কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে নারিকেলী ও সাদা জাতের কচু চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন চাষিরা। পুষ্টিকর ও নিরাপদ উৎপাদন এবং ধানের চেয়ে চার গুনের বেশি লাভজনক হওয়ায়, কচু চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন এ এলাকার কৃষকরা। ফলে, দিনদিন বেড়েই চলেছে এর আবাদ। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত কচু আর লতি রপ্তানি হচ্ছে যুক্তরাজ্য, ইউরোপসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। এখানকার কচু ও কচুর লতির স্বাদ ভিন্ন হওয়ায় দেশ-বিদেশে কদর বাড়ছে দিন দিন।
কিশোরগঞ্জ জেলায় কুলিয়ারচর উপজেলা কচুর জন্য বিখ্যাত। প্রায় অর্ধশত বছর ধরে কচু চাষ করে যাচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। এখানকার চাষিরা সাধারণত নারিকেলী কচু এবং সাদা কচুর আবাদ করেন। তবে, নারকেলী কচুর চাহিদা ও বাজারমূল্য বেশি থাকায়, এর আবাদে আগ্রহী বেশি।
এই উপজেলার রামদী, সালুয়া ও গোবরিয়া আব্দুল্লাপুর ইউনিয়নের বেশির ভাগ কৃষক, এ জাতের কচু চাষ করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করে আসছেন। পাশাপাশি এ অঞ্চলের কৃষকরা কচুর চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
-6e3365.jpg)
রামদী ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের কচু চাষি বকুল মিয়া (৫৩) জানান, ছোটকাল থেকেই বাবার সঙ্গে কচু ক্ষেতে কাজ করে বেড়ে ওঠা। উপজেলা কৃষি অফিসের সহায়তায় এ বছর ৫৩ শতাংশ জমিতে ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে বারি পানিকচু চাষ করে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা বিক্রি করেছেন । এতে ধানের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি লাভবান হয়েছেন। এর মাধ্যমে পরিবারসহ চার ছেলেমেয়ের পড়ালেখার খরচ এবং বিয়ে দিয়ে সুখেই আছেন।
মনোহরপুর এলাকার কচু ব্যবসায়ী ইমরান ও সানাউল্লাহ জানান, ১০/১৫ বছর যাবৎ এ কচু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কুলিয়ারচরের বিভিন্ন এলাকা থেকে কচু ক্রয় করে ঢাকা কারওয়ান বাজারের আড়তে পাঠান। শুরুতে বৃষ্টির পরিমাণ কম হলেও শেষ দিকে বৃষ্টি বেশি হওয়ায় ব্যবসা ভালো। তারাও কুলিয়ারচরের কচু ব্যবসা করে লাভবান বলে জানান।
সালুয়া ইউনিয়নের চরকামালপুর গ্রামের কচু চাষী গোলাপ জানান, অগ্রহায়ণ থেকে শ্রাবণ পর্যন্ত কচু চাষ ও বিক্রির মৌসুম। তিনি এ মৌসুমে প্রতি বছরই কচু চাষ করে থাকেন।
তিনি বলেন, ১ কানি জমিতে নারকেলি কচু চাষ করতে খরচ হয় ১০/১৫ হাজার টাকা, তা বিক্রি করতে পারেন ৭০-৮০ হাজার টাকা এদিকে সাদা কচু চাষ করতে খরচ হয় ১০/১২ হাজার টাকা তা বিক্রি করতে পারেন প্রায় ৪৫-৫৫ হাজার টাকায়। বছরে প্রায় ছয়গুণ লাভে কচু বিক্রি করে থাকেন। তার অন্যান্য ব্যবসা থেকে এটি সবচেয়ে বেশি লাভজনক ব্যবসা।
চরকামালপুরের কচু ব্যবসায়ী হোসেন মিয়া জানান, ২০-২৫ বৎসর যাবৎ এ ব্যবসা করে আসছেন। তিনি চাষিদের কাছ থেকে কচু ক্রয় করে ঢাকা কারওয়ান বাজার ও গাজীপুর বাজারের পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন । তিনি বলেন, বৃষ্টি বেশি হলে কচুর মূল্যায়ন বেশি এবং লাভও বেশি হয়। গত বছরের তুলনায় এ বছর কচুর চাহিদা বেশি থাকায় কচু ব্যবসা করে লাভবান ।
কুলিয়ারচর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এখানকার মাটি কচু চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই কচুর আবাদ হচ্ছে। এখানে সাদা ও নারকেলি-এই দুই জাতের কচুর আবাদ হয়ে থাকে। চলতি বছর এ উপজেলায় ৩ শতাধিক হেক্টর জমিতে কচুর আবাদ হয়েছে। কচু চার মাস মেয়াদি সময়ের ফসল হওয়ায়, কচুর ফলন তুলে খুব সহজেই রোপা আমন ধানের চাষাবাদ করতে পারেন স্থানীয় কৃষকরা।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, কচু চাষে উদ্বুদ্ধ করতে এ উপজেলার ব্লক ভিত্তিক (যে ব্লকে কচু চাষ হয়) ১/২ জন কচু চাষিদের প্রদর্শনী দেন। যার মাধ্যমে চাষিরা কচুর চারার দাম পায়। রাসায়নিক ও জৈব সার পায়। কচুর লেডা পোকা দমনের জন্য চাষিকে ফেরোমন সেক্স দেন। কচুর পাতা ও কাণ্ড পচন দমনে ছত্রাকনাশক নাটিবো/স্ট্রমিন দেন।
কুলিয়ারচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মর্জিনা আক্তার জানান, নারিকেলী ও সাদা কচুর আবাদ আরও বাড়াতে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তা দেয়া হচ্ছে কৃষি বিভাগ থেকে। কৃষি বিভাগ এখানকার কৃষকদের কচু চাষে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণসহ নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। ন্যাশনাল এগ্রিকালচার টেকনোলজি প্রজেক্টের আওতায় তাদেরকে বিষমুক্ত কচু আবাদে সেক্স ফেরোমেন ফাঁদ সরবরাহসহ মাঠ পর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

