সুন্দরবনের আদলে সীতাকুণ্ডের ম্যানগ্রোভে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য

সুন্দরবনের আদলে সীতাকুণ্ডের ম্যানগ্রোভে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য
সুন্দরবনের আদলে সীতাকুণ্ডের ম্যানগ্রোভে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য

চারদিকে শিল্পের কোলাহল, ভারী যানবাহনের শব্দ আর উন্নয়নের বিস্তার। এর মাঝেই বঙ্গোপসাগরের নোনা জলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় সাত হাজার একর ম্যানগ্রোভ বন। কেওড়া, বাইন ও গেওয়ার ঘন সবুজের আড়ালে ছুটে বেড়াচ্ছে হরিণের পাল, গাছের ডালে বানরের লাফালাফি, আকাশে উড়ছে নানা প্রজাতির পাখি। জোয়ারে ডুবে যায় বনের শিকড়, ভাটায় জেগে ওঠে কাদামাটির পথ। সুন্দরবনের আদলে গড়ে ওঠা এই বন স্থানীয়দের কাছে ‘দ্বিতীয় সুন্দরবন’ নামে পরিচিত। বাঘ নেই, কিন্তু রয়েছে বন্যপ্রাণীর সমৃদ্ধ এক জগৎ। তবে দ্রুত শিল্পায়ন ও মানুষের বাড়তি চাপের মধ্যে এই বন ও এর জীববৈচিত্র্য কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া, মুরাদপুর ও সৈয়দপুর ইউনিয়নের ভাটেরখীল, খুলিয়া খালি, বাঁকখালী ও বগাচতরসহ উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে ম্যানগ্রোভের এই সবুজ বেষ্টনী। পুরোনো বেড়িবাঁধ থেকে সমুদ্র উপকূল পর্যন্ত কোথাও কোথাও প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রয়েছে বন। কেওড়ার শ্বাসমূল, বাইন-গেওয়ার ঝোপ এবং জোয়ার-ভাটার পানিতে তৈরি বিশেষ পরিবেশে এখানে গড়ে উঠেছে হরিণ, বানর, শৃগাল, বুনো হাঁসসহ বিভিন্ন প্রাণী ও পাখির আবাসস্থল।

বিজ্ঞাপন
6440b443-6252-4c4c-ad08-888e1dc4b05a

স্থানীয় বাসিন্দা এ কে আজাদ আমার দেশকে বলেন, ভোর কিংবা বিকেলের দিকে বনের কিনারায় প্রায়ই হরিণ দেখা যায়। কখনো একা, আবার কখনো দলবেঁধে হরিণ বনের বাইরে আসে। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই দ্রুত ঝোপঝাড়ের আড়ালে চলে যায়। কয়েক বছর আগের তুলনায় বর্তমানে বন্যপ্রাণীর বিচরণ তুলনামূলক বেশি চোখে পড়ে বলেও জানান তিনি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এক সময় এই বনে হরিণ শিকারের প্রবণতা ছিল। শিকারিরা গোপনে বনের ভেতরে ঢুকে হরিণ শিকার করত। এসব ঘটনায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। সম্প্রতি একজন শিকারিকে কারাভোগও করতে হয়েছে। বর্তমানে বন্যপ্রাণী রক্ষায় বন বিভাগের বিট কর্মকর্তারা নিয়মিত টহল দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের সীতাকুণ্ড রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রনি আলী আমার দেশকে বলেন, সীতাকুণ্ডে প্রায় সাত হাজার একর উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ রয়েছে। সুন্দরবনের আদলে গড়ে ওঠা এই বিশাল বনাঞ্চল বর্তমানে বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। এখানে প্রচুর হরিণ, বানর ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি রয়েছে। তবে কোনো বাঘ নেই।

রেঞ্জ কর্মকর্তা বলেন, একসময় উপকূলীয় বনাঞ্চলে হরিণ শিকারের প্রবণতা ছিল। স্থানীয় কয়েকজন শিকারির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সম্প্রতি একজন শিকারিকে কারাভোগও করতে হয়েছে। বর্তমানে বন্যপ্রাণী রক্ষায় বিট কর্মকর্তারা নিয়মিত টহল দিচ্ছেন। শিকারিদের তৎপরতা ঠেকাতে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।

তবে শুধু শিকার বন্ধ করলেই ম্যানগ্রোভ রক্ষা হবে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, বনভূমিতে অবৈধ প্রবেশ, গাছ কাটা, বর্জ্য ফেলা, দখল এবং বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণের চাপ রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিস্তার। ফলে একদিকে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ, অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলের সম্প্রসারণ, দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সীতাকুণ্ডের পাশের মিরসরাই উপজেলাতেও দ্রুত বাড়ছে শিল্পায়নের পরিধি। মঘাদিয়া, সায়েরখালি, গজারিয়া ও ডোমখালী এলাকায় শিল্প জোনের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। উত্তর ইছাখালী, দক্ষিণ ইছাখালী, ব্রাহ্মণসুন্দর, উত্তর মঘাদিয়া, দক্ষিণ মঘাদিয়া, উত্তর ডোমখালী ও দক্ষিণ ডোমখালী পর্যন্ত শিল্প জোনের বিস্তার ঘটেছে। একই বৃহত্তর উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে উত্তর বগাচতর, দক্ষিণ বগাচতর, মহানগর, উত্তর বাঁকখালী, দক্ষিণ বাঁকখালী, মুরাদপুর ও গুলিয়াখালী উপকূল। ফলে শিল্পায়নের পরিকল্পনার সঙ্গে ম্যানগ্রোভ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণের সমন্বয় না হলে ভবিষ্যতে পরিবেশের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিবেশসংশ্লিষ্টদের মতে, সীতাকুণ্ডের ম্যানগ্রোভ শুধু বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নয়, এটি উপকূলবাসীর প্রাকৃতিক সুরক্ষা-কবচও। কেওড়া, বাইন ও গেওয়ার শিকড় মাটি আঁকড়ে ধরে রাখে, ঢেউয়ের আঘাত কমায় এবং জলোচ্ছ্বাসের সময় উপকূলকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে মাছ, কাঁকড়া, পাখিসহ বিভিন্ন প্রাণীর খাদ্য ও প্রজননচক্রের সঙ্গে এই ম্যানগ্রোভের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এই বন ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু গাছপালা কিংবা কয়েকটি বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলই নয়, পুরো উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যই ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বনাঞ্চলে মোট কত হরিণ রয়েছে, কত প্রজাতির পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর বিচরণ রয়েছে, কোন এলাকায় তাদের উপস্থিতি বেশি এবং কোথায় প্রজননস্থল, এসব বিষয়ে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক জরিপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে বনাঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা করা জরুরি। শিল্পায়নের পরিকল্পনা গ্রহণের সময়ও ম্যানগ্রোভ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, প্রায় সাত হাজার একর বিস্তৃত উপকূলীয় বনাঞ্চলের প্রতিটি এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিকারি, বনদখলকারী কিংবা পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের তথ্য স্থানীয়রা দ্রুত জানালে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়। বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্থানীয়দের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এই বনকে আরও নিরাপদ করা সম্ভব বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিল্পাঞ্চলের বিস্তারের মাঝেও সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ এখনো প্রকৃতির এক অনন্য আশ্রয়স্থল। বনের কিনারায় হরিণের ছুটে চলা, গাছের ডালে বানরের বিচরণ আর পাখির কলকাকলি জানান দিচ্ছে, প্রকৃতি এখনো এখানে বেঁচে আছে। কিন্তু এই বন টিকিয়ে রাখতে হলে শিকার বন্ধের পাশাপাশি দখল, গাছ কাটা, বর্জ্য ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ ঠেকাতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের কার্যকর সমন্বয় করতে হবে। নইলে আজ যে ম্যানগ্রোভ উপকূলবাসীকে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে প্রাকৃতিক সুরক্ষা দিচ্ছে, কাল সেই সবুজ দেয়ালের জায়গা দখল করতে পারে কংক্রিটের দেয়াল, আর হারিয়ে যেতে পারে দ্বিতীয় সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন