রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে গণহত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাসহ ৩১ আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল সোমবার ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেয়। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেনÑবিচারক মঞ্জুরুল বাছিদ ও নুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবির। মামলার মোট আসামি ৪১ জন।
এদিন প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি এ মামলায় আনা দুটি অভিযোগ তুলে ধরেন। এর মধ্যে প্রথম অভিযোগে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে ঢাকায় ৩২ জনকে হত্যার ঘটনা আনা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগে আনা হয়েছে ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের ঘটনা।
শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তৎকালীন সরকার ২০১৩ সালের ৫ মে পরিকল্পিতভাবে হেফাজতের নিরস্ত্র নেতাকর্মীদের ওপর গণহত্যা চালায়। ওইদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম খা আলমগীর, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামছুল হক টুকু, খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং সরকারের দায়িত্বশীল বিভিন্ন মন্ত্রী, এমপি, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের যেকোনো উপায়ে রাতের মধ্যেই শাপলা চত্বর থেকে বিতাড়িত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেন।
চিফ প্রসিকিউটর আরো বলেন, উপরের নির্দেশ পেয়ে পুলিশের তৎকালীন আইজিপি হাসান মাহামুদ খন্দকারের নেতৃত্বে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে যৌথ সভা করেন। শাপলা চত্বর ও এর আশপাশের এলাকায় সশস্ত্র অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন। অভিযান পরিচালনার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজ নিজ বাহিনীর নামে অভিযানের নামকরণ করে। পুলিশের অভিযানের নামকরণ করা হয় ‘অপারেশন সিকিউরড শাপলা’। র্যাব অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ এবং বিজিবির ‘অপারেশন ক্যাপচার শাপলা’ নাম দেওয়া হয়। তবে অভিযানটি ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ নামে পরিচিতি পায়। অভিযানের নামকরণের ধরন থেকে এটা স্পষ্ট যে, এটা কোনো সাধারণ অভিযান ছিল না।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, রাত আড়াইটার দিকে সর্বোচ্চ স্কেলে অভিযান শুরু হয়। সমাবেশস্থলে উপস্থিত থাকা হেফাজতের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সাউন্ড গ্রেনেড, কালার স্মোক গ্রেনেড, মাল্টি ইমপ্যাক্ট গ্রেনেড, টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে ঘটনাস্থলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ সময় হেফাজতের নেতাকর্মীরা জীবন বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। হতবিহ্বল হেফাজতের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন আশ্রয় খুঁজে নিজেদের জীবনরক্ষার চেষ্টা করেন।
এর মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হেফাজতের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে বেপরোয়াভাবে শটগান ও মারণাস্ত্র দিয়ে গুলি চালায়। হেফাজত নেতাকর্মীরা বিভিন্ন পথে ঢাকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যাওয়ার পথে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের দ্বারা হামলা ও হতাহতের শিকার হন। রাতের অভিযান এবং দিনব্যাপী হামলা ও আক্রমণে শাপলা চত্বর, মতিঝিল ও এর আশপাশের এলাকায় হেফাজতে ইসলামের ৩২ জন নেতাকর্মী শহীদ ও নিখোঁজ হওয়ার তথ্যপ্রমাণ হওয়া গেছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার মাদানীনগরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও আশপাশের এলাকায় ২০ জন শহীদ হন, চট্টগ্রামে পাঁচজন এবং কুমিল্লায় একজন শহীদ হন ।
এ ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।
এরপর আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়। পাশাপাশি অন্য মামলায় গ্রেপ্তার আসামিদের এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা জানানো হয়। প্রসিকিউশনের আবেদন মঞ্জুর করে ট্রাইব্যুনাল এবং মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ১৬ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়।
মোট ৪১ জন আসামির মধ্যে শেখ হাসিনা ছাড়া অপর আসামিরা হলেনÑতৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মৃণাল কান্তি দাস, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ, গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, ৭১ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু, সাংবাদিক ফারজানা রুপা, তৎকালীন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, তৎকালীন অতিরিক্ত আইজিপি একেএম শহীদুল হক (পরবর্তী সময়ে আইজিপি), সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ (পরবর্তী সময়ে আইজিপি), তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান, তৎকালীন বিজিবির মহাপরিচালক আজিজ আহমেদ (পরবর্তী সময়ে সেনাপ্রধান), র্যাবের গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন পরিচালক (পরবর্তী সময়ে মেজর জেনারেল) জিয়াউল আহসান, তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মজিবুর রহমান, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মাহবুব হোসেন, ডিবির তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (সদর দপ্তর ও প্রশাসন) আনোয়ার হোসেন, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (ট্রাফিক-দক্ষিণ) আশরাফুজ্জামান, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল জোন) এসএম মেহেদী হাসান, তৎকালীন ডিসি (ডিএমপির লালবাগ বিভাগ) হারুন-অর-রশীদ, তৎকালীন ডিসি (ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগ বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিআইজি সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল বিভাগ) মো. আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম শিবলী নোমান এবং তৎকালীন মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিএম ফরমান আলী।
এ মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেনÑদীপু মনি, শামসুল হক টুকু, জিয়াউল আহসান, একেএম শহীদুল হক, শাহরিয়ার কবির, আবদুল জলিল মণ্ডল, ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবু।
অন্য মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন হাসানুল হক ইনু। এছাড়া আবদুর রাজ্জাকও গ্রেপ্তার আছেন। বাকিরা পলাতক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

