ইউরোপের জাদুঘরে শোভা পাচ্ছে ইসলামি শিল্পকলার অনন্য নিদর্শন। স্পেনের আলহামরা প্রাসাদের জ্যামিতিক নকশা, শতাব্দীপ্রাচীন ইসলামি স্থাপত্য, অলংকরণ ও শিল্পকর্ম নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে ইউরোপের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোচনায়। অথচ একই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুসলিম অভিবাসন, ধর্মীয় পরিচয় ও ইসলামি সংস্কৃতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হচ্ছে।
এই বৈপরীত্যই সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: ইউরোপ ইসলামি সভ্যতার শিল্পকলা ও ঐতিহাসিক অবদানকে আপন করে নিতে পারলেও, সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত মুসলিম জনগোষ্ঠীকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কেন এত দ্বিধা?
শিল্পকলা, ইতিহাস ও সমসাময়িক সামাজিক বাস্তবতার আলোকে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজেছেন হেবা হাশেম । ইউরোপের বিভিন্ন জাদুঘর ইসলামি শিল্পকলাকে আর নিছক ‘বিদেশি’ বা বহিরাগত সংস্কৃতি হিসেবে তুলে ধরতে চায় না। বরং ইউরোপের নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতি গঠনে ইসলামি সভ্যতার দীর্ঘদিনের ভূমিকা তুলে ধরার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু জাদুঘরে সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি বাড়লেই যে মুসলিমদের প্রতি সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈরিতা কমে যায়, বাস্তবতা তেমন নয়।
লন্ডনের এক প্রদর্শনীতে ইতিহাস ও বর্তমানের মুখোমুখি অবস্থান
এই বৈপরীত্যের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ লন্ডনের ভিঅ্যান্ডএ ইস্ট স্টোরহাউসে স্থপতি ও শিল্পী শাহেদ সালিমের আই ওয়াজ বর্ন হিয়ার (আমি এখানেই জন্মেছি) শীর্ষক প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে স্পেনের তোরিহোস শহর থেকে আসা ৫৩৬ বছরের পুরোনো খোদাই করা কাঠের ছাদের নিচে রাখা হয়েছে তিনটি বড় ও বর্ণিল ট্যাপেস্ট্রি বা বয়নশিল্পকর্ম। এসব শিল্পকর্মে গ্রানাডার আলহামরা প্রাসাদের জ্যামিতিক নকশার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ব্রিটেনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস, অভিবাসন এবং বর্ণবাদী বিদ্বেষের নানা চিত্র।
শিল্পকর্মগুলোতে রয়েছে ব্রিটিশ সরকারের ২০১৩ সালের ‘হোস্টাইল এনভায়রনমেন্ট’ নীতির প্রসঙ্গ, বর্ণবাদী হামলায় নিহত বাংলাদেশি তরুণ আলতাব আলীর স্মৃতিচিত্র এবং আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হোটেলের দৃশ্য।
ব্রিটেনে অনিয়মিত অভিবাসীদের দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া ওই নীতির সমালোচকদের অভিযোগ, এর প্রয়োগ অভিবাসীদের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের প্রতি বৈষম্য ও সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করেছিল।
সালিমের প্রদর্শনীতে কয়েক শতাব্দী পুরোনো ইসলামি প্রভাবযুক্ত স্থাপত্যের সঙ্গে সমসাময়িক অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির চিত্র পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শিল্পী বোঝাতে চেয়েছেন, মুসলিমদের ইউরোপের বাইরের মানুষ হিসেবে দেখার প্রবণতা ইতিহাসের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সালিম বলেন, তার কাজ অভিবাসন ও অন্তর্ভুক্তির গল্প। তার বক্তব্য, ইউরোপের মুসলিমদের বারবার নিজেদের অস্তিত্ব ও পরিচয়ের বৈধতা প্রমাণ করতে হয়—যদিও তাঁদের অনেকেই এই ভূখণ্ডেই জন্মেছেন এবং বেড়ে উঠেছেন।
ইসলামি শিল্পকলা কি ইউরোপের বাইরের কোনো ঐতিহ্য?
ইসলামি শিল্পকলাকে ইউরোপের বাইরের সংস্কৃতি হিসেবে দেখার প্রবণতা ইতিহাসের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন শিল্প ইতিহাসবিদরা। মধ্যযুগে মুসলিম শাসনাধীন স্পেনে স্থাপত্য, গণিত, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শিল্পকলার বিকাশ ঘটে। গ্রানাডার আলহামরা প্রাসাদের জ্যামিতিক নকশা আজও বিশ্বজুড়ে শিল্পী ও স্থপতিদের অনুপ্রাণিত করে। ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত ইসলামি শিল্পকর্মও দুই অঞ্চলের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সাক্ষ্য বহন করে।
প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘরে সংরক্ষিত ত্রয়োদশ শতাব্দীর মামলুক আমলের একটি ধাতব পাত্র এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ‘ব্যাপতিস্তের দ্য সাঁ লুই’ নামে পরিচিত পাত্রটি ফরাসি রাজপরিবারের সদস্যদের ব্যাপ্টিস্ম বা খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষাদানের অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়েছিল। অর্থাৎ, ইসলামি শাসনামলে তৈরি একটি শিল্পকর্ম পরবর্তী সময়ে ইউরোপের রাজকীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে।
ইসলামি শিল্পকলার প্রভাব শুধু স্থাপত্য বা অলংকরণেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সালাম গেটওয়ের প্রতিবেদনে বার্লিনের ইসলামি শিল্প জাদুঘরের পরিচালক স্টেফান ওয়েবারের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন গির্জায় একাদশ শতাব্দীর ইসলামি বস্ত্র সংরক্ষিত রয়েছে। একইভাবে, ‘উদ’ ও ‘রাবাব’-এর মতো বাদ্যযন্ত্র ইউরোপীয় বাদ্যযন্ত্রের বিকাশেও প্রভাব রেখেছে। নবম শতাব্দীর বাগদাদ থেকে গণিতসহ বিভিন্ন জ্ঞান ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাসও দুই অঞ্চলের পারস্পরিক যোগাযোগের প্রমাণ।
ইতিহাসবিদ ও জাদুঘর বিশেষজ্ঞ কনস্ট্যান্স জামির মতে, ইসলামি শিল্পকলাকে কেবল পশ্চিমা ও ইসলামি—এমন দুটি পৃথক জগতের মধ্যে সংযোগকারী হিসেবে উপস্থাপন করলে সেই বিভাজন আরও শক্তিশালী হতে পারে। বরং ইউরোপ ও ইসলামি বিশ্বের ইতিহাস যে দীর্ঘদিন ধরে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে, সেটি স্বীকার করা প্রয়োজন।
স্পেনের ইতিহাসে সহাবস্থান ও নিপীড়নের দুই অধ্যায়
ইউরোপে ইসলামি ঐতিহ্যের ইতিহাস শুধু শিল্পকলা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় সহাবস্থান, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং নিপীড়নের অধ্যায়ও। মধ্যযুগের স্পেনে মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ও জ্ঞানচর্চার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে সেই সহাবস্থান সব সময় সমান বা শান্তিপূর্ণ ছিল না। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর চাপও বেড়েছে।
ইতিহাসবিদ ও লেখক তারিক হুসেইন উল্লেখ করেন, পঞ্চদশ শতাব্দীতে স্পেনে ইনকুইজিশনের মাধ্যমে মুসলিম ও ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন চালানো হয়। পরবর্তী সময়ে বহু মানুষকে নির্বাসনে যেতে, ধর্মান্তরে বাধ্য হতে কিংবা নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে হয়েছিল।
একদিকে স্পেনের তথাকথিত স্বর্ণযুগের সঙ্গে যুক্ত শিল্পকলা ও স্থাপত্য আজও প্রশংসিত হয়, অন্যদিকে সেই সময়ের ধর্মীয় নিপীড়নের ইতিহাসও স্মরণ করা জরুরি। কারণ, কেবল শিল্পকর্মকে আলাদা করে উদ্যাপন করলে সেই শিল্পের পেছনে থাকা মানুষদের জীবন, সংগ্রাম ও বাস্তবতা আড়ালে থেকে যেতে পারে।
এই ঐতিহাসিক দ্বৈততাই বর্তমান বিতর্কের অন্যতম ভিত্তি। ইউরোপের অতীতকে যদি শুধু খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে মহাদেশটির ইতিহাসে মুসলিমদের অবদান যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।
জাদুঘরে ইসলামি শিল্পের কদর, কিন্তু বর্তমানের মুসলিমরা কতটা দৃশ্যমান?
ইউরোপের জাদুঘরগুলোতে ইসলামি শিল্পকলার প্রদর্শনী বাড়লেও সেগুলোতে সমসাময়িক মুসলিমদের অভিজ্ঞতা কতটা উঠে আসে, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
২০২৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব হেরিটেজ স্টাডিজ-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় নেদারল্যান্ডসের কয়েকটি জাদুঘরসহ ইউরোপে ইসলামি শিল্প প্রদর্শনের পদ্ধতি বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষক মেরভে কায়িকচির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কিছু প্রদর্শনীতে ইসলামি সভ্যতার অতীতের অর্জনকে মহিমান্বিত করা হলেও মুসলিম ঐতিহ্যকে স্থির বা অপরিবর্তনীয় হিসেবে দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। এতে সমসাময়িক মুসলিম সমাজের বৈচিত্র্য ও পরিবর্তনশীলতা যথাযথভাবে উঠে না-ও আসতে পারে।
গবেষণাটি নির্দিষ্ট কিছু জাদুঘর ও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে; তাই এর ফলাফলকে ইউরোপের সব জাদুঘর বা সব মুসলিমের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করা যায় না। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—মুসলিমদের অতীতের শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা আর বর্তমানের মুসলিমদের নিজেদের ইতিহাস ও পরিচয় তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া এক বিষয় নয়।
বার্লিনের মিউজিয়াম অব ইউরোপিয়ান কালচারসও এ সমস্যাটি নিয়ে কাজ করেছে। জাদুঘরটির ‘মুসলিম ভিজিবিলিটি ইন দ্য মিউজিয়াম’ প্রকল্পে সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত ইউরোপীয় মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবন ও ধর্মীয় চর্চার সঙ্গে সম্পর্কিত বহু নিদর্শন নতুন করে অনুসন্ধান করা হয়। এর মধ্যে এমন বস্তু ছিল, যেগুলো দীর্ঘদিন সংগ্রহশালার সংরক্ষণাগারে থাকলেও প্রদর্শনীতে স্থান পায়নি।
প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল মুসলিমদের ‘ইউরোপের বাইরের মানুষ’ হিসেবে দেখার ধারণাকে প্রশ্ন করা এবং ইউরোপের মুসলিমদের জীবন, ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতাকে আরও দৃশ্যমান করা। প্রকল্পের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবন ও সংস্কৃতির নিদর্শন সংরক্ষণের কৌশলও তৈরি করা হয়েছে, যেখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের যুক্ত করা হয়েছে।
নতুন প্রদর্শনীতে অতীতের পাশাপাশি বর্তমানও
ইসলামি শিল্পকলাকে নতুনভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে ইউরোপের কিছু প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করছে। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরের এসচার জাদুঘরে ‘এসচার অ্যান্ড ইসলামিক আর্ট: ২০ পার্সপেক্টিভস’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে ডাচ শিল্পী এমসি এসচারের কাজে আলহামরা প্রাসাদের জ্যামিতিক নকশার প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ২০ জন সমসাময়িক শিল্পী চিত্রকলা, ভাস্কর্য, পোশাক ও মৃৎশিল্পের মাধ্যমে সেই ঐতিহ্যকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
এ ধরনের প্রদর্শনী ইসলামি শিল্পকলাকে শুধু অতীতের নিদর্শন হিসেবে নয়, বরং বর্তমানেও সৃজনশীলতা ও নতুন শিল্পভাষার উৎস হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে।
বার্লিনের ইসলামি শিল্প জাদুঘরও তাদের প্রদর্শনীতে সমসাময়িক মানুষের অভিজ্ঞতা যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ৪৫ জনের বেশি সমসাময়িক ব্যক্তির বক্তব্য ও অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে অভিবাসন, বৈচিত্র্য ও পরিচয়ের মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে ঐতিহাসিক শিল্পকর্মের সম্পর্ক তুলে ধরা হবে।
জাদুঘরটির উদ্যোগগুলোর মধ্যে ‘মুলতাকা’ ও ‘তামাম’ প্রকল্পও রয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য অভিবাসী ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমির মানুষকে প্রদর্শনীর ব্যাখ্যা ও উপস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা।
এ ধরনের উদ্যোগের গুরুত্ব হলো, দর্শক শুধু একটি পুরোনো পাত্র, কারুকাজ করা ছাদ বা বস্ত্রের নকশা দেখবেন না; বরং সেগুলোর সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবন, বিশ্বাস, অভিবাসন ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের গল্পও জানতে পারবেন।
ইসলামবিদ্বেষ ও অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির প্রভাব
জাদুঘরে ইসলামি ঐতিহ্য তুলে ধরার পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুসলিম ও অভিবাসীদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও চলছে। বিশেষ করে ডানপন্থী ও উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক বক্তব্যে অভিবাসন, জাতীয় পরিচয় এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনকে অনেক সময় পরস্পরবিরোধী বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
সালিমের প্রদর্শনীতে এ বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়। ব্রিটেনের অভিবাসন নীতি, আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন এবং বর্ণবাদী হামলার স্মৃতি ঐতিহাসিক ইসলামি নকশার পাশে স্থান পেয়েছে। এতে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে প্রশংসা এবং বর্তমানের মুসলিমদের প্রতি আচরণ—দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখলে বৃহত্তর বাস্তবতা ধরা পড়ে না।
তবে ইউরোপের সব দেশ, জাদুঘর বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে একই অবস্থানে রাখা যথাযথ হবে না। বিভিন্ন দেশে মুসলিমদের সামাজিক অবস্থান, অভিবাসন নীতি এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা ভিন্ন। কিছু জাদুঘর মুসলিমদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার উদ্যোগ নিচ্ছে, আবার কিছু প্রদর্শনীতে তাদের সমসাময়িক পরিচয় যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না—গবেষণাগুলোতে এমন বৈচিত্র্যই উঠে এসেছে।
বার্লিনের ইসলামি শিল্প জাদুঘরের পরিচালক স্টেফান ওয়েবারের মতে, ঐতিহাসিক তথ্য ও জনপরিসরের রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যে একটি ব্যবধান রয়েছে। ইসলামি সভ্যতা ও ইউরোপের পারস্পরিক সম্পর্কের ইতিহাস সামনে আনলে মুসলিমদের বহিরাগত হিসেবে উপস্থাপন করার ধারণাকে প্রশ্ন করা সম্ভব। তবে শুধু ইতিহাসের নিদর্শন দেখিয়ে বর্তমানের রাজনৈতিক বৈরিতা দূর করা যাবে না; এর জন্য বৃহত্তর সামাজিক উদ্যোগও প্রয়োজন।
সমাধান কি শুধু আরো জাদুঘর ও প্রদর্শনী?
ইসলামি শিল্পকলার প্রদর্শনী বাড়ানো সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু এর মাধ্যমে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য বা অভিবাসনবিরোধী মনোভাবের অবসান ঘটবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
এখানে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, ইতিহাসকে পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করতে হবে। ইসলামি শিল্পকলাকে শুধু নান্দনিক সৌন্দর্যের নিদর্শন হিসেবে দেখালে তার পেছনের সামাজিক, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হারিয়ে যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বর্তমানের মুসলিমদেরও সেই ইতিহাসের ব্যাখ্যা ও উপস্থাপনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তাদের শুধু প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু হিসেবে নয়, বরং ইতিহাস ও সংস্কৃতির সক্রিয় অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।
তৃতীয়ত, জাদুঘরের বাইরে বৃহত্তর সমাজেও বৈষম্য ও বিদ্বেষের প্রশ্ন মোকাবিলা করতে হবে। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ইতিহাসের বিকল্প ব্যাখ্যা তুলে ধরতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক আচরণ ও নীতিনির্ধারণে পরিবর্তন আনার জন্য আরো বিস্তৃত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শিল্পকলাকে গ্রহণ, মানুষকে প্রত্যাখ্যান—এই বৈপরীত্য কত দিন?
ইউরোপের ইসলামি শিল্পকলার ইতিহাস কোনো বিচ্ছিন্ন অধ্যায় নয়। স্পেনের স্থাপত্য, ইউরোপের জাদুঘরে সংরক্ষিত শিল্পকর্ম, বাদ্যযন্ত্রের বিকাশ এবং জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে ইসলামি সভ্যতার অবদান মহাদেশটির সাংস্কৃতিক বিকাশের সঙ্গে যুক্ত।
অন্যদিকে, মুসলিমদের বর্তমান অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু অতীতের গৌরবের কথা বললে চলে না। তাদের দৈনন্দিন জীবন, অভিবাসনের অভিজ্ঞতা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং বৈষম্যের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
মূল প্রশ্নটি তাই কেবল ইসলামি শিল্পকলার প্রদর্শনী নিয়ে নয়; এটি ইউরোপের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও বহুত্ববাদ নিয়েও। কোনো সভ্যতার শিল্পকলা প্রশংসা করা হলেও সেই সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের বহিরাগত হিসেবে দেখা হলে সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
ইউরোপের জাদুঘরগুলো ইসলামি শিল্পকলাকে নিজস্ব ইতিহাসের অংশ হিসেবে তুলে ধরার যে উদ্যোগ নিচ্ছে, তার তাৎপর্য আরও বাড়বে যদি সেই স্বীকৃতি বর্তমানের মুসলিমদের অভিজ্ঞতা ও অবদানকেও জায়গা দেয়। কারণ, ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু পুরোনো নিদর্শন সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়—সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহনকারী মানুষদেরও স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়।
সূত্র: সালাম গেটওয়ে, আল জাজিরা, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব হেরিটেজ স্টাডিজ এবং বার্লিনের মিউজিয়াম অব ইউরোপিয়ান কালচারস।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


