহের ঐতিহ্যের কারণে বিক্ষোভকারীরা জানেন, রাস্তায় নেমে আন্দোলন করলে সরকারকে পিছু হটতে বাধ্য করা যায়—এবং সাধারণত তা হয়ও।

জার্মানি বা নেদারল্যান্ডসের মতো নয়, ফ্রান্সের শ্রমিক ইউনিয়নগুলো ঘন ঘন ধর্মঘট করলেও সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনার অংশীদার হিসেবে স্বীকৃত নয়। দেশটির পঞ্চম প্রজাতন্ত্রের অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত ও প্রেসিডেন্টনির্ভর কাঠামো প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার সুযোগকে প্রান্তিক করে রেখেছে।

এর ফলে একটি অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র প্রায়ই জনগণের ব্যাপক সম্মতি ছাড়াই আইন পাস করে। তাই সরকারের কাছ থেকে দাবি আদায়ের জন্য নাগরিকদের হাতে ‘রাজপথের শক্তি’ই হয়ে ওঠে কার্যকর কয়েকটি উপায়ের অন্যতম। ফ্রান্সে বিক্ষোভকে নাগরিক দায়িত্ব এবং গণতন্ত্রের একটি বৈধ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এতে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়। ফরাসি কর্তৃপক্ষ বড় জমায়েতকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ পাঠায়। পুলিশের সামরিক কায়দার কৌশল আক্রমণাত্মক মনোভাবকে আরো শক্তিশালী করে এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদেরও বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এতে আরও কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো সহিংস কৌশল বেছে নিতে উৎসাহিত হয়। কিন্তু এসব গোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন করার পরিবর্তে পুলিশ লাঠিচার্জ ও বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে। ফলে বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষে রূপ নেয়।

অ্যাকলেডের মতো সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য থেকে ধারাবাহিকভাবে দেখা যায়, বিস্ময়করভাবে ফ্রান্সে সব সময় পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে না। জার্মানি ও ইতালিতেও বিক্ষোভের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে।

তবে এসব তথ্য থেকে এটিও স্পষ্ট যে, ফ্রান্সে সংঘাতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার হার ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে রয়েছে রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি, ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ।

গত কয়েক দশক ধরে ফ্রান্সের পুলিশি ব্যবস্থা ও জনতা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষক এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠনের নিন্দার মুখে পড়েছে। এসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং ইউরোপের কাউন্সিল।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গ্রেনেড ও রাবারের গুলির অপব্যবহার, নির্বিচারে গণগ্রেপ্তার এবং মূলত অহিংস বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও এই পুলিশি মডেল টিকে আছে; বরং এর বিস্তার ঘটছে।

গত মাসে প্রস্তাবিত একটি আইনের বিরুদ্ধে ফ্রান্সে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ মিছিল করেন। সমালোচকেরা আইনটিকে পুলিশের জন্য ‘হত্যার লাইসেন্স’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রস্তাবিত আইনটির লক্ষ্য হলো, দায়িত্ব পালনের সময় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারকারী পুলিশ কর্মকর্তা ও জঁদার্মদের ক্ষেত্রে আইনগতভাবে ‘আত্মরক্ষার অনুমান’ প্রতিষ্ঠা করা।

নাগরিক অধিকার সংগঠন, বামপন্থী রাজনীতিক, বিচারকদের ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ এই আইনের বিরোধিতা করেছে। আইনটি পাস হলে কার্যত পুলিশের গুলিতে কেউ নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনায় বলপ্রয়োগ অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল—তা প্রমাণের দায় ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের ওপর বর্তাবে।

সমালোচকদের মূল বক্তব্য হলো, এই আইন পুলিশের দায়মুক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। এর মধ্য দিয়ে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক সেই সংস্কৃতি আরো শক্তিশালী হবে, যেখানে জনমতের প্রকাশ ও সামাজিক উত্তেজনাকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য গণতান্ত্রিক বাস্তবতা হিসেবে না দেখে দমন করার মতো বিদ্রোহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ফ্রান্সের রাজপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই এখনো শেষ হয়নি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন