সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইনে হামলায় ব্যবহৃত ড্রোন উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম জব্দ করেছে ইরাক।
দেশটির ভূখণ্ডে অভিযান চালিয়ে এটি জব্দ করা হয়।
শনিবার ইরাকের নিরাপত্তাবিষয়ক গণমাধ্যম সেলের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাদ মান এ তথ্য জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরাকি নিউজ এজেন্সিতে (আইএনএ) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সাদ মান বলেন, একটি গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা টাস্কফোর্স অভিযান চালিয়ে উৎক্ষেপণ সরঞ্জামটির সন্ধান পায় এবং সেটি জব্দ করে। হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ফরেনসিক ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন।
সাদ মান বলেন, ইরাকের কমান্ডার-ইন-চিফ ইরানের করা একটি অনুরোধ অনুমোদন করেছেন। এর আওতায় তদন্তে ইরান অংশ নেবে এবং তদন্তের ফলাফল পর্যালোচনা করবে। এ ছাড়া গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছে বাগদাদ।
আইএনএর প্রতিবেদনে সাদ মান বলেন, ইরাক ‘প্রতিরোধমূলক সার্বভৌমত্বের’ নীতি অনুসরণ করে। এর অর্থ হলো, শুধু ইরাকের ভূখণ্ডে হামলা ঠেকানো নয়; অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে হামলার জন্যও ইরাকের মাটি ব্যবহার করতে না দেওয়া। কোনো ‘প্রক্সি যুদ্ধে’ ইরাককে জড়িয়ে পড়তেও দেওয়া হবে না।
এর আগে বৃহস্পতিবার ইরাক থেকে উৎক্ষেপণ করা কয়েকটি ড্রোন সৌদির রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে থাকা পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে আঘাত হানে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়। এতে কয়েকজন আহত হন। হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনটি সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ। এটি বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ বহন করে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি তেল রপ্তানির সুযোগ দেয়।
হামলার পর বাগদাদের অনুরোধে আপাতত পাল্টা ব্যবস্থা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সৌদি আরব। তবে দেশটি নিজেদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, স্থাপনা ও জনগণ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণের কথা জানিয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ হামলার উৎক্ষেপণস্থল ইরাকের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মাইসান প্রদেশে শনাক্ত করে। ইরান সীমান্তসংলগ্ন এই এলাকায় ইরানের ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘদিনের উপস্থিতি রয়েছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদক মোহাম্মদ রাম্মাল জানান, ইরাকি কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য উৎক্ষেপণস্থল হিসেবে মাইসান প্রদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আল-তাইয়েব সীমান্ত জেলা চিহ্নিত করেছে। এলাকাটি শিব সীমান্তপথের কাছে, আমারা শহরের পূর্ব দিকে। এর মধ্যে দুয়াইরিজ নদী ও তাইয়েব দ্বীপও রয়েছে।
রাম্মাল বলেন, উৎক্ষেপণস্থল থেকে মদিনা প্রায় ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার এবং রিয়াদ প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূরে। এ কারণে হামলায় সাধারণ কৌশলগত ড্রোন নয়, বরং দীর্ঘপাল্লার ও উন্নত ড্রোন ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
ইরাকি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র সাবাহ আল-নুমান শনিবার বলেন, হামলার সঙ্গে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তারে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অভিযান চালাচ্ছে।
হামলার পর নিরাপত্তা তল্লাশির জন্য ইরান সীমান্তের কয়েকটি সীমান্তপথ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় ইরাক। এর মধ্যে শালামচেহ, চাজাবেহ ও মান্দালি সীমান্তপথ ছিল। পরে মানবিক চলাচলের জন্য এগুলোর কিছু অংশ আবার খুলে দেওয়া হয়।
হামলার পর সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সামরিক কমান্ডারদেরও বদলি করেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি ফালিহ আল-জাইদি। এর মধ্যে মাইসান প্রদেশও রয়েছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদক সামের আল-কুবাইসি জানান, মাইসানের অপারেশন কমান্ডার ও প্রাদেশিক পুলিশপ্রধানকে বরখাস্ত করা ব্যক্তিদের মধ্যে রাখা হয়েছে। প্রদেশটির কয়েকজন নিরাপত্তা কমান্ডারকেও হামলার ঘটনায় তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালিম জাখুর আল-জাজিরাকে বলেন, সৌদি আরব এখন পর্যন্ত ‘মাঠে সরাসরি সংঘাতের দিকে যায়নি’। বরং তারা ইরাক সরকারের মাধ্যমে ‘রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের’ চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সৌদি আরবের জন্য ‘অত্যন্ত জটিল’ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। একদিকে হুথিরা বাব আল-মান্দাবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সৌদির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হামলা হয়েছে।
জাখুরের মতে, এসব ঘটনায় সৌদি আরব এখন বড় ধরনের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছে। এ ধরনের হামলা ঠেকাতে দেশটির ‘বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ’ নেওয়া প্রয়োজন।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

