মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তা সমীকরণে ভারত ও ইসরাইলের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরো জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে সাম্প্রতিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি যা ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। এই চুক্তি দিল্লি ও জেরুজালেমকে নতুন করে কৌশলগত হিসাব-নিকাশে বাধ্য করছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক ফোনালাপের সময়টিও এ কারণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার ফোনে পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে। একই সঙ্গে দুই নেতা ভারত-ইসরাইল ‘বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বের’ বিভিন্ন দিকের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছেন বলেও জানান তিনি। মোদি বার্তাটি ইংরেজি ও হিব্রু দুই ভাষায় প্রকাশ করেন এবং নেতানিয়াহুও তা পুনঃপ্রকাশ করেন।
পরদিনই সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মক্কায় একটি বিস্তৃত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তিটিতে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের আদলে একটি ধারা রয়েছে বলে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ, জোটের কোনো একটি দেশের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ফলে মোদি-নেতানিয়াহু ফোনালাপের প্রকৃত প্রেক্ষাপট আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় এই নতুন জোটের প্রভাব দুই নেতার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর বাইরে নতুন সমীকরণ
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর পক্ষে কাজ করেছে, যেখানে ইসরাইল, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অপেক্ষাকৃত বাস্তববাদী আরব দেশগুলোকে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। কিন্তু মক্কায় যে সমীকরণ তৈরি হলো, তা সেই পরিকল্পনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আস্থায় টানাপোড়েন তৈরি হওয়া এবং ইরান ও তার মিত্রদের সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে। সেই হিসাব থেকেই রিয়াদ তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্কের দিকে এগিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইসরাইলের জন্য বিষয়টি স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ, সৌদি আরবকে ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ করার যে কৌশলগত প্রত্যাশা ছিল, নতুন ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সেটিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
পাকিস্তান-তুরস্কের সঙ্গে সৌদি জোটে ভারতের উদ্বেগ
মক্কা চুক্তি শুধু ইসরাইলের জন্য নয়, ভারতের জন্যও উদ্বেগের কারণ। পাকিস্তান ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং তুরস্কও ইসলামাবাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ফলে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক সামরিক সক্ষমতা—এই তিনটির সমন্বয় দিল্লির কাছে নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই তুরস্ক ও পাকিস্তানের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে, নতুন সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক অক্ষ মোকাবিলায় ভারত ইসরাইলের সঙ্গে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে জরুরি উদ্যোগ নিয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফ্যাক্ট চেক ইউনিট অবশ্য এ ধরনের আনুষ্ঠানিক নতুন চুক্তির খবরকে ‘ভুয়া খবর’ বলে নাকচ করে। তবে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল একই সঙ্গে স্পষ্ট করেন, তুরস্ক-পাকিস্তান-সৌদি আরবের নতুন প্রতিরক্ষা সমঝোতার বিষয়টি ভারত ‘গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ’ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটিই ভারতের উদ্বেগের মাত্রা বোঝার জন্য যথেষ্ট। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতা এবং ইসলামাবাদকে উন্নত ড্রোনসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের ইতিহাস দিল্লির উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে।
অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে
মক্কা চুক্তির প্রভাব শুধু সামরিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর অর্থনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভারতের নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোরের (আইএমইসি) গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে সৌদি আরব। বহু বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের লক্ষ্য ভারত, উপসাগরীয় অঞ্চল, ইসরাইলের হাইফা বন্দর এবং ইউরোপকে একটি বাণিজ্যিক ও পরিবহন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুক্ত করা।
অন্যদিকে তুরস্ককে মূল আইএমইসি রুটে রাখা হয়নি। বরং আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরে বিকল্প একটি আঞ্চলিক পরিবহন করিডোরের পক্ষে কাজ করছে। ফলে সৌদি আরবের সঙ্গে তুরস্কের কৌশলগত সম্পর্ক বাড়লে আইএমইসির মতো ভারত-ইসরাইল সমর্থিত প্রকল্পে আঙ্কারার প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সৌদি-ইসরাইল সম্পর্কেও নতুন জটিলতা
মক্কা চুক্তি সৌদি আরব ও ইসরাইলের সম্ভাব্য স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পথকেও কঠিন করে তুলতে পারে। তুরস্ক ও পাকিস্তান এই দুই দেশই ইসরাইলের প্রতি কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত। সৌদি আরব তাদের সঙ্গে যত ঘনিষ্ঠ হবে, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে রিয়াদের ওপর তত বেশি রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপ তৈরি হতে পারে।
তুরস্ক বা পাকিস্তানের হাতে সৌদি পররাষ্ট্রনীতিতে আনুষ্ঠানিক ভেটো না থাকলেও, তাদের সঙ্গে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার রাজনৈতিক মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক না করার বিষয়ে সৌদি আরবের অবস্থানও আরও কঠোর হতে পারে।
গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গেও বাড়তে পারে ইসরাইলের সম্পর্ক
নতুন সমীকরণের কারণে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কও আরো ঘনিষ্ঠ হতে পারে। তুরস্কের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের অবনতি হওয়ার পর জেরুজালেম গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে নিরাপত্তা ও জ্বালানি সহযোগিতা বাড়িয়েছিল। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধির বিষয়ে এথেন্স ও নিকোসিয়াও উদ্বিগ্ন। ফলে সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান জোটের প্রেক্ষাপটে গ্রিস, সাইপ্রাস ও ইসরাইলের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা আরো জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সামনে আরো ঘনিষ্ঠ হতে পারে দিল্লি-জেরুজালেম
সব মিলিয়ে মক্কা চুক্তি ভারত ও ইসরাইলের জন্য একই ধরনের একটি কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক ও আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি। এই বাস্তবতায় দিল্লি ও তেল আবিব নিজেদের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক অংশীদারত্ব আরো শক্তিশালী করার দিকে এগোতে পারে। বিশেষ করে আইএমইসি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্ক আরো গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবারের মোদি-নেতানিয়াহু ফোনালাপ তাই এখন আর নিছক নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ বলে মনে হচ্ছে না। মক্কা চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতায় ভারত ও ইসরাইলের সম্ভাব্য পাল্টা কৌশলগত সমন্বয়ের একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
মধ্যপ্রাচ্যে এক পক্ষ নতুন জোট গড়লে অন্য পক্ষও পাল্টা অংশীদার খুঁজবে—এমন একটি পুরোনো ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাই যেন আবার সামনে এসেছে। আর সেই নতুন সমীকরণে ভারত-ইসরাইল সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।
সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


