ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার নিন্দা জানিয়ে তেহরানের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মস্কো। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যে যুদ্ধের অবসান চায়, সেই যুদ্ধই রাশিয়ার রাজস্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির সুযোগ—সব মিলিয়ে ইরান সংকট থেকে লাভবান হচ্ছে রাশিয়া।
সোমবার তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। মঙ্গলবার আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘আমাদের ইতিহাসে ইরান ও রাশিয়া কখনোই এখনকার মতো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেনি।’
তবে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের পাশে থাকলেও এই সংঘাত আরো বিস্তৃত হোক, তা হয়তো চায় না মস্কো।
এখন কেন তেহরান সফরে লাভরভ?
যুদ্ধকালীন অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করা এবং সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোই লাভরভের তেহরান সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহযোগী অধ্যাপক নাদের হাশেমি বলেন, দুই দেশই যখন যুদ্ধে জড়িয়ে রয়েছে, তখন লাভরভের প্রধান লক্ষ্য হলো রাশিয়া ও ইরানের জোটকে আরো সুসংহত করা। রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে এবং ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেদের যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতা বাড়াতে চায়।
তবে হাশেমির মতে, এর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান আঞ্চলিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে উঠলে সেখানে নিজেদের প্রভাব নিশ্চিত করতে চায় মস্কো।
রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ?
রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব থাকলেও দুই দেশের চুক্তিতে পারস্পরিক সামরিক প্রতিরক্ষার বাধ্যবাধকতা নেই। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মস্কোয় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ২০ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করেন। ওই বছরের অক্টোবরে চুক্তিটি কার্যকর হয়।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। ইরান রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোনের প্রযুক্তি সরবরাহ করে, যার ভিত্তিতে রাশিয়া নিজস্ব সংস্করণের ড্রোন তৈরি করে। ২০২৪ সালে ওয়াশিংটন অভিযোগ করেছিল, তেহরান মস্কোকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও সরবরাহ করেছে।
তেহরান সফরে লাভরভ জানান, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছেড়ে যাওয়া রুশ বিশেষজ্ঞরা ধীরে ধীরে ফিরে আসবেন।
এদিকে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করতে ইরানের ওপর প্রভাব খাটানোর আহ্বান জানিয়েছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্যরা। গত রোববার বাহরাইনে রাশিয়া ও জিসিসির কৌশলগত সংলাপে এ আহ্বান জানানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরানকে সহায়তা করছে রাশিয়া?
প্রকাশ্যে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করেনি মস্কো। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে ‘অবৈধ আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে জানিয়েছে, রাশিয়া ও চীন ইরানকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া ছবি এবং অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব প্রতিবেদন নাকচ করেছেন।
ইরান যুদ্ধ থেকে কীভাবে লাভবান হচ্ছে রাশিয়া?
ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
মার্চ ও এপ্রিল মাসে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ৭২ ডলার থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ১২০ ডলারে পৌঁছায়। ২০ অক্টোবরও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট তেলের দাম ছিল ১০৯ ডলারের ওপরে।
তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বিকল্প উৎস হিসেবে রুশ তেলের চাহিদাও বেড়েছে। এপ্রিল নাগাদ রাশিয়ার প্রধান তেল কর থেকে আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল।
এ ছাড়া জ্বালানির দাম কমানোর চাপে যুক্তরাষ্ট্র রুশ জ্বালানির ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। মার্চ থেকে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় সমুদ্রপথে আগে থেকেই বোঝাই করা রুশ তেল বিক্রির অনুমতি দিয়ে আসছে। চলতি মাসে রাশিয়ার ডিজেলের ওপর নিষেধাজ্ঞার ছাড় ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
গত শুক্রবার রাশিয়া এবং দেশটির তেল-গ্যাসের ক্রেতাদের ওপর নতুন করে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেন ট্রাম্প। এতে তার নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির নিষেধাজ্ঞা সমর্থনকারী সদস্যদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের দাবি, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার টেবিল থেকে রাশিয়াকে ‘বোকামি করে’ দূরে ঠেলে দিতে চান না তিনি।
চ্যাথাম হাউসের সহযোগী গবেষক জন লফ আলজাজিরাকে বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ মেলানোর সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে ক্রেমলিন। রুশ তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বন্ধে ওয়াশিংটনের নীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে মস্কো।
লফের মতে, এর ফলে ইউক্রেন ইস্যুতে ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নীতির মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, যা রাশিয়ার স্বার্থের অনুকূলে যাচ্ছে।
তাহলে কি ইরান যুদ্ধের অবসান চায় না রাশিয়া?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সংঘাত থেকে রাশিয়ার লাভবান হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। উচ্চ তেলের দাম, ডিজেল সরবরাহের সংকট এবং রুশ জ্বালানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় মস্কো অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে।
জন লফের মতে, এসব সুবিধার কারণে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে অচলাবস্থা চলতে থাকলে রাশিয়ার লাভ হতে পারে।
তবে রাশিয়ার মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক নিকিতা স্মাগিনের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কিছু সুবিধা পেলেও রাশিয়া সম্ভবত যুদ্ধের আরো বিস্তার চায় না। কারণ, সংঘাতের পরিণতি অনিশ্চিত এবং তা মস্কোর জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ, যুদ্ধ চলতে থাকলে রাশিয়া অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সেই সুবিধাই বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটে মধ্যস্থতাকারী হতে পারবে রাশিয়া?
রাশিয়ার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসংশ্লিষ্ট প্রায় সব পক্ষেরই কূটনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। নাদের হাশেমির মতে, এ ক্ষেত্রে মস্কোর অবস্থান ওয়াশিংটনের চেয়ে সুবিধাজনক। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।
গত ৯ অক্টোবর ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে পুতিন জানিয়েছিলেন, সংঘাতের অবসান নিয়ে ইরানের অবস্থান তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছেন। ফলে দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের একটি মাধ্যম হিসেবে রাশিয়া ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে হাশেমি মনে করেন, ইরান যুদ্ধের সমাধানে পুতিনের সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প কতটা আগ্রহী, তা স্পষ্ট নয়। ট্রাম্পের ইরান নীতিতে তার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবু যুক্তরাষ্ট্র যখন সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে, তখন রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
গত মাসে ক্রেমলিন জানিয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার জন্য নভেম্বরে চীনের শেনজেনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা (এপেক) সম্মেলনের ফাঁকে পুতিন, ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ট্রাম্প ওই সম্মেলনে যোগ দেবেন কি না, তা হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেনি।
এ ধরনের বৈঠক হলে ইরান যুদ্ধও আলোচনায় আসতে পারে বলে মনে করেন হাশেমি।
এরপর কী হতে পারে?
লাভরভ জানিয়েছেন, অক্টোবরের শেষ দিকে মস্কোয় গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর ফোরামের সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অংশ নেবেন বলে আশা করছে রাশিয়া।
অন্যদিকে, আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর সংঘাত অব্যাহত রয়েছে।
ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান ‘শিগগিরই শেষ করার’ হুমকি দিয়েছেন। জবাবে আরাগচি বলেছেন, ‘আমাদেরও কিছু কাজ এখনো বাকি আছে।’
সব মিলিয়ে, ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে রাশিয়া একদিকে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করছে, অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন থেকে নিজেদের স্বার্থ আদায়ের সুযোগ পাচ্ছে। তবে সংঘাতের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই সুবিধা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

