চট্টগ্রামের আট বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, বাকি ২১টির উৎপাদনেও ধস

চট্টগ্রামের আট বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, বাকি ২১টির উৎপাদনেও ধস

ছোট-বড় মিলিয়ে চট্টগ্রামে ২৯ বিদ্যুৎকেন্দ্রের আটটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বাকি ২১ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিট এবং বাঁশখালী ও মাতারবাড়ির দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া কোনোটিই উৎপাদন সক্ষমতার ধারেকাছেও যেতে পারছে না। মূলত গ্যাস ও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামে প্রতিদিন লোডশেডিং করতে হচ্ছে ২৩৮ মেগাওয়াটের বেশি। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। দিনে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ে উৎপাদন কমেছে শিল্পকারখানাগুলোতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো কঠিন। এর সঙ্গে গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরো কঠিন হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চল। বন্দর, ইপিজেড, কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঘন ঘন লোডশেডিং হলে এসব প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং সময়মতো উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী জানান, আমাদের আট কর্মঘণ্টার মধ্যে অর্ধেক সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। তখন আমরা জেনারেটর দিয়ে কোনোরকমে কাজ চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। তবে জেনারেটরের ক্যাপাসিটি সব সময় মেশিনের জন্য যথেষ্ট না হওয়ায় মেশিনের যন্ত্রাংশও নষ্ট হচ্ছে। এতে আমাদের উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য ডেলিভারি দিতে পারছি না। বিদ্যুৎ-গ্যাসের সমস্যা দ্রুত সমাধান করার জন্য আহ্বান জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।

লোডশেডিংয়ের কারণে চরম স্থবিরতা দেখা দিয়েছে জনজীবনেও। গরমে সবচেয়ে কষ্ট পাচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। বারবার বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। চট্টগ্রাম নগরের লালখান বাজারের গৃহিণী শিউলি মজুমদার জানান, দিন ও রাতে অনেকবার লোডশেডিং হয়। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। এর প্রভাব থাকে সারা দিন। বাচ্চাদের নিয়ে চিন্তায় থাকি, বিদ্যুৎ চলে গেলেই গরমের কারণে বাইরে বের হয়ে যেতে চায় তারা।

লোহাগাড়ার একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক নুরুল কবির জানান, এখানে বিদ্যুৎ আসে আর যায়। একবার গেলে এক ঘণ্টায়ও আসে না। দিনে কয়েকবার এরকম হয়। দিন দিন গরম বাড়ছে, জানি না সামনে কী করব।

শূন্য উৎপাদনে আট কেন্দ্র

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী আনলিমা এনার্জি, কাপ্তাই সোলার, কেপিজেড সোলার-১, কেপিজেড সোলার-২, রাউজান-১, রাউজান-২, টেকনাফ সোলার ও ইউনাইটেড পাওয়ারসহ মোট আট কেন্দ্রে রবি ও সোমবার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এর মধ্যে আনলিমা এনার্জির সক্ষমতা ১১৬ মেগাওয়াট, টেকনাফ সোলারের ২০ ও ইউনাইটেড পাওয়ারের ৫০ মেগাওয়াট। কাপ্তাই সোলারের সক্ষমতা ৭.৪ মেগাওয়াট। আট কেন্দ্রের মধ্যে ছয়টিরই সক্ষমতা ৬১৩.৪ মেগাওয়াট। বাকি দুটির সক্ষমতা জানা যায়নি।

অন্যদিকে চালু থাকা বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও তাদের সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন করছে। রোববার সন্ধ্যায় ১,২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন হয়েছে ৫৫৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। একই সময় ১,৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এসএস পাওয়ার থেকে উৎপাদন হয়েছে ১,১৭২ মেগাওয়াট। শিকলবাহা ২২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হয়েছে ২১৭ মেগাওয়াট। ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আনোয়ারা ইউনাইটেড থেকে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৬ মেগাওয়াট। ১৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিআর পাওয়ার থেকে ৫০ মেগাওয়াট, ১০০ মেগাওয়াটের এনার্জিপ্যাক থেকে ২৪ মেগাওয়াট এবং ১০০ মেগাওয়াটের হাটহাজারী কেন্দ্র থেকে ২১ মেগাওয়াট উৎপাদন হয়েছে।

রাউজান তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মুজিবুর রহমান জানান, এখানের দুটি ইউনিট চালু থাকলে আমরা সর্বোচ্চ ১৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারি। বর্তমানে দুটি ইউনিটই বন্ধ। কারিগরি ত্রুটির কারণে একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে প্রায় দুবছর ধরে। বাকিটি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ রাখা হয়েছে। গ্যাস পেলে যেকোনো সময় আমরা উৎপাদনে যেতে পারব।

পিডিবির তথ্য

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার (এসসিএডিএ) তথ্য অনুযায়ী চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই পাঁচ জেলার ছয়টি ইউনিট নিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ অঞ্চল (দক্ষিণ) চট্টগ্রাম গঠিত। চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৪,৬০০ মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ জটিলতা এবং জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংকটের কারণে বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের সক্ষমতার অর্ধেকও বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। বর্তমানে সর্বোচ্চ উৎপাদন হচ্ছে ২,৭৫৩ মেগাওয়াট। এ অঞ্চলে প্রতিদিন বিদ্যুতের গড় চাহিদা ১,৩০০ থেকে ১,৪০০ মেগাওয়াট।

তবে দেশের অন্যান্য এলাকার চাহিদা মেটাতে গিয়ে জাতীয় গ্রিড থেকে চট্টগ্রাম সরবরাহ পায় প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম। গত রোববার পিক আওয়ারে চট্টগ্রামে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১,২০৯.৯২ মেগাওয়াট। এর মধ্যে পিডিবি ও বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) মাধ্যমে সরবরাহ হয়েছে ৯৭২.১০ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং করতে হয়েছে প্রায় ২৩৮ মেগাওয়াট। একই দিন সন্ধ্যায় ১,১৯৮.১৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়েছে ৯৭৮.০৯ মেগাওয়াট। লোডশেডিং করতে হয়েছে ২২০.১০ মেগাওয়াট। গত এক মাস ধরেই ঘাটতির এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।

পিডিবি চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, প্রতিদিন আমরা চাহিদার বিষয়টি জাতীয় গ্রিডে অবহিত করি। তার পরিপ্রেক্ষিতে তারা যতটুকু সরবরাহ করে, সেটা দক্ষিণের যে নির্দিষ্ট এরিয়া আছে—সেখানে বিতরণ করি। জাতীয় গ্রিড আমাদের কতটুকু বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে, সেটা দেশের সামগ্রিক চাহিদার ওপর নির্ভর করে। সাপ্লাই চেইনটি তারাই নিয়ন্ত্রণ করে। ফুয়েল সংকট, কারিগরি ত্রুটিসহ বিভিন্ন কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হতে পারে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন