ভারতে আজ বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে ব্রিকস জোটভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দুই দিনের বৈঠক। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর এবং ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি বৈঠকটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
নয়াদিল্লিতে হওয়া উদ্বোধনী বক্তব্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর আন্তর্জাতিক জলসীমায় ‘নিরাপদ ও বাধাহীন নৌ চলাচল’ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালীতে আংশিক অবরোধ জারি রয়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ব্রিকস সদস্যদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক পদক্ষেপকে ‘অবৈধ আগ্রাসন’ বলে উল্লেখ করেন।
ব্রিকস কী?
ব্রিকস হলো বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর একটি জোট, যার লক্ষ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নীতিতে সমন্বয় বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে গ্লোবাল সাউথের দাবিকে জোরালো করা।
প্রথমদিকে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে ২০০৬ সালে ‘ব্রিক’ গঠিত হয়। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিলে এর নাম হয় ‘ব্রিকস’। পরে ২০২৩ সালে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। সৌদি আরব এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ না দিলেও অন্য দেশগুলো সদস্য হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইন্দোনেশিয়াও জোটে অন্তর্ভুক্ত হয়।
কারা অংশ নিচ্ছেন?
বৈঠকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ, দক্ষিণ আফ্রিকার রোনাল্ড লামোলা এবং ব্রাজিলের মাউরো ভিয়েইরাসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ট্রাম্পের বেইজিং সফরের কারণে উপস্থিত থাকতে পারছেন না। তার পরিবর্তে ভারতে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত জু ফেইহং প্রতিনিধিত্ব করছেন।
আলোচনার মূল বিষয়
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এবারের বৈঠকের প্রতিপাদ্য ‘স্থিতিশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন’। স্বাস্থ্যখাতের সহযোগিতা, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধই বৈঠকের প্রধান আলোচ্য হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে উত্তেজনা এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রশ্নে জোটের অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
গত এপ্রিলে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক ব্রিকস বৈঠকেও ইরান ও আমিরাতের মতপার্থক্যের কারণে যৌথ বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। ভারতও গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলের সমালোচনা নরম করার চেষ্টা করায় ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি।
ট্রাম্প-শি বৈঠকের প্রভাব
ব্রিকস বৈঠকের সমান্তরালে চীনে অবস্থান করছেন ট্রাম্প। সেখানে তার সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ওয়াশিংটন বেইজিংকে চাপ দেবে যাতে চীন ইরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা নিরসনে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে তাইওয়ান ইস্যুতেও চীন-যুক্তরাষ্ট্র সমীকরণ নতুন মোড় নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠক?
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে। মার্চ থেকে ইরান হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর ফলে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
ভারত ও চীন উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অন্যদিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল রফতানির প্রধান পথও এই প্রণালী। ফলে সংকটটি ব্রিকস সদস্যদের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এত বিভক্ত অবস্থানের মধ্যে ব্রিকস বৈঠক থেকে বড় কোনও ঐকমত্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা কম। তবে বৈশ্বিক রাজনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে এই বৈঠক আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে।
সূত্র: আল-জাজিরা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


