বিশ্বকাপ ২০২৬: ইউরোপে মুসলিম ফুটবলারদের পরিচয়ই নতুন চ্যালেঞ্জ

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

বিশ্বকাপ ২০২৬: ইউরোপে মুসলিম ফুটবলারদের পরিচয়ই নতুন চ্যালেঞ্জ

ইউরোপে ইসলামকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক বহুদিনের। তবে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে এক নতুন প্রজন্মের মুসলিম ফুটবলার নিজেদের পারফরম্যান্স ও বিশ্বাসের প্রকাশের মাধ্যমে সেই প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। স্পেনের লামিন ইয়ামাল, সুইডেনের ইয়াসিন আয়ারি থেকে শুরু করে কেপ ভার্দের ইসলাম গ্রহণকারী ফুটবলাররা দেখিয়ে দিচ্ছেন, ইসলাম ইউরোপের সমাজ ও সংস্কৃতিরই একটি বাস্তব অংশ।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বে প্রায় ২০০ কোটি মুসলিম বসবাস করেন, যা বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ফলে ১৩টি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ইসলামি বিশ্বাসের প্রকাশ অস্বাভাবিক নয়। তবে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন এমন অনেক ফুটবলার, যারা খ্রিস্টান-সংখ্যাগরিষ্ঠ ইউরোপীয় দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

স্পেন ও বার্সেলোনার তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল সৌদি আরবের বিপক্ষে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোলের পর সিজদাহ দিয়ে উদযাপন করেন। এর আগেও মার্চে স্পেন-মিশর প্রীতি ম্যাচে তার ধর্মীয় পরিচয়কে লক্ষ্য করে দর্শকদের একটি অংশ বিদ্বেষমূলক স্লোগান দেয়। জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইয়ামাল লিখেছিলেন, আমি মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ। ফুটবল মানুষের বিনোদন ও আনন্দের জন্য, কারও বিশ্বাসকে অসম্মান করার জন্য নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামকে ‘বহিরাগত’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা বেড়েছে। অথচ ইয়ামালের মতো ফুটবলারদের উপস্থিতি সেই ধারণার বিপরীত বাস্তবতাই তুলে ধরছে।

জার্মানির ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগারও ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশের কারণে বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন। ২০২৪ সালে রমজান উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাওহিদের প্রতীক হিসেবে তর্জনী উঁচিয়ে ছবি পোস্ট করার পর সেটিকে উগ্রবাদী সংগঠনের প্রতীক বলে দাবি করা হয়। পরে তিনি মানহানি ও বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ নেন।

একইভাবে, তিউনিসিয়ার বিপক্ষে গোল করে সিজদাহ দিয়ে উদযাপন করেন সুইডেনের ইয়াসিন আয়ারি। তিউনিসিয়ান বংশোদ্ভূত হলেও সুইডেনের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দেশটিতে নতুন করে পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। তবে আয়ারির বাবা আজুজ আয়ারি স্পষ্টভাবে জানান, তার সন্তানরা সুইডেনেই জন্মেছে ও বেড়ে উঠেছে, তাই সুইডেনের প্রতিনিধিত্ব করাই তাদের স্বাভাবিক অধিকার।

ইউরোপে শুধু অভিবাসী পরিবার থেকেই নয়, ইসলাম গ্রহণকারী ফুটবলারের সংখ্যাও বাড়ছে। নেদারল্যান্ডসের কিংবদন্তি ক্লারেন্স সিডর্ফ, ফরাসি বংশোদ্ভূত ফ্রেডেরিক কানুতে এবং ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী পল পগবার পর এবার ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার জেড স্পেন্সও ইসলাম গ্রহণকারী ফুটবলার হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অভিষেকের মাধ্যমে তিনি ইংল্যান্ডের প্রথম মুসলিম ফুটবলার হিসেবে ইতিহাস গড়েন। স্পেন্স বলেন, ইতিহাসের অংশ হতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ। আশা করি এটি বিশ্বের তরুণদের অনুপ্রাণিত করবে।

অন্যদিকে, কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ দলে ইউরোপে বেড়ে ওঠা তিন ইসলাম গ্রহণকারী ফুটবলারও বিশেষভাবে নজর কেড়েছেন। জ্যামিরো মন্টেইরো, লোগান কস্তা ও স্টিভেন মোরেইরা পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাদের ভাষ্য, মুসলিম সতীর্থদের জীবনযাপন ও ধর্মীয় অনুশীলন কাছ থেকে দেখেই তারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন।

কেপ ভার্দে দলে ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে ইতিবাচকভাবেই দেখা হয়। মুসলিম খেলোয়াড়দের জন্য নিয়মিত হালাল খাবারের ব্যবস্থা করা হয় এবং দলটির মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও ঐক্য বজায় রাখা হয়। লোগান কস্তার ভাষায়, আমরা মুসলিম হই বা খ্রিস্টান, আমাদের শক্তি হলো আমরা সবাই কেপ ভার্দিয়ান।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপে মুসলিম ফুটবলারদের এই উপস্থিতি ও আত্মবিশ্বাসী পরিচয় প্রকাশ শুধু ক্রীড়াঙ্গনের নয়, ইউরোপের বহুসাংস্কৃতিক সমাজ ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে চলমান বিতর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সূত্র: মিডলইস্ট আই

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...