জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটে রূপ নেওয়ার পর ইতালির মিলানে ৫০০ সেনা মোতায়েন করছে দেশটির সরকার। একই সঙ্গে ‘রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর জবাব’ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে সরকার। আগামী শনিবার আরো বিক্ষোভের কর্মসূচি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার নতুন কিছু নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘোষণাও দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিক্ষোভে সহিংসভাবে অংশ নেওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, দাঙ্গায় জড়িত ব্যক্তিদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান এবং ভাঙচুর ও লুটপাটে অংশ নেওয়া সন্তানের কর্মকাণ্ডের জন্য তার মা-বাবাকে আর্থিকভাবে দায়বদ্ধ করার ব্যবস্থা।
এদিকে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ মঙ্গলবার জানিয়েছেন, আগামী শনিবারের বিক্ষোভ চলাকালে দেশটিতে কিছু সামরিক সদস্য মোতায়েন করা হবে। তার ভাষায়, এর মূল উদ্দেশ্য হবে ‘শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব পালনে পুলিশ ও জঁদার্মদের সহায়তা দেওয়া’।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু পার্লামেন্টে বলেছেন, শনিবারের বিক্ষোভে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হবে। গত সপ্তাহান্তের সহিংস দাঙ্গার পর তার লক্ষ্য হলো, ‘অবিলম্বে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা’।
বার্তা সংস্থা এএফপির দেখা একটি চিঠি অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে বুধবার সকালে পাঁচটি শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন লেকর্নু। ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, কেউ কেউ ‘অগ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ডের’ মাধ্যমে বিক্ষোভকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে স্কুলশিক্ষার্থীদের এই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় শহর মিলানে শনিবার ও রোববারের অস্থিরতার সময় মুখোশধারী তরুণেরা ময়লার পাত্রে আগুন দেন, দোকানপাটে লুটপাট চালান এবং বিভিন্ন স্থাপনার জানালা ভাঙচুর করেন। শহরের ক্যাথেড্রালসংলগ্ন এলাকাতেও এসব ঘটনা ঘটে। এরপর পুলিশ ২৭১ জন তরুণকে আটক করে।
প্রাথমিকভাবে শান্তিপূর্ণ থাকা বিক্ষোভের প্রান্তে সহিংস গোষ্ঠীগুলো অবস্থান নিয়েছিল। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। সোমবার পুলিশ জানায়, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ জন বিদেশি নাগরিক। এ ছাড়া আরও ২৮ জনের বিরুদ্ধে বিচারিক কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।
সপ্তাহান্তের সংঘর্ষের পর মিলানে ডিওর ব্র্যান্ডের একটি দোকানের জানালাগুলো ঢেকে রাখা হয়েছে। দোকানটির বাইরে নিরাপত্তাকর্মীদেরও দেখা গেছে।
মিলানের গ্যালেরিয়া ভিত্তোরিও এমানুয়েলে দ্বিতীয় বিপণিবিতানে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে চ্যানেল, টিফানি ও ডিওরের মতো ব্র্যান্ড তাদের দোকানের জানালা থেকে পণ্য সরিয়ে নিয়েছে।
ফ্রান্সে শনিবারের সংঘর্ষের ছবি—যার মধ্যে দোকানপাটে লুটপাট এবং সরকারি ভবনে আগুন দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে—বিভিন্ন দেশকে উদ্বিগ্ন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জার্মানিসহ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণসংক্রান্ত সতর্কতা জারি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সহিংস অস্থিরতার ঘটনায় ফ্রান্সে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সোমবার ফরাসি কর্তৃপক্ষ প্যারিস, বোর্দো, লিল ও নিসসহ কয়েকটি শহরে আংশিক কারফিউ জারির ঘোষণা দেয়। রাত তুলনামূলক শান্ত থাকার পর মঙ্গলবার লেকর্নু বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন করে কারফিউ জারি করা হবে।
প্যারিসে সোমবার রাতের কারফিউয়ের মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। মঙ্গলবার রাত ১১টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত রাজধানীর প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকায় এই কারফিউ কার্যকর থাকবে। সপ্তাহান্তের সংঘর্ষের বড় একটি অংশ এই এলাকায় হয়েছিল। কেন্দ্রীয় লে আল শপিং এলাকাতেও কারফিউ প্রযোজ্য হবে।
প্যারিস পুলিশ সাময়িকভাবে পেট্রল বা গ্যাসভর্তি ক্যান ও বোতল বহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কিছু এলাকায় মুখোশ ও হেলমেট পরাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হল পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইতালির বার্তা সংস্থা আনসা জানিয়েছে, দেশটিতে বিবেচনাধীন নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি লক্ষ্য হলো দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী তরুণেরা। তাঁদের ‘মারানজা’ নামে অভিহিত করা হয়। এটি এমন এক কথ্য শব্দ, যা সাধারণত প্রান্তিক এলাকার তরুণদের গোষ্ঠী বা দল বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
আরো অস্থিরতার আশঙ্কায় মিলানের ফ্যাশন এলাকায় অনেক বিলাসবহুল দোকান বন্ধ রয়েছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে চ্যানেল, টিফানি ও ডিওরের মতো ব্র্যান্ড তাদের দোকানের জানালা থেকে পণ্য সরিয়ে নিয়েছে।
ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ডেকাথলন ও আর্ক’টেরিক্সের মতো ক্রীড়াসামগ্রীর দোকান এবং মোবাইল ফোন অপারেটর ভোডাফোনের দোকানেও লুটপাট চালানো হয়েছে।
সোমবার মেলোনি শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার পর উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি বলেন, ‘রাষ্ট্রের ওপর এসব হামলার জবাব সরকার কঠোরভাবে দেবে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া ব্যবস্থাও এর অন্তর্ভুক্ত।’
আগামী বছর সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে মেলোনির জোট সরকার আরও কঠোর শাস্তির বিধান আনার পরিকল্পনা করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। কয়েক দিন ধরে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে দক্ষিণ ইতালিতে ট্রাকচালকদের বিক্ষোভের পর সড়ক অবরোধের ঘটনায় শাস্তি বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
ইউরোপজুড়ে কেন বিক্ষোভ হচ্ছে?
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘১৭ অক্টোবর’ নামে একটি নতুন আন্দোলন গড়ে ওঠায় আগামী শনিবার আরো বিক্ষোভের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে মিলান। আন্দোলনটি জানিয়েছে, ‘চোরদের এই সরকার’ পতন না হওয়া পর্যন্ত প্রতি শনিবার বিকেলে মিলানসহ ইতালির অন্যান্য শহরে বিক্ষোভের আয়োজন করা হবে।
গোষ্ঠীটি বলেছে, ‘সহিংস আপনারাই। আপনারা আমাদের ভবিষ্যৎ কেড়ে নিয়েছেন। এখন আমরা নিজেরাই সেই ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছি।’
বিরোধী রাজনীতিকেরা প্রায়ই সরকারের বিরুদ্ধে নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন। তাদের বক্তব্য, ইতালির নেতারা শিক্ষা, আবাসন এবং প্রান্তিক এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে খুব কমই উদ্যোগ নিচ্ছেন।
জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় নিয়ে সপ্তাহান্তে উত্তর ইতালির আরো কয়েকটি শহরেও বিক্ষোভের সময় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এসব শহরের মধ্যে রয়েছে বোলোনিয়া, ব্রেশিয়া, বার্গামো ও তুরিন। পুলিশ জানিয়েছে, তুরিনে ২৮ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইতালি ও ফ্রান্সের বিক্ষোভের মতো ইউরোপের অন্যান্য এলাকাতেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পর্তুগালের রাজধানী লিসবনসহ বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। এর কয়েক ঘণ্টা আগে ভোরে আবাসন সংকটের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা তাঁবুশিবিরগুলো উচ্ছেদ করে পুলিশ এবং ৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করে।
পর্তুগালের বিক্ষোভকারীরা আবাসন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধির প্রতিবাদ করছেন। প্রতিবেশী স্পেনের একই ধরনের আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের আন্দোলনকে যুক্ত করতে চাইছেন তারা। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের কেন্দ্রস্থলে কয়েক সপ্তাহ ধরে তাবু টানিয়ে অবস্থান করছেন বিক্ষোভকারীরা।
লিসবনের কেন্দ্রীয় রসিও চত্বরে হাজারো মানুষ জড়ো হন। সেখানে হাত তুলে ভোটের মাধ্যমে বুধবার থেকে আবারও তাবুশিবির স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন বিক্ষোভকারীরা।
একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘তারা আমাকে রাস্তায় নামতে ও চিৎকার করতে বাধ্য করেছে।’ আরেকটিতে লেখা ছিল, ‘লিসবন বিক্রির জন্য নয়।’
এদিকে আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় গত এক সপ্তাহ ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা উন্নত করার দাবি, দুর্নীতি নিয়ে ক্ষোভ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিতর্কিত পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের নতুন দাবির মধ্যে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ আরো তীব্র হয়। দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে আতশবাজি ছোড়েন এবং পেট্রলবোমা ও পাথর নিক্ষেপ করেন।
এর আগে মঙ্গলবার রামা আবারও দাবি করেন, সহিংসতার পেছনে ‘বিদেশি শক্তির’ হাত রয়েছে। এর আগে তিনি অনলাইনে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর জন্য রাশিয়া ও ইরানকে দায়ী করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটি একটি হাইব্রিড যুদ্ধ, যা শক্তি সঞ্চয় করছে মূলত মানুষের প্রকৃত ক্ষোভ ও অসন্তোষের ওপর ভিত্তি করে—নিছক কল্পনার ওপর নয়।’ এ সময় তিনি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসনের ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

